শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বন্যায় চরম দুর্ভোগ বানভাসী মানুষের

মোস্তাফিজুর রহমান কুড়িগ্রাম থেকে: উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল আর অব্যাহত বৃষ্টির ফলে, গতকাল বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার ৩টি পৌরসভা ও ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৫টি বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। ৩৫৭টি গ্রাম বন্যার পানিতে ভাসছে। জেলার উপরদিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট বড় ১৬টি সদ-নদীর মধ্যে ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার-৫৬ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৮ সেন্টিমিটার ও ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ অবস্থায় জেলার চরাঞ্চলসহ নি¤œাঞ্চলের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে না যাওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে প্রায় দেড় লক্ষাধিক বানভাসী মানুষের। গত এক সপ্তাহের অব্যাহত বন্যায় কর্মহীন হয়ে পড়া বানভাসী অনেক পরিবারের ঘরে খাবারও শেষ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে খেয়ে না খেয়ে দিন পাড় করছেন তারা। সরকারীভাবে ত্রান তৎপরতা শুরু হলেও অপ্রতুলতার কারনে অনেকের ভাগ্যে জুটছে না তা।

জেলার ৯ উপজেলার ৫০ ইউনিয়নের বন্যা কবলিত এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা। পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে ৬শ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলসহ সবজি ক্ষেত।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার পারবতীপুর চরের মজির আলী জানান, গত ১ সপ্তাহ ধরে পারবতীপুর চরের সব ঘর-বাড়ি পানিতে তলিয়ে আছে। বাড়িতে শুকনো জায়গা না থাকায় চুলা জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারনে শুকনো খাবার খেতে হচ্ছে তাদের।

একই চরের সবিরন, রব্বানী জানান, প্রতি বছর বন্যার আগে কিছু খাবার ঘরে মজুদ রাখতেন তারা। কিন্তু এ বছর করোনা পরিস্থিতির কারনে দীর্ঘ সময় কর্মহীন হয়ে পড়ে আছেন তারা। তাই ঘরের সামান্য খাবার শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে ধারদেনা করে একবেলা খেয়ে না খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন পার করছে। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে গো খাদ্যের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

পার্শ্ববতী চর গ্রাম গারুহারা বলদিয়াপাড়ার সুরুজ্জামান ও শাহাজাহান জানান, ঘর-বাড়িতে পানি উঠলেও নৌকা না থাকায় ঘরের চৌকি উঁচু করে সেখানেই বসবাস করছেন তারা। খাদ্য সংকটে ভুগলেও এখন পর্যন্ত সরকারী বা বেসরকারি কোন সহায়তা পৌঁছায়নি তাদের কাছে।

এ ব্যাপারে যাত্রাপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মাইনুদ্দিন ভোলা জানান, যাত্রাপুর ইউনিয়নের ১৫ হাজার পানিবন্দি মানুষের জন্য বুধবার ৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে বিতরণ করা হবে।

এই যাত্রাপুর ইউনিয়নের মতো অবস্থা ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারের অববাহিকার উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, সদর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ি ও রাজারহাট উপজেলার ৫০ ইউনিয়নের আড়াই শতাধিক চরাঞ্চলের। 

অন্যদিকে বন্যার পানিতে ডুবে বুধবার এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় গত তিন তিন শিশুসহ মোট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সুত্র জানায়, বুধবার সকালে উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের জানজায়গীর গ্রামে ১৪ মাস বয়সের মুক্তাসিন নামে এক শিশু বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায়। এছাড়া গত তিন দিনে পানিতে ডুবে চিলমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী গ্রামের শান্ত মিয়া (৫) ও নয়ারহাট ইউনিয়নের জামাল ব্যাপারী(৫৫) এবং নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়নপুর ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের বেলাল হোসেন(৫) নামে এক শিশুর মারা গেছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মো: রেজাউল করিম জানান, জেলার বন্যা কবলিত মানুষের জন্য ৩০২ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবারের জন্য ৩৬ লাখ ৬৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। নতুন করে আরো ১শ মেট্রিক টন চাল ও ১ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে তা দ্রুত বিতরণ করা হবে।

চলনবিলে বন্যার অবনতি

শাহজাহান তাড়াশ থেকেঃ চলনবিলে বন্যার পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই।  সিরাজঞ্জ যমুনার পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ছে বানভাসি মানুষের দুর্গতি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। সেই সাথে বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। রবিবার ( ২৯ জুন) সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল  ইসলাম জানান, গত ২৪ ঘন্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলার কাজিপুর উপজেলা পয়েন্টে  যমুনা নদীর বৃদ্ধি পায় ২৯ সেন্টিমিটার  এবং তা সকালে বিপদসীমার ৫৬ সেন্টিমিটার উপয় দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত  থাকবে বলে জানিয়েছে  বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এদিকে সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার  চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দরিদ্র  অসহায় মানুষেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। তারা সহায়সম্বল, গরু-ছাগল, হাস-মুরগী নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকে ঘরের খাট-চৌকি  দিয়ে মাচাং বানিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জ্বালানি, শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছে বানভাসি পানিবন্দি মানুষেরা।

কাজিপুর  উপজেলার  শুভগাছা  ইউনিয়ন পরিষদের  চেয়ারম্যান এস এম হাবিবুর রহমান জানান, রতনকান্দি হাটখোলা থেকে শুভগাছা ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত  প্রায় দেড় কিলোমিটার  পাকা সড়কটি পানিতে তলিয়ে গেলে আশপাশ এলাকায় পানি ঢুকে ডুবে গেছে দেড় শতাধিক বাড়িঘর, পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত হাজার হাজার মানুষ।  

কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জাহিদ  হাসান  জানান, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের পূর্বদিক দিয়ে নদীর পানি উঁপচে পড়ে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি হাটখোলা- কাজিপুর উপজেলার  শুভগাছা ইউনিয়ন পরিষদ পযন্ত দেড় কিলোমিটার পাকা সড়কটি ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া শুভগাছা ইউনিয়নের পানিবন্দি মানুষদের জন্য ২৩ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পানিবন্দি মানুষদের তালিকা করে তাদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। 

১ হাজার ৫৯ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিম্মজিত 

সিরাজগঞ্জ যমুনা নদীর পানি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়ে সিরাজগঞ্জে বিপদ সীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে চরাঞ্চলে অনেক বাড়িঘর এবং শত শত ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।  সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, যমুনা নদীর পানি গত ২৪ ঘন্টায় ৩৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছেন আগামী ৩দিন বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে । 

এদিকে যমুনার পানি অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সিরাজগঞ্জের করতোয়া ও বড়ালসহ অভ্যন্তরীণ নদ-নদীর পানিও বেড়েই চলেছে। যমুনা নদী অধ্যুষিত জেলার কাজিপুর, সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার প্রায় ৩০ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ার সাথে সাথে এসব উপজেলার চরাঞ্চলের নি¤œঞ্চল তলিয়ে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে গেছে বিভিন্ন ফসল। জেলার ৫টি উপজেলার প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির আখ, পাট, তিল, বাদাম, সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এছাড়া চরাঞ্চলসহ নদী তীরবর্তী এলাকায় দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন।

অপরদিকে, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কাদাই সুইজ গেট ও খোকশাবাড়ী ইউনিয়নের গুনেগাঁতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পুরাতন বাঁধের ভাঙ্গা অংশ দিয়ে যমুনা নদীর পানি প্রবেশ করে গুনেগাঁতি গ্রাম ও পৌরসভার নিম্নাঞ্চল রাণী গ্রামের বাড়ি-ঘরে পানি উঠায় মানুষজন দুর্ভোগে পড়েছে। পৌরসভার রাণীগ্রামে যমুনা নদীর পানি প্রবেশ করায় এই এলাকার লোকজন নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় চলাচল করছে। বানভাসি মানুষেরা পরিবার পরিজন, গৃহস্থালি জিনিষপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে সরকারী স্কুলে আশ্রয় নিচ্ছে এবং অনেকেই অন্যত্র নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম জানান, টানা বৃষ্টিতে যমুনার পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার পাঁচটি উপজেলার প্রায় ৩০টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলগুলোর এক হাজার ৫৯ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নি¤œজীত হয়েছে। এতে বেশিরভাগ ফসলই নষ্ট হয়ে গেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ