রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গড্ডলিকাপ্রবাহে গা-ভাসানো মুসলিমদের কাজ নয়

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী: মুসলিমরা মানুষ হিসেবে একটা জাতি হলেও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। পৃথিবীতে বহু জাতিসত্তার মানুষ থাকলেও মহান আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণকারী মুসলিমরা সম্পূর্ণ পৃথক। সাধারণ মানুষ যা করতে পারেন, মুসলিমরা তা পারেন না। মুসলিমদের প্রতিটি কাজ হিসেব করে সম্পন্ন করতে হয়। যা ইচ্ছে তা একজন মুসলিম করতে পারেন না। সবকিছু করবার অনুমতি এবং অধিকার নেই। 

আল্লাহ মুসলিমদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘কুনতুম খাইরা উম্মাতিন উখরিজাত লিন্নাস; তা’মুরুনা বিল মা’রুফ ওয়া তানহাওনা আনিল মুনকার।’Ñসুরা আল ইমরান : আয়াত : ১১০। অর্থাৎ তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি; মানুষের কল্যাণে তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে ; তোমরা ন্যায়ের আদেশ দেবে এবং অন্যায় প্রতিরোধ করবে।

সবমানুষই আশরাফুল মাখলুখ বা সৃষ্টির সেরা। কিন্তু আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বা সম্প্রদায় বলে উল্লেখ করেছেন। এদেরই নির্দেশ দেয়া হয়েছে সবার কল্যাণ করবার জন্য। শুধু তাই নয়। বলা হয়েছে, এরাই পৃথিবীতে ন্যায়াদেশ দেবেন এবং অন্যায়-অবিচার রুখে দাঁড়াবেন। তার মানে যারা শ্রেষ্ঠ জাতি হবেন, অন্যের কল্যাণ সাধন করবেন, তাঁদের যেমন ন্যায়ানুগ হতে হবে, তেমনই অন্যায় রুখে দেবার ক্ষমতাও তাঁদের হাতে থাকতে হবে। কারণ ন্যায়ের আদেশদাতা যদি দুর্বল হন তাহলে তাঁর আদেশ যেমন মূল্যহীন, তেমনই তা অকার্যকর। এর মানে মুসলিম হওয়া ছেলেখেলা কাজ নয়। অনেক দায়িত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করতে হয় মুসলিমদের।

মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ জাতি বা সম্প্রদায় হিসেবে সৃষ্টি করা হলেও এদের নিকৃষ্ট জীবে পরিণত করতে শয়তান লেগে থাকে সবসময়। শয়তান ইবলিশ দিনরাত প্ররোচনা দিয়ে এদের সর্বনাশ করছে। এমনকি আল্লাহর বান্দারাও ধান্দাবাজি করে আত্মবিনাশী কর্ম করছেন। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। মার খাচ্ছেন তাঁরা বিশ্বজুড়ে। কোথাও মুখ তুলে কথা বলবার জো নেই তাঁদের।

মুসলিমদের ওপর জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কাউকে কাউকে বানানো হচ্ছে জঙ্গি। লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে এক দলকে অন্য দলের বিরুদ্ধে। এজন্য ঢালা হচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার-ইউরো। যেখানে সরাসরি এসব করা যাচ্ছে না, সেখানে অন্য চাল চালা হচ্ছে। লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে সুন্দরী বারবনিতা। ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে ওয়েস্টার্ন কালচার। সৃষ্টি করা হচ্ছে মুসলিমদের চরিত্রধ্বংসের নানা উপকরণ। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ব্যাপারতো নেহাতই মামুলি বিষয়।

আমাদের পাঠ্যবইয়ে ইতোমধ্যে অনেক পরিবর্তন করা হয়েছে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিশ্বাসবোধকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে স্যাকুলারিজমের ধ্বজাধারীরা বেশ অগ্রসর হয়েছেন। তাঁরা আমাদের পাঠ্যবইয়ে আল্লাহ, রসুল (স), সালাত, সিয়াম, ঈদ, সালাম-কালাম ইত্যাদি শব্দমালা থাকাকে সাম্প্রদায়িকতা বলে চিহ্নিত করে সেসব ঝেঁটিয়ে খেদাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। সেখানে প্রভু, স্রষ্টা, ঈশ্বর, বিধাতা প্রভৃতি শব্দ প্রতিস্থাপন করতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এগুলো নাকি আমাদের বাঙালিয়ানার চিরায়ত প্রতীক বা নিদর্শন। আর আল্লাহ, রসুল (স), নবী, সালাম, কালাম, দু’আ-দরুদ, সিয়াম, সালাত এসব বিদেশী ভাষা। এগুলো আমাদের শিক্ষাবোর্ড বা শিক্ষাবিভাগের কাছে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা। আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে আজকাল এগুলো চলতে পারে না বলে বিভ্রান্তিকর ধারণা দেয়া হচ্ছে। ভুল বোঝানো হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

কোনও জাতি বা সম্প্রদায়কে যখন সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে অধীনস্থ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয় অথবা কোনও চাপ থাকে তাহলে পরোক্ষভাবে মূল উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নানারকম কৌশল অবলম্বন করে প্রতিপক্ষ। এ কৌশলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কালচারাল আগ্রাসন। অপসংস্কৃতি সুকৌশলে অনুপ্রবেশ করিয়ে কোনও প্রতিপক্ষকে কুক্ষিগত করে ফেলা। এ কৌশল পারমাণবিক আক্রমণের চাইতেও মারাত্মক। এর অর্থ হচ্ছে একটা জাতিকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দেয়া। আমরা এমনই অন্তর্ঘাতী আক্রমণের শিকার হয়েছি। তলে তলে ঘুণপোকা আমাদের শেষ করে ফেলছে। কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না।

আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে টকশোর নামে প্রায়শ গভীর রাতে কিছু অনুষ্ঠান হয়। এগুলোর সবই খারাপ তা নয়। তবে বেশির ভাগ অনুষ্ঠানে সালাম-কালাম থাকে না। মুসলিমদের ব্যবহৃত শব্দগুলো ব্যবহার করা হয় না। আল্লাহ শব্দের স্থলে ইচ্ছে করে প্রভু, সৃষ্টিকর্তা, স্রষ্টা বলা হয়। কারণ আলোচকদের অনেকেই মনে করেন এগুলো সাম্প্রদায়িক পরিভাষা। এগুলো বললে তাঁরা মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাবেন। হয়তো মধ্যরাতের বাড়তি ইনকামের টকশোতে তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ আর থাকবে না। এমন আশঙ্কাতেও কোনও কোনও টকশোর বক্তা ইসলামী শব্দসমূহ কৌশলে এড়িয়ে যান এমনটাই লক্ষ্য করা গেছে। সম্প্রতি অবশ্য টিভির টকশো কমে গেছে। 

আমেরিকা, ইউরোপসহ অনেক দেশে মুসলিমদের কোণঠাসা করবার জোর প্রচেষ্টা চলছে। চিনেতো মুসলিমশিশুদের মুসলিমনাম পর্যন্ত রাখতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। ভারতে মুসলিমদের গরুর গোশত খেতে দেয়া হচ্ছে না। গরুজবাই নিষিদ্ধ। এজন্য হত্যাকা- ঘটে গেছে অনেকগুলো। গরুজবাই করলে যাবজ্জীবন কারাদ-, এমনকি মৃত্যুদ-ের আইন পর্যন্ত পাস হয়েছে কোনও কোনও রাজ্যে। তবে বেশ কয়েকজন ভারতীয় ব্রাহ্মণ গরুগোশত বিদেশে রফতানি করে হাজার হাজার কোটি রুপি কামাই করেন। উল্লেখ্য, গরুজবাই নিষিদ্ধের প্রতিবাদে ভারতের কয়েক জায়গায় মুসলিম-অমুসলিম মিলে উৎসব করে গরুগোশত ভক্ষণ করেছেন।

গরুর গোশত একটি পুষ্টিকর খাদ্য। শুধু মুসলিমরাই এটা খান তা নয়। খৃস্টানরাও খান। আরও অনেকের কাছে গরুর গোশত প্রিয়। কাশ্মীর ও দক্ষিণ ভারতের অনেক ব্রাহ্মণও এটা খুব পছন্দ করেন। বলতে পারেন গরুর গোশত অনেকের ফুডকালচার। এটা বন্ধ করা শুধু অন্যায়ই নয়, অমানবিকও।

এ দেশের শতকরা প্রায় নব্বই ভাগ নাগরিকই মুসলিম। ঈদুল আযহায় এদের গরু কুরবানি করা ও এর গোশত খাওয়া ঈমানভিত্তিক কালচার বা সংস্কৃতি। অনেকে এর সমালোচনা করবার ধৃষ্টতা দেখান। কুরবানি কালচারের বিরুদ্ধে যারা কথা বলেন তাঁরা একরকম আগুন নিয়ে খেলতে চান। কিন্তু এর ভয়াবহ পরিণতি চিন্তা করে সরাসরি অগ্রসর হতে সাহস পান না।

ইসলামের অগ্রসরতা নিয়ে তাঁরা অনেক গবেষণা এবং পরিসংখ্যান চালিয়েছেন। আগামী ৫০ এবং ১০০ বছরে মুসলিমরা হয়তো ইউরোপ ও আমেরিকার কোনও কোনও দেশে জনসংখ্যার দিক থেকে অনেক এগিয়ে যাবেন এমন আতঙ্কেও ভুগছেন বিশ্বনেতাদের কেউ কেউ। তাই তাঁরা অনেক সতর্কতার সঙ্গে ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কর্মতৎপরতা চালাচ্ছেন। ডলার আর ইউরোর তহবিল গঠন করে লোকবল নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন দেশে মিশন পাঠাচ্ছেন। বিভিন্ন সেবাসংঘের মাধ্যমে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোতে তাঁদের কালচারাল সেন্টার খোলা হচ্ছে। এসব সেন্টারে যাতে তরুণ মুসলিমরা আকৃষ্ট হয় তেমন আয়োজনও থাকছে। চিত্তবিনোদনের নামে নারী-মদসহ আরও বহু উপকরণ সরবরাহ করা হয় এসব তথাকথিত কালচারাল সেন্টারে। অবশ্য বাইরে এসব প্রচার করা হয় না। এভাবেই মুসলিম তরুণ-তরুণীদের দলে ভেড়ানো হয়। মেধাবীদের জন্য বিদেশি স্কলারশিপসহ আরও আকর্ষণীয় অফার থাকে। একই কৌশল প্রয়োগ করে প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশটিও বাংলাদেশি মুসলিম তরুণ-তরুণীদের বাগাচ্ছে। প্রতিবছর শতশত ছেলেমেয়েকে দিল্লি, বোম্বে, চেন্নাই, কেরালার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে মগজ ধোলাই করে ছাড়ছে। আমরা টের পাচ্ছি না।

মগজ ধোলাইকৃত তরুণ-তরুণীরা স্যাকুলারিজমের নামাবলি ধারণ করে প্রচার করছে আল্লাহ, রসুল, ইসলাম এগুলো সব কাল্পনিক। এসব আধুনিক যুগে চলে না। আল্লাহ, সালাত, হজ, যাকাত ফালতু ও অনাবশ্যক বিষয়। আর এগুলো বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ। এগুলো এদেশে থাকবে কেন? আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি। এসবের মধ্যে আমরা থাকবো না। তবে তাঁরা আল্লাহর স্থলে স্রষ্টা, প্রভু, ঈশ্বর, বিধাতা, ক্ষেত্রবিশেষে খোদা, ভগবানের মতো শব্দসমূহ অনায়াসে গ্রহণ করে নেন। হরেকৃষ্ণ, হরেরাম ইত্যাদির মতো গান গেয়ে মানুষকে মাতিয়ে রাখেন।

আমাদের তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শহর ও গ্রাম সর্বত্র সব বয়স এবং শ্রেণির নারী-পুরুষ প্রতিবেশী দেশটির টিভি চ্যানেলে চোখ রাখেন। এসব চ্যানেলে সেদেশের সংস্কৃতিসহ পৌরাণিক কাহিনীভিত্তিক সিরিয়াল দেখেন। এগুলো সম্পর্কে কারুর কোনও কথা থাকে না। বলা চলে গোগ্রাসে গেলেন সব। বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য কেবল ইসলাম ও মুসলিমদের সম্পর্কে। কারণ এসবইতো ঢোকানো হয়েছে তাঁদের মাথায়।

সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমদের জঙ্গি, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী প্রভৃতি অভিধা জুটেছে। কোথাও কোনও সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটলেই দায়ী করা হয় মুসলিমদের। এসব ঘটনার নেপথ্যে কারা এবং কেন তা তলিয়ে দেখবার আগেই চাপানো হয় তাঁদের ঘাড়ে। মুসলিমদের কাউকে কেউকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে অথবা কোনও অমুসলিম মুসলিম সেজে ঘটনা ঘটালো কিনা তা ভাবা হয় না। এমন চিন্তাও কেউ করে কিনা আমার জানা নেই। এর অর্থ হচ্ছে ঘটনা যারাই ঘটাক এবং যেভাবেই ঘটুক তা মুসলিমদের ঘাড়ে চাপাতেই হবে। এমন প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছে সবার মধ্যে।

এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার যে, সরাসরি যারা হস্তক্ষেপ করেন না বা করবার সাহস পান না তাঁরা পরোক্ষভাবে ও অতীব বুদ্ধিমত্তাসহকারে কাজ করেন। কালচারাল কার্যক্রম তার মধ্যে অন্যতম। শিক্ষাকার্যক্রমের মাধ্যমেও আগ্রাসন চালানো সহজ। আমাদের দেশসহ মুসলিমবিশ্বের প্রায় সর্বত্র শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে অপসংস্কৃতির। ধোলাই করা হচ্ছে তারুণ্যের মগজ। ফলে আমাদের ছেলেমেয়েদের অনেকে ইসলামবিমুখ হয়ে অন্য সংস্কৃতির পক্ষে কাজ করছেন। এমনকি বাপ-দাদার বিশ্বাস-বোধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন বিনাবাধায়। এরাই বলতে শিখছেন, আল্লাহ, রসুল, সিয়াম, সালাত এসব বিদেশী শব্দ বা ভাষা। তাঁরা বলছেন,  স্রষ্টা, সৃষ্টিকর্তা, বিধাতা। ক্ষেত্রবিশেষে ঈশ্বর, ভগবান, গড। তাঁরা যখন বিস্ময়কর কিছু প্রত্যক্ষ করেন তখন বলেন ‘ও গড’ অথবা ‘হায় ঈশ্বর’। ‘আল্লাহ’ শব্দ তাঁদের মুখ থেকে বেরোয় না। কারণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সিনিয়রদের কাছ থেকে তাঁরা এমনই শিখছেন। এটাই হচ্ছে বড়রকম কালচারাল আগ্রাসন। পাঠ্যবইয়ের ভাষা, শব্দ, এমনকি বিষয়বস্তু পর্যন্ত পাল্টে দেবার উদ্যোগ নিচ্ছেন তাঁদের নিয়োগকৃতরা অতীব সুকৌশলে। এ ব্যাপারে যারা কোনও কথা বলতে চেষ্টা করেন, তাঁদের মৌলবাদী, যুদ্ধাপরাধী, জঙ্গি, পশ্চাৎপদ মোল্লা, মওলবি অভিধা দিয়ে কোণঠাসা করে রাখা হয়। আর এমন ভয়াবহ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলিমদের সিংহভাগই কোনও ধারণা রাখেন না। এর নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার উপায় তাঁদের খুঁজে বের করতে হবে। গড্ডলিকাপ্রবাহে গা-ভাসানো সচেতন ও প্রকৃত মুসলিমের কাজ নয়। হতে পারে না। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ