শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

ফলের রাজা আমের সাতকাহন

সরদার আবদুর রহমান: ইতিহাসের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। মোগল সম্রাট আকবর তাঁর শাহী দরবারে একবার রাজন্যবর্গকে নিয়ে এক ভোজন বিলাসের আয়োজন করলেন। সম্রাটের প্রিয়ভাজন বীরবলও সেই অনুষ্ঠানে আছেন যথারীতি। বীরবল তৃপ্তির সাথে তার ভোজন পর্ব শেষ করে সম্রাটের কাছে বিনয়ের সাথে জানালেন তার পেটে আর জায়গা ফাঁকা নেই। এমন সময় একজন পরিবেশনকারী পাত্রে আম রেখে গেলেন। বীরবল পাকা আম দেখে লোভ সামলাতে পারলেন না। তিনি বেশ কয়েক টুকরা আম খেয়ে ফেললেন। ঘটনাটি সম্রাটের দৃষ্টি এড়ালো না। সম্রাট একটু রাগের ভঙ্গীতে বীরবলের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। বীরবল সম্রাটের কাছে গিয়ে অনুনয়ের সাথে বলতে থাকলেন- মহামান্য সম্রাট যখন রাস্তা দিয়ে কোথায়ও যেতে শুরু করলে সেই রাস্তায় মানুষের যতোই ভীড় থাকুক, সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়। আপনি যেমন আমাদের সম্রাট তেমনিভাবে আম হচ্ছে ফলের মধ্যে সম্রাট বা রাজা। আপনাকে যেমনভাবে আমরা রাস্তা ছেড়ে দেই তেমনি আম দেখে পেট আপনা আপনি তার মধ্যে জায়গা করে দিয়েছে। এ কারণে আমি ভরা পেটেও আম খেতে পেরেছি। বীরবলের এই যুক্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর শুনে সম্রাট আকবর খুব খুশি হলেন। বীরবলকে পাকা আম ভর্তি ঝুড়িসহ অনেক উপহার প্রদান করলেন। গল্পটি নিছক একটি গল্প নয়। আম সত্যি সত্যিই ফলের রাজা। 

আমকেন্দ্রিক জীবনধারা

বাংলাদেশের বর্তমান প্রাকৃতিক মৌসুম ‘মধুমাস’ হিসেবে পরিচিত নানানপ্রকার ফলের সমারোহ থাকার কারণে। আর এই ফলের রাজা হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে ‘আম’। বলতে গেলে দেশের এক বিশাল এলাকাজুড়ে আমকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ জীবনধারা পরিচালিত হয়।

প্রাচীনকাল থেকেই আমকে ফলের রাজা বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে- গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে, বাড়ির আঙিনা ও আনাচে-কানাচে যে গাছটি সব সময় দেখা যায় সেটি হচ্ছে আম গাছ। কচি অবস্থা থেকে পাকা পর্যন্ত সকল অবস্থাতেই আমের ব্যবহার হয়ে থাকে। ২০১০ সালে নভেম্বর মাসে আম গাছ ‘জাতীয় বৃক্ষ’ হিসেবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপিন্সসহ বিভিন্ন দেশেরও জাতীয় ফল হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত। আম প্রায় ৬ হাজার বছর পূর্ব থেকে চাষ হয়ে আসছে বলে জানা যায়। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, উত্তরপূর্ব ভারত এবং মায়ানমারে এই ফলটির আদি জন্মভূমি বলে বেশিরভাগ ফল বিজ্ঞানীগণ অভিমত পোষণ করেন। এর উৎকর্ষ ঘটেছে ব্যাপক চাষাবাদ এবং পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে। স্বাদে, গন্ধে ও পুষ্টিতে এর জুড়ি নেই। পৃথিবীব্যাপি আমের জনপ্রিয়তা, বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, স্বাদ-গন্ধ ও পুষ্টিমানের বিবেচনায় বিশ্বে এটি একটি আদর্শ ফল। উৎকৃষ্ট জাতের আম স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়।

এমন ফল পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে, যেগুলো আমের মতো বিশাল ঐতিহাসিক পটভূমিতে সমৃদ্ধ। আম বহুবিধ ব্যবহারসম্পন্ন একটি বৃক্ষ হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ফল ছাড়াও গাছের পাতা, বাকল, শিকড়, কাঁচা ও পাকা ফল, ফলের আঁটি বা বীজ ইত্যাদি ওষধি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আম গাছ চিরহরিৎ অর্থাৎ সারা বছর ধরেই সবুজ থাকে। গাছটি প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে, অক্সিজেন পরিত্যাগ করে। গাছটি ঝোঁপবিশিষ্ট ও ঘন ডালপালাযুক্ত হওয়ায় গাছের তলায় প্রচুর ছায়া থাকে, যে কারণে স্বাভাবিকভাবে প্রকৃতিকে শীতল রাখে। সর্বোপরি দূষণমুক্ত পরিবেশ সংরক্ষণে আম গাছের ভূমিকা অনন্য। পুরাতন গাছের কাঠ গৃহ নির্মাণ ও আসবাবপত্র তৈরির কাজে ব্যাপকভাবে আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এছাড়াও গাছের অন্যান্য শাখা প্রশাখা উৎকৃষ্ট জ্বালানিরূপ ব্যবহার হয়।

নদীকেন্দ্রিক উন্নত আমের আবাদ

বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহী, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, বগুড়া ও জয়পুরহাট এলাকায় আম বেশী পরিমাণে জন্মে থাকে। এসকল এলাকার আম উন্নত জাতের। দেশের সর্বাপেক্ষা ও সেরা আম জন্মে মহানন্দা ও এর উপনদী পূণর্ভবার দুইতীরে, পদ্মা তীরবর্তী রাজশাহী মহানগরসহ পবা, চারঘাট ও বাঘা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে। এছাড়াও পদ্মার শাখা নদী বড়াল ও নারদের দুই পাড়ের পুঠিয়া, বড়াইগ্রাম, নাটোর, দূর্গাপুর অঞ্চলের গ্রামগুলোতে উন্নতজাতের আম জন্মে। আত্রাই ও ছোট যমুনার তীরবর্তী মহাদেবপুর, বদলগাছী, নওগাঁ, জয়পুরহাট এ সকল অঞ্চলের গ্রামসমূহে উন্নত জাতের আম জন্মে। অন্যান্য জেলার মধ্যে ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কপোতাক্ষ ও ইছামতির তীরে অবস্থিত কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, যশোর ও সাতক্ষীরার ব্যাপক অঞ্চলে উৎকৃষ্ট জাতের আম উৎপন্ন হয়ে থাকে।

অন্যান্য দেশে আম

বিশ্বের নদ-নদীগুলোর মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে আমাজান নদী অববাহিকায় প্রচুর পরিমাণে আম জন্মে। আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে নীল নদের দেশ মিশর, কঙ্গো নদীর অববাহিকায় জায়ার ও কঙ্গোর বড় একটি অঞ্চল, সোমালিয়ার জুবা ও শেবেলী নদী অববাহিকার বেশ কিছু এলাকা, কেনিয়ার সাবাকি ও টানা নদীর উপকূলীয় অঞ্চল, তাঞ্জানিয়ার রুফিজি নদীর অববাহিকায় আম উৎপাদন হয়। এছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকার অরেঞ্জ নদী অববাহিকায় প্রচুর আমের চাষ হয়ে থাকে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির বড় নদী হচ্ছে নাইজার। এই নদীর অববাহিকা হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার প্রধান আম উৎপাদন এলাকা। এছাড়াও আফ্রিকার দেশ মালি এবং সেনেগালের মধ্যে সেনেগাল নদী অববাহিকাতেও প্রচুর আম জন্মে। পশ্চিম আফ্রিকার অপর একটি দেশ বুরকিনাফাসোর পূর্বের নাম ছিল আপারভোল্টা। বুরকিনা ফাসো নামক এই দেশটিতে নাকাম্বি বা হোয়াইট ভোল্টা এবং নাজিনন বা রেডভোল্টা নামের দুইটি নদীর উপকূলীয় অঞ্চলসমূহে প্রচুর আম জন্মে থাকে। পশ্চিম আফ্রিকার আরেকটি আম উৎপাদক দেশ হচ্ছে আইভরি কোস্ট। এই দেশের সাসান্দ্রা এবং কোমো নামে দুটি নদীর অববাহিকা আম উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। এখানকার আম অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত এবং আকর্ষণীয় কিন্তু আঁশে ভরা।

নামের বাহার আমের

আমের বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ আর মন কেড়ে নেয়া স্বাদ ও গন্ধে মুগ্ধ হয়ে প-িতেরা আমের নামের সাথে বহু অলংকার পরিয়েছেন। আমের সমালংকৃত এসকল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নামগুলো সত্যিই খুব সাযুয্যপূর্ণ এবং চমৎকারিত্বে ভরপুর। আমকে নানারূপে, নানাভাবে ডাকা হয়। যেমন চ্যূত, নৃপপ্রিয়, কামশর, কামবল্লভ, কামাঙ্গ, সুমদন, কীরেষ্ট, পুষ্পশর, কোকিলাবাস, কোকিলোৎসব, পিকরাগ, প্রিয়ঙ্কু, বসন্তদূত, তুঙ্গভীষ্ট, মধুলী, মাদাঢ্য, মাধবট্রম, মন্মথালয়, মধ্বারস, রসাল, সহকার, সীধুরস, সোমধারা ইত্যাদি। এক আমকে নিয়ে এতো কাব্যিক নাম এসেছে আমভক্ত প-িত, কবি ও কাব্য রসিকদের মাধমে। আমকে বলা হচ্ছে চ্যুত। জন্মের পর থেকেই এই ফলটিকে রীতিমতো প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে থেকে শেষমেশ একটি সুন্দর রসালো ফলের আকৃতিতে আসতে হয়। 

নামের বৈচিত্র্য তথা নামকরণের পেছনে অনেক বিষয় কাজ করে। যে স্থান থেকে বা অঞ্চল থেকে নির্দিষ্ট একটি আমের প্রথম উদ্ভব ঘটেছে, সেই স্থানটির নাম রক্ষা করে আমের নামকরণ হয়েছে। যেমন- বোম্বাই, বৃন্দাবনী, মালিহাবাদ, দুসেহরী (লক্ষ্মৌ), রাতাউল (উত্তর প্রদেশ), মির্জাপুরী, জাফনা (শ্রীলংকা), রাজাপুরী (গুজরাট), মালদহ ফজলী, বাঘা ফজলী ইত্যাদি। ব্যক্তির নামে অসংখ্য আমের নাম রয়েছে। বিশেষ ব্যক্তির দীর্ঘ দিনের শ্রম এবং উদ্ভাবনী প্রচেষ্টার গুণে যে আমটির উদ্ভব ঘটেছে, পরবর্তীতে সেই ব্যক্তির নামে আমটি পরিচিতি লাভ করেছে। যেমন বিহারের ফজলী বিবির নামে ফজলী। বেনারসের খোঁড়া ফকিরের নামে ল্যাংড়া। এমনিভাবে আলফানসো, আনোয়ার রাতাউল, মোহাম্মাদওয়ালা, বিশ্বনাথ চ্যাটার্জী, লতিফ আলীওয়ালা, সিদ্দিকপছন্দ, রামপ্রসাদ, মাহমুদা, হিমাউদ্দিন, এডামস, জাহাঙ্গীঁর (তামিলনাড়–) ইত্যাদি। দেবদেবীর নামে আমের সংখ্যা উল্লেখ করার মতো- লক্ষণ ভোগ, সীতাভোগ, কালীভোগ, জগন্নাথভোগ, গোপালভোগ, মোহনভোগ, গোবিন্দভোগ ইত্যাদি। কোন শ্রেণি বা পেশার অথবা বিশিষ্টজনের উপাধি বা পদবীর ভিত্তিতে আমের বহু নাম রয়েছে যেমন- রানী পছন্দ, বেগম পছন্দ, নবাব পছন্দ, শাহ পছন্দ, শাহী পছন্দ, রানী ভবানী, মহারাজ পছন্দ, আলমশাহী, ডক্টর পছন্দ, নাজির পছন্দ, ভাইসরয়, রাজভোগ, বেগমফুলীরাজা, সাফদার পছন্দ, ফকিরওয়ালা, খানবিলাস ইত্যাদি। কোন কোন আমের বৈশিষ্ট্যসূচক নাম রয়েছে যেমন: চিনিচাম্পা, জাফরান, খাজুরী, আনারস, কাঁচামিঠা, বারোমাসি, দুধসর, আশ্বিনা, বৈশাখী, ভাদুরিয়া, ভাদুরি, শ্রাবণী, সফেদা, ক্ষীরপুলি, সিন্দুরী ইত্যাদি। রোমান্টিক নামের অনেক আম রয়েছে। যেমন- দিল পছন্দ, হুসনেআরা, নাজুকবদন, পেয়ারি, সামার বাহিশ্ত। আমের আকার ও সৌষ্ঠবের ভিত্তিতেও নামকরণ হয়েছে। যেমন- হাতীঝুল, পাঁচসেরী, ওমলেট, তোতাপুরী, করেলা, নাগিণ, লাড্ডু, চ্যাপ্টা, গোলা, নাশপাতি, বোতল, লম্বা ভদ্রা ইত্যাদি। আমের বর্ণের (রং) ভিত্তিতেও এর নামকরণ করা হয়েছে- সিন্ধুরিয়া, জাফরান, কালা, স্বর্ণরেখা, জর্দ্দালু, সুরমা, সুবর্ণরেখা, নীলাম্বরী ইত্যাদি। স্বাদ ও গন্ধ নিয়ে অনেক নাম যেমন- রসগোল্লা, মিশ্রিভোগ, মিশ্রিকান্ত, চিনি ফজলী, চিনি বাসা, মিশ্রি দানা, শরবতি, মালাই, দুধিয়া, আনারস, গোলাপখাস, গোলাপজাম, সফেদা, বেলখাস, পেয়ারাফুলি ইত্যাদি।

আমের জাত

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদিত উন্নত জাতের আমের মধ্যে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারে আসছে প্রায় ২৫ জাতের আম। এরমধ্যে অতি উন্নত জাতের আম রয়েছে মাত্র ১০টি। বাংলাদেশে আমের মৌসুম মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত। এদেশে আম পাকার সময় অনুসারে সকল জাতের আমকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়। যেমন: আশু বা আগাম, মধ্য মৌসুমী ও নাবী জাতসমূহ। যে সকল জাতের আম মধ্য মে থেকে মধ্য জুন মাসের মধ্যে পাকে সেগুলো আশু আগাম জাতের। এই জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে গোলাপখাস, গোপালভোগ, বৃন্দাবনী, ক্ষিরসাপাত, রাণীপছন্দ, গৌরজিত, সাটিয়ারকরা (বারি আম-১), গোবিন্দভোগ প্রভৃতি। মধ্য মৌসুমী জাতসমূহ মধ্য জুন থেকে জুন মাসের (আষাঢ় মাস) শেষ দিকে পাকে সেগুলি মধ্য মৌসুমী জাতের অন্তর্ভুক্ত। এ আমগুলোর মধ্যে ল্যাংড়া, কিষাণভোগ, মিশরিভোগ, কোহিতুর, হিমসাগর, লক্ষণভোগ, সূর্যপুরী অন্যতম। নাবী জাতসমূহ জুলাই হতে আগস্ট মাসের শেষ (আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ) অবধি থাকে, সেগুলো নাবি জাতের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো হচ্ছে ফজলী, মোহনভোগ, কুয়াপাহাড়ী, চৌষা, আশ্বিনা ইত্যাদি।

বাংলাদেশে উৎপাদন

বাংলাদেশে প্রায় সব অঞ্চলেই আম উৎপাদন হয়ে থাকে। এক তথ্যে জানা যায় ১৯৬৪-৬৫ সালে রাজশাহীতে (বৃহত্তর) মোট ২১,৪৪৯ একর জমিতে এবং ১৯৬৯-৭০ সালে মোট ২৩,৭৩৫ একর জমিতে আম চাষ হয়। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে ২০১০ সালের আমের মৌসুমে বৃহত্তর রাজশাহী জেলায় মোট ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে চাঁপানবাবগঞ্জ জেলায় ২২ হাজার হেক্টর, রাজশাহী জেলায় ১০ হাজার হেক্টর, নওগাঁ জেলায় ৩ হাজার হেক্টর এবং নাটোর জেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের আমের চাষ হয়েছে। এই জেলাগুলোতে ২০১০ সালে সর্বমোট প্রায় ৩ লক্ষ ২৫ হাজার মেট্টিক টন আম উৎপাদন হয়েছে। এরমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতে উৎপন্ন হয়েছে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার মেট্টিক টন। গত কয়েক বছরে এই উৎপাদন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহত্তর রাজশাহী জেলাতে দেশের মোট উৎপাদনের ৫০% আম উৎপাদন হয়ে থাকে। রাজশাহী বিভাগে দেশের মোট উৎপাদনের ৭০% আম উৎপাদিত হয়ে থাকে। তদুপরি দেশের একমাত্র সুন্দরবন ব্যতীত সকল এলাকাতেই কম বেশী আম উৎপাদিত হচ্ছে। বরিশালসহ দেশের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ  ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম অঞ্চলেও প্রচুর আমগাছ রয়েছে। আমের উৎপাদনও প্রচুর হচ্ছে কিন্তু এগুলো বেশীর ভাগ টক বা চুকা এবং পোকায় আক্রান্ত হয়ে থাকে।

বাণিজ্যের বিস্তার

এই সময় আমকে কেন্দ্র করে কয়েক হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়ে থাকে। বিভিন্ন স্থানে আম পরিবহণের জন্য ঝুঁড়ির ব্যবহার প্রায় অপরিহার্য। তবে বাঁশের ঝুড়ির ব্যবহার কমে এখন তা প্লাস্টিকের ঝুঁড়ি স্থান দখল করেছে। বাগানে আম নামানো থেকে শুরু করে আম পরিবহণ ও বাজারজাত করার কাজে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাত-দিন কর্মমুখর থাকছে। আমকেন্দ্রিক গড়ে ওঠেছে পরিবহন ব্যবসা থেকে শুরু করে আমের ঝুড়ি, ধানের খড়, পুরনো পত্রিকা, প্লাস্টিকের ক্যারেট, চিকন দড়ি এবং কুরিয়ার ব্যবসা। এসব ব্যবসাও হিসেবে কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যায়। কুরিয়ার ব্যবসায়েও কয়েক কোটি টাকা লেনদেন হয়। প্রতিদিন কমপক্ষে অসংখ্য ট্রাক আম পরিবহণ করা হয় রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতি ট্রাকে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ ক্যারেট (প্লাস্টিকের ঝুঁড়ি) আম পাঠানো হয়। এছাড়া স্থানীয়ভাবে আম পরিবহণের কাজে ভ্যান, ভটভটি, নসিমন, করিমনসহ ছোট ছোট ব্যবহৃত হয়ে থাকে। 

আমের ব্যবহার

আমের বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কাঁচা ও পাকা আম থেকে জুস, আমসত্ত্ব, আচার, চাটনিসহ নানাবিধ খাদ্য সামগ্রী প্রস্তুত হচ্ছে। দেশের রাজধানী থেকে শুরু করে দেশে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাট বাজারগুলোতেও এসকল খাদ্য সামগ্রী ব্যাপকভাবে বিক্রি হচ্ছে। সকল বয়সী লোকজনের কাছে এই পণ্যগুলো বেশ সমাদৃত। দেশে আম থেকে প্রস্তুত পানীয় খাদ্যের মধ্যে জুস হচ্ছে প্রধান। এভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সারা বছর আমের স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

আমের ব্যবহারিক দিকও রয়েছে বহুমুখি। আমকে কেন্দ্র করে মৌসুমে আত্মীয়তার নবায়ন ঘটে। এছাড়াও অফিসের সুপার বসকে আকৃষ্ট করা, আটকে থাকা ফাইলের গতি দ্রুত করা, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুশি রাখা কিংবা পদ-পদবির জন্য তববির করা প্রভৃতি কাজে আমের উপঢৌকন হওয়ার যেন জুড়ি নেই। মফস্বল থেকে আমের যেসব পাশের্^ল রাজধানীমুখি হয় তার একটা বড় অংশই জুড়ে থাকে এই উপঢৌকনের বহর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ