শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

তল্লাশি অভিযানের সমাপ্তি নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৪

গতকাল মঙ্গলবার উদ্ধার হওয়া লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ডের উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে আছে উদ্ধার কর্মীরা। বেলা ১১টার দিকে জাগিয়ে তোলা হয় লঞ্চটিকে -সংগ্রাম

তোফাজ্জল হোসাইন কামাল : ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় দুই দিনে ৩৩ জনের লাশ উদ্ধারের পর তল্লাশি অভিযানের সমাপ্তি টেনেছে বিআইডব্লিউটিএ। নৌ পরিবহন খাতের এ নিয়ন্ত্রক সংস্থার যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, “ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল মর্নিং বার্ডকে টেনে সদরঘাটের কুমিল্লা ডকইয়ার্ডের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভেতরে আর কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। বেলা আড়াইটায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।”
এদিকে, বিকেল পাঁচটার দিকে ডুবে থাকা লঞ্চটির পাশে আরও একটি লাশ ভেসে ওঠে। এর আগে দুপুরে ডুবে যাওয়া লঞ্চে তল্লাশি চালিয়ে এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করা হয়।  এ নিয়ে ৩৪ জনের লাশ উদ্ধার হলো।
ভেসে ওঠা লাশের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন নৌ-পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার আজাদ হোসেন। তিনি বলেন, এই ব্যক্তির বয়স আনুমানিক ৪০ বছর হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিখোঁজের তথ্য থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান চলবে।
এমএল মর্নিং বার্ড নামের ওই লঞ্চটি গত সোমবার সকালে মুন্সিগঞ্জের কাঠপট্টি থেকে যাত্রী নিয়ে সদরঘাটের দিকে আসছিল। শ্যামবাজারের কাছে বুড়িগঙ্গায় ময়ূর-২ নামের আরেকটি বড় লঞ্চের ধাক্কায় সেটি ডুবে যায়। সোমবার দুপুর পর্যন্ত উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থল থেকে ৩০টি মৃতদেহ উদ্ধার করেন। এছাড়া স্থানীয়রা আরও দুজনকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। আর গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নদীতে ডুবে থাকা লঞ্চটির ভেতরে মর্নিং বার্ডের ইঞ্জিন গ্রিজার আশিক হোসেনের লাশ পান ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা। এ নৌ দুর্ঘটনায় সব মিলিয়ে মোট ৩৪ জনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আগে পাওয়া ৩২ জনের লাশ পরিচয় শনাক্তের পর সোমবারই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
লঞ্চডুবির প্রায় ১৩ ঘণ্টা পর রাত সোয়া ১০টার দিকে একজনকে জীবিত উদ্ধারের কথা জানায় ফায়ার সার্ভিস। এখনও কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সোমবার রাতভর তল্লাশির পর এক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টায় আবার তল্লাশি শুরু হয়। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিদের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ এবং বিআইডব্লিউটিএর কর্মীরাও এই অভিযানে অংশ নেন।
নদীর ৬০-৭০ ফুট গভীরে উল্টে থাকা লঞ্চটিকে টেনে তুলতে ১১টি এয়ার লিফটিং ব্যাগ ব্যবহার করা হয়। এর একেকটি ব্যাগ ৮টন ওজন তুলতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর ছোট উদ্ধারকারী জাহাজ দুরন্তও এ কাজে যুক্ত ছিল।
সোমবার দুর্ঘটনার পর সদরঘাটের একটি সিসি ক্যামেরার ভিডিও  সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পেছন দিকে চলতে থাকা ময়ূর-২ এর ধাক্কায় তুলনামূলকভাবে আকারে অনেক ছোট মর্নিং বার্ডকে মুহূর্তের মধ্যে বুড়িগঙ্গায় ডুবে যেতে দেখা যায়।
সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর ওই ভিডিও দেখার কথা জানিয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার যে ধরন, তাতে তার মনে হয়েছে ধাক্কা দেওয়ার বিষয়টি ‘পরিকল্পিত’।
নৌ-০পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ধাক্কা দেওয়া লঞ্চ ময়ূর-২ জব্দ করা হয়েছে।
ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক ও চালক কোথায়?
লঞ্চ ডুবির ঘটনায় দায়ী লঞ্চ ময়ুর-২ এর মালিক ও চালকের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্ঘটনার ৩৬ ঘণ্টা পরও গতকাল রাত সাড়ে ৯টায় এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত তাদের আটক করা যায়নি। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী এই লঞ্চের মালিক, চালক, মাস্টার, সুপারভাইজার কোথায় ? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘটনার পর থেকে তারা সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন।
জানা গেছে, ময়ুর-২ লঞ্চের মালিকের নাম মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদ। ঢাকার বাসিন্দা এই মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদের কোম্পানির নাম সি-হর্স করপোরেশন। তিনি ময়ুর-২ লঞ্চের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন এই কোম্পানির নামে।
ময়ুর-২ লঞ্চের নামে খোলা ফেসবুক পেজে পাওয়া দুটি নম্বরে (০১৭৫৯৯৪৪১৪৪ ও ০১৭৩২৫৫০৫৪৮) যোগাযোগ করেও এই লঞ্চের মালিক, সুকানি, মাস্টার, সুপারভাউজার কাউকেই পাওয়া যায়নি। নম্বর দুটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ময়ূর-২ লঞ্চের চালক শিপন হাওলাদার। যোগাযোগ করা হলে বর্তমানে তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানান। তিনি  বলেন, ‘আমি বেশ কয়েকদিন ধরেই ছুটিতে আছি। ঘটনার সময় আমি  লঞ্চে ছিলাম না।’ তার অবর্তমানে লঞ্চের মাস্টার লঞ্চটি চালাচ্ছিলেন বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, ময়ূর-২ এর আঘাতে ডুবে যাওয়া ‘মর্নিং বার্ড’ লঞ্চের মালিক দুই জন। এরা হলেন, মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন ও আব্দুল গফুর। ‘তালতলা ওয়াটার ওয়েজ’ কোম্পানির নামে রেজিস্ট্রেশন রয়েছে মর্নিং বার্ড লঞ্চের। বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও এই লঞ্চের দুই মালিকের কাউকেই পাওয়া যায়নি।
সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা
নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে মামলা করেছে পুলিশ। নৌ-পুলিশের এসআই শামছুল আলম সোমবার ভোর রাতে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করেন।
ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ সোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার, মাস্টার জাকির হোসেন, স্টাফ শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, হৃদয় ও সুকানি নাসির মৃধার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও পাঁচ-ছয়জনকে সেখানে আসামি করা হয়েছে।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই বাছির উদ্দিন বলেন, মামলায় দন্ডবিধির ২৮০, ৩০৪ (ক), ৩৩৭ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
শরীফের বাড়িতে মাতম
মেয়েটা বাবার খুব আদুরে। সোমবার ইসলাম শরীফ ঢাকায় যাওয়ার সময় ছোট মেয়েটা তার কোল থেকে আসতে চাইছিল না। বারবার বাবার দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল।
১০ মাস বয়সী মেয়ে তৈয়বা শরীফের সঙ্গে তার বাবা ইসলাম শরীফের শেষ স্মৃতিটির কথা বলতে বলতে কাঁদছিলেন তৈয়বার মা জাকিয়া সুলতানা। সোমবার বুড়িগঙ্গা নদীতে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের একজন এই ইসলাম শরীফ (৩৫)। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিম পৌরসভার রিকাবিবাজার এলাকায়। তার মৃত্যুর খবরে বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইসলাম শরীফ মিরকাদিম পৌরসভা এলাকায় হার্ডওয়্যারের ব্যবসা করতেন। দেশে করোনা মহামারির জন্য তিন মাস ধরে বাড়িতে ছিলেন। ঢাকায় যাতায়াত বন্ধ ছিল তার। তিন মাস পর সোমবারই তিনি মালামাল আনার জন্য ঢাকায় যাচ্ছিলেন।
গতকাল  মঙ্গলবার ইসলামের বাবা জাহান শরীফ বলেন, একটাই ছেলে তার। খুব আদরের ছেলে ইসলাম শরীফ।
মেয়ের কান্না ‘বাবা তো আর ফিরে এলেন না’
‘দেশে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি। বাড়ি থেকে বের হলে আক্রান্ত হতে পারি। এই ভয়ে বাবা সবাইকে বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, বাড়ি ফিরে বাজারসদাই থেকে শুরু করে যা যা কাজ আছে, সব তিনি করবেন। কই, বাবা তো আর ফিরে এলেন না!’
এমন কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন ঢাকার সদরঘাটের কাছের বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় নিহত সত্তরঞ্জন বনিকের (৬৫) ছোট মেয়ে জয়া বনিক। নিহত সত্তরঞ্জন বনিকের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রামগোপাল পুরে। নিহতের স্ত্রী, সন্তানেরা যেন শোকে পাথর।
নিহত সত্তরঞ্জন বনিক রাজধানীর পুরান ঢাকার নলগোলায় পাইকারি প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবসা করতেন। তার বড় মেয়ে দোলা বনিক স্বামীসহ রাজধানীর ওয়ারীতে থাকেন। মুন্সিগঞ্জে বাবার বাড়ির আঙিনায় বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘করোনার মধ্যে বাবা প্রতিদিন ঢাকায় আসা–যাওয়া করতেন। বাবাকে আমার বাসায় থেকে ব্যবসা করতে বলেছিলাম। বাবাও থাকতে রাজি হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবারও আমার বাড়িতে ছিলেন। ছোট ভাইটা অসুস্থ থাকায় বাবা মুন্সিগঞ্জের বাড়ি চলে যান। সাধারণ ছুটির পর থেকে পৌনে আটটার লঞ্চে ঢাকা যেতেন। বাবার সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো। রাগ করে রোববার কথা বলিনি। ভেবে ছিলাম সোমবার দুপুরে ফোন দেব। বাবাকে ফোন দিলাম কিন্তু আর কথা হলো না।’
স্বামীর কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন স্ত্রী রত্না বনিক। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের বাড়ি থেকে বার হইতে না করছিল। তিনিই যে বাড়ি ফিরবেন না, কে জানত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ