রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

পাটকল বন্ধ হচ্ছে কার স্বার্থে

অধ্যক্ষ ডা. মিজানুর রহমান: একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বায়নের চলমান সময়ে বিশ্ববাসী যখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে নানারকম দুর্যোগে-দুর্ভোগে দিনাতিপাত করছে। আনবিক, পারমাণবিক, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের আতঙ্কের কারণে জননিরাপত্তা যখন চরম হুমকির মুখে; ঠিক সেই সময় শুরু হয়েছে কভিড-১৯ করোনার আক্রমণ। অদৃশ্য অশরীরি অতিসুক্ষ মাত্রার এ ভাইরাসের আকক্রমণের শিকার হয়ে বিশ্বের সকল পরাশক্তি আজ পরাভূত। এ যাবত প্রায় ৬ লাখ মানুষের জীবননাশ হয়েছে আর আক্রান্ত ১ কোটি ৪ লাখে পৌঁছেছে। এ মহামারিতে ঠিক কতজন মানুষের প্রাণ সংহার হবে তা ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বলে দিবে। বাংলাদেশে এ প্রবন্ধ লেখাঅব্দি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ২ হাজার আর আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এমতাবস্থায় দেশের উজান থেকে নেমে আসা বন্যার পানির তোড়ে বিপন্ন জীবনের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে দেশের নদী মাতৃক জেলার লাখ লাখ নদীসিকস্তি মানুষ। সামগ্রিক পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে কর্মক্ষেত্র হ্রাসজনিত কারণে হু হু বেকারত্ম বাড়ছে।

 এহেন পরিস্থিতিতে বিশ^ায়নের চলমান প্রতিযোগিতায় পরিবেশবান্ধব পাটজাতদ্রব্যসামগ্রী তৈরির শিল্পকারখানাগুলোর গুরুত্ব অতিদ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে পাটের উৎপাদনের উপযুক্ত ক্ষেত্র বলে বিশে^ সুনাম অর্জনের জুড়ি নেই। বিগত কয়েক যুগে পাট উৎপাদন ও পাটজাতদ্রব্যসামগ্রী উৎপাদনে বাংলাদেশের পাটশীল্পের অবদান, সুনাম ও বৈদেশিক অর্থ উপার্জনের রেকর্ড বিশ্ব স্বীকৃত। অথচ আজকের প্রেক্ষাপটে এ শিল্প চরমভাবে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার পর ১৯৭২ সালে এসব শিল্প-কারখানাগুলো রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। আশা করা হয়েছিল এসব শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকার গতি আরও বৃদ্ধি পাবে। কৃষকরা পাট উৎপাদন করে ন্যায্য দামে বিক্রি করে তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাবে। শ্রমিকরা তাদের শ্রম বিনিয়োগ করে মেহনতের বিনিময়ে অর্জিত রুজিতে তাদের প্রয়োজনীয় চহিদা মেটাতে সক্ষম হবে এবং শ্রমিক-কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। কিন্তু যুগের বিবর্তনে সে আশার মৃত্যুঘণ্টার শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাষ্ট্রয়ত্ত শিল্প-কারখানাগুলোতে প্রশাসনিক অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, দেশপ্রেমের পরিবর্তে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি এবং অপ্রয়োজনীয় অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ বাণিজ্য ইত্যাদি কারণে  খুব কম সময়ের ব্যবধানে অলাভজনক শিল্প-কারখানায় পরিণত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনার অর্থনৈতিক শিল্পবিপ্লব মুখ থুবড়ে পড়ে। 

দেশের  ২৬টি পাটকল একযোগে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত মূলত অশুভ পরিণতির পুনরাবৃত্তি এবং ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র বলে মন্তব্য করেছেন পাটশিল্পের সাথে জড়িত ভুক্তভোগী শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা মনে করেন জনস্বার্থবিরোধী এবং ভিনদেশীদের স্বার্থ রক্ষার এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের জন্য কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না। এ শিল্পকে বাচাঁতে কখনো সরকারি, কখনো বেসরকারি, কখনো ব্যক্তি মালিকানাধীন এর আওতায় পরিচালিত হয় , কিন্তু কোন পদক্ষেপই সফলতার মুখ দেখতে পারেনি। এসব কলকারখানার পরিচালিত দায়িত্ব যাদের উপর অর্পিত হয়েছে তারা অধিকাংশই কয়েমী স্বার্থবাদী। এদের হাতে কোন সময়ই এসব ভারি, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্প অদৌ নিরাপদ ছিল না। বিগত ৫০ বছর এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন, উন্নতি-অবনতির প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ, বিচার-বিশ্লেষণ করলে এসবের আসল চিত্র জাতির সামনে উম্মোচিত হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। হাতবদলের ডামাডোলে সকলেই যে পরিমাণ চেটেপুটে খেয়েছে তাতে করে এ শিল্প এখন পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এ শিল্প এখন মৃতপ্রায়। এমতাবস্থায় দেশের রাষ্ট্রয়ত্ত পাটকলগুলো পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এর মাধ্যমে পরিচালনার অর্থাৎ রাষ্ট্র ও ব্যক্তি খাতের যৌথ উদ্যোগে পরিচালনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী। এতে করে ৪৯ বছরের মাথায় এসে দেশের পাট কলগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাচ্যুৎ হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে চলেছে। অর্থাৎ পাটশিল্পের পুরো সেক্টর সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

এ শিল্পই শুধু নয়, দেশের সকল সম্ভবনাময় শিল্পকে বিশেষ করে বস্ত্র, চা, চামড়া, চিনি, মৎস্য এবং পাটশিল্প কারখানাগুলো বাচাঁতে অযোগ্য-অসৎ ও স্বার্থবাদীদের হাতে হস্থান্তর না করে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সৎ যোগ্য অভিজ্ঞ ব্যক্তির হাতে হস্থান্তরের বিকল্প নেই। সেই সাথে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উৎপাদন বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও সকল সেক্টরে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হবে। তবেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অদম্য বাংলাদেশ কথাটি স্বার্থক হবে। 

বর্তমানে দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে। জনসম্পদের ক্ষতি সাধন হচ্ছে। জননিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি চিন্তা করে ব্যক্তিমালিকানা ও সরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষিত হওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে কয়েক কোটি মানুষ। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভয়াবহ বন্যা। হু হু করে বেকারত্বের ন্যায় বাড়ছে নদ-নদীর বন্যার পানি। বসতবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ মাঠ-ঘাট, সড়ক ও জনপদ একের পর এক তলিয়ে যাচ্ছে এবং নদী ভাঙ্গনের শিকার হয়ে বন্যা কবলিত লাখ লাখ মানুষ ও গবাদি পশু-পাখি দুর্যোগ-দুর্ভোগের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছে। 

দেশের ক্রান্তিলগ্নে দেশের রাষ্ট্রীয় শিল্প সম্পদগুলো হাতছাড়া করা এবং ২৫ হাজার শ্রমিককে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় নির্বাহের বিনিময়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদায় করার পরিকল্পনা দেশে কি কর্মক্ষম শ্রমিকের হাত বেকার হয়ে পরছে না? এসব বিষয়ে দেশের পাটকল শ্রমিকসহ ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক ফেডারেশন বা এ ধরনের শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ হঠাৎ করে দেশের ২৫ টি পাটকল একযোগে বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছেন। সেই সাথে দেশের মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সচেতন নাগরিক, অভিজ্ঞ মহল, শিল্প-কারখানা বিশ্লেষক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিজীবীরা নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা দেশের গার্মেন্সশিল্প, চামড়াশিল্প, মৎস্য শিল্প, চিনি শিল্প, চা শিল্প, মৃৎশিল্প, হস্তশিল্পসহ ছোট বড় মাঝারি সব ধরনের শিল্প-কারখানাকে পূর্বের ন্যায় চালূকরণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার দাবি জানান। তারা ৫১ হাজার শ্রমিকের চাকরিচ্যুত করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান। 

নেতৃবৃন্দ সরকারকে পাটখাতে ১০ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা লোকসান দেওয়ার অজুহাতে ২৫ টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্বান্ত বাতিলের দাবি জানান । পাট খাতে যে লোকসান হয়েছে তার জন্য প্রশাসনের অদক্ষতা, অযোগ্যতা, দুর্নীতিই মূলত দায়ী, যে কারণে এশিয়া মহাদেশের বিখ্যাত আদমজী জুটমিলসহ দেশের নদীমাতৃক জেলায় স্থাপিত ও পরিচালিত অর্ধসহ¯্রাধিক পাটশিল্প কারখানা লোকসানের মুখে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর জন্য কোনভাবেই শ্রমিকরা দায়ী নয়। অথচ ব্যর্থতার সেই মূল্য অতীতে যেমন শ্রমিকদের দিতে হয়েছে আজও দিতে হচ্ছে সেই মেহনতি শ্রমিকদের।  

 

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে পাটকলগুলো পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় চলবে। এক্ষেত্রে অতীত সরকারের বিগত রেকর্ড থেকে এটি আশংকা করা যেতে পারে যে আবারও এসব সরকারি সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানায় নামমাত্র মূল্যে অংশীদারিত্ব করার নামে দেশের পাটশিল্পকে ধ্বংস করে শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে ভিনদেশী রাষ্ট্রের সুবিধাভোগীদের স্বার্থ তথা পশ্চিম বাংলার অচল পাটকলকারখানাগুলো চালু করার নীলনকশা বাস্তবায়নে সরকারের অভ্যন্তরের ঘাপটি মেরে থাকা কোন একটি ষড়যন্ত্রকারী মহল নীরবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশেষ ফায়দা লুফে নিচ্ছে নাতো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ