শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

করোনা সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে সক্রিয় প্রতারকচক্র

নাছির উদ্দিন শোয়েব: বিশ্বব্যাপী মহামারিতে রূপ নেওয়া করোনা ভাইরাসকে (কোভিড-১৯) পুুঁজি করে রাজধানীসহ সারা দেশে নকল সুরক্ষা সামগ্রী তৈরি ও বাজারাজাত করতে তৎপর হয়ে ওঠছে প্রতারকচক্র। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই প্রতারণা। নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, পিপিইতে বাজার সয়লাভ হয়ে পড়েছে। করোনা  থেকে রক্ষা পেতে সাধারণ মানুষ সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করতে গিয়ে সহজে আসল-নকল যাচাই করতে পারছে না।
দেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা  রোগী শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই এর সুরক্ষা সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকচক্র বিভিন্ন স্থানে গোপনে এসব সামগ্রী তৈরীর কারখানা খুলে বসে। বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক নকল মাস্ক, হ্যান্ড স্যনিটাইজার, পিপিই ও নিম্ন মানের গ্লাভস জব্দ করছে। কয়েকটি স্থানে নকল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের কারখানার সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খরা বাহিনী। এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিলেও থেমে নেই প্রতারণা। বাজারে সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় করতে গিয়ে কোনটি আসল বা নকল তা বোঝা যাচ্ছে না।
এদিকে বিভিন্ন জায়গায় নকল মাস্ক ও পিপিই ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক কয়েকদিন আগে বলেছেন, এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওষুধ প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে যে বিক্রয় ও প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাসের মতো জীবাণু থেকে রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হ্যান্ড স্যানিটাইজার, যা ব্যবহারে হাত জীবাণুমুক্ত রাখা যায়। বিভিন্ন কোম্পানির নাম ব্যবহার করে নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রি হচ্ছে ফুটপাতসহ বিভিন্ন দোকানে। এসব নকল পণ্য ব্যবহারের কারণে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ তো দূরের কথা, উল্টো সংক্রমণ আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছো। তারা বলছেন, এসব পণ্য ব্যবহার করে অনেকে ভাবতে পারেন তিনি সুরক্ষিত আছেন। কিন্তু নকল পণ্য ব্যবহারের কারণে মূলত তিনি ‘ফলস সিকিউরিটি’তে থাকবেন। যা সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, গত ২২ মার্চ থেকে নকল মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি ও বিক্রি বন্ধে মাঠে নামে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। একই সময়ে মাঠে নামে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ১০ জুন রাজধানীর নিউমার্কেটের ৪টি দোকানকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করে র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। রাজধানীর পান্থপথে এএসএম ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ নকল গ্লাভস ও গাউন জব্দ করেছে র‌্যাব। এ সময় ১০ লাখ টাকা জরিমানা ও গোডাউন সিলগালা করা হয়। বাংলামটরের জহুরা টাওয়ার থেকে অ্যাডভান্স বায়ো কেমিক্যাল (এবিসি) নামে একটি প্রতিষ্ঠান এন-৯৫ বলে নকল মাস্ক কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছিল। এছাড়া সেখানে এন-৯৫ ছাপ দেওয়া অনেক মাস্কের খালি প্যাকেটও পাওয়া গেছে। নকল মাস্কগুলো এসব ব্যাগে ভরে বিক্রি করতো।
২৭ জুন পুরান ঢাকা থেকে ১৮ লাখ টাকা মূল্যের নকল ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) জব্দ করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। মিটফোর্ড হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে নকল পিপিই উৎপাদন ও মজুদ করার দায়ে ১০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ওয়্যারহাউজ সিলগালা করে দেওয়া হয়। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আখতারুজ্জামান জানান, রাজধানীর আরমানিটোলা ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় করোনা ভাইরাস মহামারির সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসায়ী ১ লাখ টাকা মূল্যের নকল পিপিই উৎপাদন করছে খবর পেয়ে র‌্যাব-১০ এর একটি দল অভিযান চালিয়ে সেগুলো জব্দ করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নয়টি মামলায় আট প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা, দুজনকে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং দুটি প্রতিষ্ঠানকে সিলগালার নির্দেশ দেওয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেট মো. আক্তারুজ্জামান জানান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরিতে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দেওয়া ফর্মুলা অনুযায়ী ইসোপ্রোফাইল অ্যালকোহল ব্যবহার করতে হয়। এটি শরীরের জন্য ক্ষতিকারক নয় বরং জীবাণুনাশক। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ অসাধু ব্যবসায়ী চক্র আইসোপ্রোফাইল অ্যালকোহল ব্যবহার না করে শরীরের জন্য ক্ষতিকারক ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল মিথানল দিয়ে তৈরি করছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। সাথে ব্যবহার করছে বিষাক্ত রং।
২৩ জুন রাজধানীর উত্তরায় পশ্চিম থানা এলাকার একটি ভবনের গুডাউনে অভিযান চালিয়ে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। গোডাউন থেকে বিপুল পরিমাণ নকল এন৯৫সহ অন্যান্য মাস্ক উদ্ধার করা হয়েছে।
২১ জুন পুরান ঢাকার নারিন্দার ভূতের গলি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার নকল মাস্ক ও মাস্ক তৈরির উপকরণসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেফতারকৃতরা হলেন-নকল মাস্ক তৈরি কারখানার মালিক খালিদ ইমরান, এমডি রেহান ইউসুব, কর্মচারি আব্দুল সোবহান, জিতু চন্দ্র দাস ও ওসমান গণী।
এছাড়া ২৯ জুন চট্টগ্রামের দেওয়ানহাটে নকল সুরক্ষা সামগ্রী তৈরী ও বাজারজাত করার দায়ে চট্টলা ক্যমিকেলের মালিক মোঃ রাশেদকে ছয় মাসের কারাদন্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদ- দিয়েছেন ভ্রাম্যমান আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ উমর ফারুকের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
২৯ জুন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে একটি দোকান থেকে প্রায় তিন লক্ষাধিক টাকার নকল পিপিই, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও মাস্ক জব্দ করে র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কর্মকর্তারা। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানকে নগদ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় বলে জানান র‌্যাব-৯ শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কোম্পানি কামান্ডার মেজর আহমেদ নোমান জাকি। একই সময়ের অতিরিক্ত বাড়তি দামে স্যানিটাইজার বিক্রির দায়ে আরেক প্রতিষ্ঠানকে আরও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ