বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাজেট নিয়ে আওয়ামী লীগ- বিএনপি পাল্টাপাল্টি বিতর্ক

মিয়া হোসেন : নতুন অর্থবছর ২০২০-২১ এর বাজেট পাস হয়ে গেলো গত ৩০ জুন। করোনা মহামারির কারণে সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে বাজেট পাস করা হয়। বাজেট পাসের পর থেকেই এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বির্তকে লিপ্ত হয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ নিয়ে দুই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে নিজেদের অবস্থানকে ব্যাখ্যা করছেন। বাজেট পাসের পরদিন সংসদ ভবনের সামনে ‘এটা জনগণের বাজেট নয়’ দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি দলীয় এমপিরা। এ সময় প্রতিবাদস্বরুপ তারা বাজেটের কপি ছিঁড়ে ফেলেন। বিএনপি দলীয় এমপিরা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, জনগণকে ফাঁকি দেয়ার জন্য এই বাজেট। আমরা যারা মূল বিরোধীদল বিএনপির সংসদ সদস্য আছি, আমরা যাতে সংসদে এই বাজেট নিয়ে কথা না বলতে পারি, সমালোচনা করতে না পারি সেজন্য মাত্র একদিনের জন্য সাধারণ বাজেট আলোচনা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আলোচনাবিহীন বাজেট কখনো পাস হয়নি। এই সংকটের মধ্যে যারা জাতিকে পরামর্শ দিতে চায় তাদের সরকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। পরে বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজেট প্রত্যাখ্যান করেন।
বিএনপির বাজেট প্রত্যাখ্যানের পরই সরব হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। গত বৃহস্পতিবার সংসদ এলাকায় অবস্থিত নিজের সরকারি বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এর আগে সচিবালয়ে তথ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিষয়টি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। বিএনপির সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যগণ এই বাজেট প্রত্যাখ্যান করার নামে সংসদ ভবনের সামনে মহান সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত বাজেটের কপি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন। এটি মহান সংসদের প্রতি চরম অবমাননা। এটি তাদের শপথ ভঙ্গেরও শামিল। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। ওবায়দুল কাদের বলেন, জাতির এই ক্রান্তিকালে তারা দায়িত্বশীল আচরণ করেন নি। তারা চেয়েছিলেন, সংসদ যাতে কোনো বাজেট পাস না করে। বাজেট ছাড়া একটি রাষ্ট্র তারা দেখতে চেয়েছিলেন। তারা দেশে একটি হতাশাজনক অবস্থা দেখতে চেয়েছিলেন। আমরা মানুষের মধ্যে আশার আলোর সঞ্চার করতে পেরেছি। যা এই পেনডেমিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রায় একই সুরে বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, বিএনপি এমন একটি রাজনৈতিক দল, যারা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে মানুষকে হত্যা করেছিল। পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের কর্মসূচি যে রাজনৈতিক দল দেয়, সংসদের সামনে গিয়ে তাদের বাজেটের কপি ছিঁড়ে ফেলা খুব স্বাভাবিক। যে ঔদ্ধত্য আচরণ তারা সব সময় করে আসছে, সেটিরই নতুন বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে সংসদের সামনে গিয়ে বাজেটের কপি ছিঁড়ে ফেলা। ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি যে এবারই বাজেট প্রত্যাখ্যান করছে তা তো নয়, গত ১১ বছর ধরে প্রতিবারই তারা বাজেট প্রত্যাখ্যান করছে এবং প্রতিবারেই বলেছে বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য না, জনগণের কল্যাণে আসবে না ইত্যাদি। কিন্তু গত ১১ বছর ধরে সমস্ত বাজেটই বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাস্তবায়নের হার ৯৭-৯৮ শতাংশ। সেই বাজেটগুলো বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে দেশের দারিদ্র্য কমে অর্ধেকে নেমেছে। মানুষের মাথাপিছু আয় সাড়ে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জিডিপি প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ খাদ্যে উদ্বৃত্ত হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের পথে উন্নীত হয়েছে। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। কিন্তু তারা কোনোবারেই বাজেট গ্রহণ করতে পারেনি। এদিকে বিএনপি দলীয় এমপিরা নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে বাজেট প্রত্যাখ্যান করেন। এ প্রসঙ্গে বিএনপি দলীয় এমপি গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, আমরা যাতে সংসদে এই বাজেট নিয়ে কথা বলতে না পারি, সমালোচনা করতে না পারি সেজন্য মাত্র একদিনের জন্য সাধারণ বাজেট আলোচনা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আলোচনাবিহীন বাজেট কখনো পাস হয়নি। সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে আমাকে সংসদে খুব অল্প সময়ের জন্য বাজেট বক্তৃতায় কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ বাজেট বক্তৃতার একপর্যায়ে স্পিকার আমার মাইক বন্ধ করে দেন। আমরা বাজেট ঘোষণার আগে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, এই বাজেট অধিবেশন ভার্চুয়াল করার জন্য, কিন্তু সেটা করা হয়নি। আমাদের সদস্যদের এই বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই, যারা মহাজোটের শরিক তারাই বিরোধীদলে অংশগ্রহণ করছে। ফলে জনগণের যে সংকট সেটি সত্যিকার অর্থে সংসদে প্রতিফলিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা যে কয়েকজন সদস্য সেটা বলার চেষ্টা করি, সেখানে আমাদের সঠিক সময়টুকু দেয়া হচ্ছে না। এই সংকটের মধ্যে যারা জাতিকে পরামর্শ দিতে চায় তাদের সরকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাজেট অধিবেশন সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। এই অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বাজেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জাতির স্বার্থেই খুব জরুরি। করোনাকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেট অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছে সরকার। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে এই অধিবেশন ডিজিটাল বা ভার্চুয়ালি করার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি বলেন, গত ১৫ই জুন অনির্ধারিতভাবে ২৩শে জুন পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করে মাত্র এক দিন (২৩শে জুন) বাজেটের সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। এটা অকল্পনীয়। আমাদের বিশ্বাস করোনার মতো ভয়ঙ্কর একটা সংকটে যাচ্ছেতাই বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটার সমালোচনা এড়ানোর জন্যই অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি শেষ করতে চেয়েছে সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ