শনিবার ০৪ ডিসেম্বর ২০২১
Online Edition

লঞ্চডুবি না হত্যাকাণ্ড

গত সোমবার সকালে রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীতে এক কথিত লঞ্চডুবিতে অন্তত ৩৩ জন যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। নিখোঁজ রয়েছে আরো অনেকে, যাদের প্রকৃত সংখ্যা লঞ্চ মালিকসহ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেননি।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার পাশাপাশি সিসিটিভির ফুটেজ থেকে যেসব তথ্য জানা গেছে, সেসবের ভিত্তিতে ঘটনাটিকে নিতান্ত দুর্ঘটনা বা সাধারণ লঞ্চডুবি বলে পাশ  কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। কারণ,  ডুবে যাওয়া এবং ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ রুটে চলাচলকারী এমএল মর্নিং বার্ড মাত্র ৭০ ফুট দীর্ঘ একটি ক্ষুদ্র লঞ্চ।  এর প্রস্থও মাত্র ১৬ ফুট। দোতলা এ লঞ্চটির ধারণ ক্ষমতা মাত্র ৯০ জন- যদিও ডুবে যাওয়ার সময় এতে আরো বেশি যাত্রী ছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী ময়ুর-২ নামের লঞ্চটির দৈর্ঘ্য ১৭৫ ফুট এবং এর ধারণ ক্ষমতা ৬৭৯ জন। মর্নিং বার্ড-এর তুলনায় প্রায় চার গুণ বড় লঞ্চটি তিনতলা। এতে যাত্রীও অনেক বেশি ছিল। বিভিন্ন বর্ণনায় তো বটেই, সিসিটিভির ফুটেজেও দেখা গেছে, চলন্ত লঞ্চ মর্নিং বার্ড-এর ওপর সরাসরি উঠে গেছে বিরাট আকারের ময়ুর-২। ফলে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মর্নিং বার্ড বুড়িগঙ্গায় ডুবে মৃত্যু ঘটিয়েছে অসংখ্য যাত্রীর। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি প্রশ্ন ও রহস্যের সৃষ্টি করেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে স্বয়ং নৌ প্রতিমন্ত্রী পর্যন্ত না বলে পারেননি যে, এটা মোটেও দুর্ঘটনা নয় বরং পরিকল্পিত এক হত্যাকান্ড। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে ময়ুর-২ এর চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী। উল্লেখ্য, ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছে লঞ্চের চালকসহ অন্য সব কর্মচারী। এর ফলেও সন্দেহ ঘনীভ’ত হয়েছে।
লঞ্চডুবি হিসেবে বর্ণিত দুর্ঘটনায় নিহতদের কফিনে মোড়ানো যে ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে তা দেখে কোনো সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেই শোকাহত না হয়ে উপায় থাকে না। আমরাও গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং নিহত সকলের স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। নৌ প্রতিমন্ত্রীর মতো আমরাও মনে করি, এটা অদৌ কোনো দুর্ঘটনা নয়। কারণ, সোমবার সকালে যখন ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে তখন আবহাওয়া ছিল সুন্দর ও স্বাভাবিক। ঝড়-বৃষ্টির কোনো লক্ষণ পর্যন্ত ছিল না।
সুতরাং এমন কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যে, ময়ুর-২ এর চালক চলন্ত মর্নিং বার্ডকে দেখতে পায়নি। এজন্যই অভিযোগ উঠেছে, চালক আসলে ইচ্ছাকৃতভাবে তার লঞ্চটিকে মর্নিং বার্ড-এর ওপর উঠিয়ে দিয়েছিল। একই কারণে নৌ প্রতিমন্ত্রী একে পরিকল্পিত হত্যাকান্ড বলে মন্তব্য করেছেন। হতেই পারে, দুই লঞ্চ মালিকদের মধ্যে আগে থেকে কোনো কারণে শত্রুতা ছিল এবং এই হত্যাকান্ডের মাধ্যমে ময়ুর-২ এর মালিক পক্ষ নিজেদের ক্ষোভ মিটিয়েছে। শত্রুতার বিষয়ে প্রতিশোধ নিয়েছে।
আমরা অবশ্য অনুমান-নির্ভর কোনো বক্তব্য দেয়ার বা মন্তব্য করার পক্ষপাতী নই। নৌ প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে যেহেতু তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে সেহেতু এ ব্যাপারে অপেক্ষা করা উচিত। তবে বিষয়টিকে হাল্কাভাবে নেয়ার কিংবা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বিশেষ করে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহার কারণে। কেননা, ঈদ উপলক্ষে সড়ক পথের মতো নৌপথেও লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করবে। সে সময়ে বৃষ্টিপাতেরও সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া লঞ্চ ও স্টিমার মালিক-চালকদের মধ্যে যাত্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি হতে পারে যথারীতি।
এসব কারণেই আগাম এবং  সতর্কতামূলক কিছু ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ফিটনেসহীন কোনো লঞ্চ বা স্টিমার যাতে চলাচল করতে না পারে, কোনো লঞ্চ-স্টিমারেই যাতে ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী ওঠানো না হয়, সকল চালক যাতে আইন মেনে চলতে বাধ্য হয় এবং কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি যাতে না ঘটেÑ এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে। আমরা চাই, কোনো কারণেই যাতে  পবিত্র ঈদুল  আযহার আনন্দ থেকে জনগণ বঞ্চিত না হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ