বুধবার ০৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

বাজেট প্রত্যাখ্যান করলেন বিএনপির এমপিরা

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট প্রত্যাখ্যান করে বাজেটের কপি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্যরা গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার গেটের সামনের সড়কে সংক্ষিপ্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে -সংগ্রাম

সংসদ রিপোর্টার: জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট ‘জনগণের বাজেট নয়’ দাবি করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপির এমপিরা। গতকাল বুধবার (১ জুলাই) জাতীয় সংসদের মূল গেটের সামনে বাজেট প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান তারা।
সূচনা বক্তব্যে বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ বলেন, গত একশো বছরে পৃথিবীতে এমন মহামারি আমরা দেখিনি। গত মঙ্গলবার আমরা দেখেছি বাজেট পাস হয়েছে। জনগণকে ফাঁকি দেয়ার জন্য এই বাজেট। আমরা যারা মূল বিরোধী দল বিএনপির সংসদ সদস্য আছি, আমরা যাতে সংসদে এই বাজেট নিয়ে কথা না বলতে পারি, সমালোচনা করতে না পারি সেজন্য মাত্র একদিনের জন্য সাধারণ বাজেট আলোচনা করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আলোচনাবিহিন বাজেট কখনো পাস হয় নাই। আজকে বুধবার এই মহান সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছি, আমরা জনগণের পক্ষে এই বাজেট প্রত্যাখ্যান করছি।
বিএনপির আরেক এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যদের মধ্যে আমাকে সংসদে খুব অল্প সময়ের জন্য বাজেট বক্তৃতায় কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এ বাজেট বক্তৃতার একপর্যায়ে স্পিকার আমার মাইক বন্ধ করে দেন। আমরা বাজেট ঘোষণার আগে একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে, এই বাজেট অধিবেশন ভার্চুয়াল করার জন্য, কিন্তু সেটা করা হয়নি। আমাদের সদস্যদের এই বাজেট প্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা শুধু এটুকু বলতে চাই, যারা মহাজোটের শরিক তারাই বিরোধী দলে অংশগ্রহণ করছে। ফলে জনগণের যে সংকট সেটি সত্যিকার অর্থে সংসদে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তিনি বলেন, আমরা যে কয়েকজন সদস্য সেটা বলার চেষ্টা করি, সেখানে আমাদের সঠিক সময়টুকু দেয়া হচ্ছে না। এই সংকটের মধ্যে যারা জাতিকে পরামর্শ দিতে চায় তাদের সরকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে। আমরা সংসদে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি জানিয়েছি এবং গোটা স্বাস্থ্য বিভাগকে সংস্কারের কথা বলেছি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি, অতিসত্তর করোনা মোকাবিলার জন্য আমাদের রোডম্যাপ দিতে হবে। আমরা অবিলম্বে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি এবং মঙ্গলবার যে অপ্রত্যাশিত এবং অকল্পনীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে, সেটা প্রত্যাখ্যান করছি।
গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয় ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২১ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের কার্যাদি নির্বাহের জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে অর্থপ্রদান ও নির্দিষ্টকরণের কর্তৃত্ব প্রদানের জন্য আনীত বিলটি (নির্দিষ্টকরণ বিল, ২০২০) পাসের প্রস্তাব করলে কণ্ঠভোটে তা পাস হয়। এরপর সংসদে উপস্থিত সবাই টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
গতকাল ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু। নতুন বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। মোট আয় তিন লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। জিডিপি আকার ৩১ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
লিখিত বক্তব্যে বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাজেট অধিবেশন সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। এই অধিবেশনে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে বাজেটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ জাতির স্বার্থেই খুব জরুরি। করোনাকালীন স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেট অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছে সরকার। কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে এই অধিবেশন ডিজিটাল বা ভার্চুয়ালি করার প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। গত ১৫ জুন অনির্ধারিতভাবে ২৩ জুন পর্যন্ত বর্তমান অধিবেশন মুলতবি করে মাত্র এক দিন (২৩ জুন) বাজেটের সাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। এটা অকল্পনীয়। আমাদের বিশ্বাস করোনার মতো ভয়ঙ্কর একটা সংকটে যে যাচ্ছে তাই বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটার সমালোচনা এড়ানোর জন্যই অধিবেশন সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি করে শেষ করতে চেয়েছে সরকার।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসেতো বটেই স্বাধীনতার পর এতটা গুরুত্বপূর্ণ একটা বাজেট এই জাতির জীবনে আসেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দেশ স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়েছে, সেটার কারণে অর্থনৈতিক সংকটকে মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে, কিন্তু দেশের চরম অভ্যন্তরীণ সংকট এবং একই সাথে সারা পৃথিবীর সংকট মিলিয়ে এবারের মতো পরিস্থিতি এই জাতির ইতিহাসে আর আসেনি। আমাদের মনে রাখতে হবে এমনিতেই চরম লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনীতি প্রায় ধ্বংসের কিনারায় পৌঁছে গিয়েছিল। করোনা আসার আগেই ২০১৯ সাল জুড়ে আমরা দেখেছি শুধু রেমিট্যান্স ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির আর সবগুলো সূচক যেমন রফতানি আয়, আমদানির পরিমাণ (বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি), বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ, বেসরকারি বিনিয়োগ, অভ্যন্তরীণ ভোগ কমে যাচ্ছিল।
এমনিতেই ভেঙে পড়া অর্থনীতির সাথে করোনার অভিঘাত যুক্ত হবার ফল হবে ভয়ঙ্কর। এই পরিস্থিতিতে যে অসাধারণ সৃজনশীলতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে এই বাজেট দিয়ে এই বাজেট করা প্রণয়ন করা অত্যাবশ্যক ছিল, বলা বাহুল্য তার কিছুই হয়নি। বরং সব সময়ের মতো একটা প্রাক্কলিত জিডিপির ভিত্তিতে বাজেটের ব্যয়ের খাতগুলোর বরাদ্দ আনুপাতিকভাবে বাড়িয়ে যে বাজেট তৈরি করা হয়েছে সেটাকে প্রতিবারের মতো গতানুগতিকও বলা যায় না। এটা স্রেফ স্বপ্নবিলাস, কল্পণাবিলাস।
বিএনপির এই এমপি বলেন, করোনার সময়ে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘকাল যে মন্দা থাকবে তাতে মানুষের আয় এবং অভ্যন্তরীণ ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়ে রাজস্ব আয়ে চরম ঘাটতি তৈরি হবে। তাই বলা যায়, এই ঘাটতি গিয়ে ঠেকবে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকায়। ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের মূল পদক্ষেপ হবে ঋণ করা। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের এই অকল্পনীয় পরিমাণ টাকা ধার করার ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে আসবে, যা কর্মসংস্থানের পথ একেবারেই বন্ধ করে দেবে। এতেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না, তাই সরকারকে বিপুল পরিমাণের নতুন টাকা ছাপাতে হবে। এই টাকা ছাপানো উচ্চ মূল্যস্ফীতি তৈরি করে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে প্রচ-ভাবে দুর্বল করে দেবে, যার ফল হবে মারাত্মক। এই বাজেট করোনার সময়ে বীভৎস স্বাস্থ্য সংকটে পড়া মানুষের নাভিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেবার বাজেট, এই বাজেট করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া কোটি কোটি অনাহারি মানুষকে দুর্ভিক্ষের মধ্যে ঠেলে দেয়ার বাজেট, এই বাজেট কৃষিকে ধ্বংস করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে ফেলার বাজেট, এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার না করে আরও গভীর মন্দায় ফেলে দেয়ার বাজেট, এই বাজেট দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে ফেলার বাজেট, এই বাজেট দেশের কর্মক্ষম বেকার মানুষকে এবং নতুন করে বেকার হওয়া মানুষকে বেকার রেখে দেয়ার বাজেট, সর্বোপরি এই বাজেট রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটকারীদের আরও সুযোগ বৃদ্ধির বাজেট। একটা অনির্বাচিত, জনগণের কাছে ন্যূনতম জবাবদিহিহীন, আমলাচালিত, ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট সরকারের কাছে এমন বাজেটই প্রত্যাশিত। এই বাজেট আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির দুই এমপি মোশররফ হোসেন, আমিনুল ইসলাম এবং বিএনপি চেয়াপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ