বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এত প্রাণহানির দায়ভার কার?

তোফাজ্জল বিন আমীন : জন্মিলে মরিতে হয়। একথা ধ্রুব সত্য। তবে প্রতিটি মানুষের একান্ত মনোবাসনা থাকে স্বাভাবিক মৃত্যু যেন হয়। কিন্তু সবার ভাগ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু জোটেনি। দিন তারিখ সময় দিয়েও মৃত্যু হয় না। স্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে মেনে নিতে মেলা ভার সেখানে অস্বাভাবিক কিংবা দুর্ঘটনার মৃত্য মেনে নেয়া কত যে কষ্টের তা ভুক্তভোগী পরিবার ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারে না। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের রক্ত ঝরছে। সড়কের সাথে পাল্লা দিয়ে নদীতেও  নৌ--দুর্ঘটনা বাড়ছে। দেশের  নৌ--পথে দুর্ঘটনা এটাই প্রথম তা কিন্তু নয়! প্রায় ছয় বছর পর দেশের  নৌ--পথে আবার বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটল। ২০১৪ সালের ৪ আগস্ট মাওয়ার পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ এমএল পিনাক-৬ তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায়। দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চের প্রায় ১০০ জন যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও ১৩২ জন যাত্রীর কোন হদিস মেলেনি। ২৯ জুন বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে মর্নিং বার্ড লঞ্চটি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ডুবে যায়। যে সময় এ লেখাটি লিখছি তখন গণমাধ্যম মারফত জানতে পারলাম ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও কোস্টগার্ড ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে তখনও হয়ত লাশের সংখ্যা আরো বাড়বে। একদিকে কোরানা ভাইরাসের নিষ্ঠুরতা। অন্যদিকে কর্মহীন মানুষের আহাজারি। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ ডুবির মর্মান্তিক ঘটনা। তবে দুর্ঘটনায় নিহত হওয়া স্বজনদের বুকফাটা কান্নার আওয়াজ হাওয়ায় ভাসলেও দুর্ঘটনা থেমে থাকেনি। আরশের মালিকের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তিনি যেন পুরো জাতিকে এরকম মর্মান্তিক দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা করেন।
বাংলাদেশ নদীপ্রধান দেশ। অথচ আমরা ক্ষমতার দাপটে নদীগুলোকে ভরাট করতে কুন্ঠাবোধ করছি না। নদী তার নাব্য হারাচ্ছে। কিছু দিন পর পর নদী দখলদারদের সাথে ইঁদুর বিড়াল খেলার মহড়া প্রদর্শিত হয়। কিন্তু দখল বন্ধ হয় না। এখনো  নৌ--পথ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। আরামদায়ক ও সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে অনেকে নদীপথকে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সুশাসন না থাকায় নদীপথের যাত্রা অনিরাপদ হয়ে উঠছে। ঘটছে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একটি দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আরেকটি দুর্ঘটনা আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। যার জলন্ত প্রমাণ হচ্ছে বুড়িগঙ্গায় যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনা। গত সোমবার বুড়িগঙ্গায় চোখের পলকে ডুবে গেল যাত্রীবাহী লঞ্চটি। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মর্মান্তিক দৃশ্য অবলোকন করল বেশুমার মানুষ। ফরাশগঞ্জ ঘাটের এক দোকানের সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে লঞ্চ দুর্ঘটনার চিত্র পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-চাঁদপুর রুটের ময়ূর-২ লঞ্চটি হঠাৎ পেছনের দিকে ঘুরছিল। ঠিক একই সময়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা মর্নিং বার্ড ফরাশগঞ্জ ঘাটে ভেড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় মর্নিং বার্ড লঞ্চটি ময়ূর-২ লঞ্চকে অতিক্রম করার সময় ময়ূর-২ পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে মনির্ং বার্ড লঞ্চটি অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পানির অতলে হারিয়ে যায়। তীরে দাঁড়িয়ে অনেক লোক এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখছিলেন। বাঁচাও বাঁচাও বলে কয়েকজনের চিৎকারও তারা শুনেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে ভেতরে যাত্রীদের অনেকে বের হতে পারেননি। বাইরে কিছু যাত্রী সাঁতরে তীরে আসতে পারলেও নারী-শিশু এবং বৃদ্ধরা বের হতে পারেননি।
প্রাকৃতিক অনেক দুর্ঘটনা আমরা এড়াতে পারি না। এটা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে নয়, ইচ্ছে করে ছোট লঞ্চকে বড় লঞ্চ ধাক্কা মেরে ডুবিয়ে দেয়ার ঘটনা কি মেনে নেওয়া যায়। এটাকে কি দুর্ঘটনা বলার কোনো সুযোগ আছে? এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এটিকে নির্মম হত্যাকান্ড বলাই শ্রেয়। কারণ  নৌ-চালনা সংক্রান্ত বিধানের যেমন লঙ্ঘন তেমনি এটি দায়িত্বহীন আচরণের মাধ্যমে সংঘটিত একটি হত্যাকান্ড। যারা মারা গেছেন তাদের স্বজনদের কি কোনো সান্তনা পাওয়ার সুযোগ আছে? এই ব্যাপক প্রাণহানির জন্য যারা দায়ী তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল  নৌ-পথে  কান্নার আওয়াজ থামবে। দেশের অধিকাংশ  নৌ-দুর্ঘটনাই তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের মধ্যেই সীমাব্ধ থাকে। এসব প্রতিবেদনে দেখা গেছে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বললেই চলে। কখনও কখনও দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা কিংবা সাময়িক বরখাস্তের শাস্তি দিয়েই দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। এমনকি তদন্ত প্রতিবেদনগুলো ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে যেসব সুপারিশ করে সেগুলোরও বাস্তবায়ন হয় না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৯৯৪ সাল থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত গত ২৬ বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৬৬১টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন প্রায় ৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। অবশ্য সরকারি হিসাবে এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৩১ জন এবং নিখোঁজ প্রায় ১৫০০ জন। এসব ঘটনায় আড়াই শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও চার-পাঁচটি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। গত ছয় বছরে দেশে সংঘটিত ১৩টি  নৌ-দুর্ঘটনায় গঠিত ১৬টি তদন্ত কমিটির মধ্যে ৮টি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে মামলা হলেও বড় ধরনের শাস্তির নজির নেই বললেই চলে।
 দেশের লঞ্চ মালিকরা সারা বছরই অতিরিক্ত যাত্রী বহন করেন। অথচ তা দেখার যেন কেউ নেই। দুর্ঘটনায় মানুষের জীবন চলে গেলে তারপর সরকার তৎপরতা দেখায়। তা যদি দুর্ঘটনা ঘটবার আগে দেখাতে পারতো তাহলে এত মানুষের প্রাণ পানির সাথে মিশে যেত না। সরকার এ দায় কোনভাবেই এড়াতে পারবে না। প্রতি বছর ঈদের সময় অতিরিক্ত যাত্রী বহন রোধে নানা কড়াকড়ি আরোপের কথা ঘোষণা করা হলেও অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করে লঞ্চগুলো। আর তা সরকারের আজ্ঞাবহ বাহিনীর চোখের সামনে দিয়েই প্রতিনিয়ত চলে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ। যাত্রী কল্যাণ সমিতির ভাষ্যমতে ২০১৯ সালে সারাদেশে লঞ্চ, ট্রলার ও  নৌ-কা ডুবির ঘটনা ১১৬টি ঘটেছে। এর মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাক্কার কারণে  ৪৪টি জলযান ডুবেছে। জাতীয়  নৌ-নিরাপত্তা সপ্তাহ ২০১৭ উপলক্ষে  নৌ-,সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি ৫০ বছরে  নৌ-দুর্ঘটনার পরিসখ্যান প্রকাশের আয়োজন করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ৫০ বছরে দেশে  নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিছেন ২০ হাজার ৫০৮ জন। এর মধ্যে গত ১২ বছরের মধ্যে ২০০৭ সালে  নৌ-দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়,যার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৭ জন। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে যার কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। ২০১৫ সালের ২২ ফেব্ররুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে এমভি মোস্তফা নামের যাত্রীবাহী লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৭০ জন যাত্রী নিহত হন। ১৯৯৫ সালে মেঘনার বুকে যাত্রীসহ ডুবে যায় দিনার নামে একটি লঞ্চ। ২০০২ সালে ওই মেঘনায়ই ডুবে যায় যাত্রীবাহী লঞ্চ এমভি নাসরিন খান। ২০০৪ সালে পাগলায় বুড়িগঙ্গা নদীতে এমভি মিতালী ডুবে গেলে ৪০০ জনের বেশি  যাত্রী নিহত হন। ২০০৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি এমভি মহারাজ দুর্ঘটনায় মারা যান ১৫০ জন। ২০০৮ সালের ২৩ মে চাঁদপুরে এমভি লাইটিং সান দুর্ঘটনায় মারা যান প্রায় ৩০০ জন।  নিহতদের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি হিসেবে মতে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনা যে ঘটেছে সে ব্যাপারে কারও দ্বিমত করার সুযোগ নেই। এসব দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও অবশেষে তা আর কোন সুরাহা হয়নি। রাষ্ট্রীয়ভাবে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করার ফলে দিন দিন  নৌ-পথের নিরাপত্তার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যার প্রেক্ষিতে দিন দিন দুর্ঘটনা  নৌ-পথে বেড়েই চলছে।
নৌ-পথের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকারকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুবা তার দায়দায়িত্ব  সরকারকেই নিতে হবে। কারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব তো সরকারের। ফেরি ডুবির ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার মন্ত্রী যদি পদত্যাগ করতে পারেন তাহলে এদেশের মন্ত্রীদের ব্যর্থতার জন্য পদত্যাগ করতে বাধা কোথায়? ক্ষমতার ছত্রছায়ায় ক্রুটিপূর্ণ  নৌ-যান,অদক্ষ চালক ও অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে চলছে? দেশের  নৌ-যান গুলোতে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জাম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যেমন লাইফ জ্যাকেট, ফায়ার বাকেট, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ইত্যাদির অনুপস্থিতির ঘাটতিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। এবারের দুর্ঘটনার বিষয়টি আমলে নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে কার্যকরী পদক্ষেপ ও  নৌ-পথের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষ উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবে এমনটি দেশবাসীর প্রত্যাশা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ