শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

জীবনটা যখন তাসের ঘর

আবদুল জব্বার: পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের জন্ম যেমন অনিবার্য মৃত্যুও তেমনি অনিবার্য। এই অনিবার্য সত্যকে উপেক্ষা করার জো কোন প্রাণের নেই। করোনা তাবৎ পৃথিবীর সমস্ত শক্তিমান প্রাণের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করলো খামোস! ¯্রষ্টার শক্তিকে উপেক্ষা করার শক্তি কারো নেই! ক’মাস ধরে পৃথিবীর আকাশপথ ও পানিপথ থমকে গেছে, অনেকটা নিস্তব্ধ স্থল পথ, সর্বত্র যেন নীরবতা। হোটেলে মোটেলে পার্কে মাঠেঘাটের কোলাহল ও আমোদ ফূর্তির সব আয়োজন লকডাউনে । মৃত্যু যেন সকাল সন্ধ্যা দরজায় কড়া নাড়ছে। দৃশ্যপটে জানান দিচ্ছে জীবনটা আসলেই তাসের ঘর। মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষ অযথা পৃথিবীর সব বৃথা আয়োজনের পিছনে ছুটছে। এরপরেও থেমে নেই ঠকবাজি, লুটপাট, অমানবিকতা ও জীবনের পথপরিক্রমা। অপলকেই জীবন ঘড়ি থমকে যায়।

গত ১১/০৬/২০২০ আমার ছোট ফুফুর বড় ছেলে আমাদের ফুফাত ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পেলাম। শুনেছি তিনি ক’দিন আগে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে শুনলাম ষ্ট্রোক করে ইন্তিকাল করেছেন। আমাদের সাথে ফুফাত ভাইদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল অন্যরকম। আমরা তার মৃত্যুকে এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। কিন্তু এটিই বাস্তব সত্য।

গত ক’মাস ধরে চারপাশে কত পরিচিত মুখ আমাদের ছেড়ে পরোপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তার হিসাব কষা এখন বেশ কষ্টসাধ্য। যা আমরা কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিন পৃথিবীর জনপদে জনপদে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সেই অনিবার্য মৃত্যুকে প্রতিহত করতে চেষ্টার অন্ত নেই। দুনিয়ার বিখ্যাত বিজ্ঞান গবেষণাগারসমূহ করোনা প্রতিষেধক  তৈরি করতে ব্যতিব্যস্ত কিন্তু এখনো আশানুরূপ কোন অগ্রগতির খবর বিশ্ববাসীর সামনে মেলেনি। অসহায়ত্ব প্রকাশ করে শক্তিমান শাসকরা বলছে আমরা অসহায়! আকাশের মালিকের সাহায্য ছাড়া পরিত্রাণের উপায় নেই!

এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যপট! করোনাক্রান্ত বাবা, মা, সন্তান অথবা কোন নিকটজনের জানাযা, কবরস্থ করতে, শেষ বিদায় দিতে পারছে না তার স্বজন। অদেখা করোনা ভাইরাসের ভয়ে অসুস্থ স্বজনের সেবা দিতে অপারগ আপনজন! গ্লোবালসিটি পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

চাকরি হারাচ্ছে, কর্মসংস্থান বন্ধ হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীনতার কারণে বাঁচার তাগিদে মধ্যবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে ফিরছে। সর্বত্র অসম্ভব এক অস্থিরতা কাজ করছে। এ যেন জীবনের এক অনিশ্চিত গন্তব্য! মাসের পর মাস শিশু-কিশোররা ঘরবন্দী। তাদের শিক্ষালয় বন্ধ। অবুঝ শিশুরা আঁচ করতে পারছে না কেন তারা শিক্ষালয়ে যাচ্ছে না! কেন তারা খেলার সাথীদের সাথে খেলতে পারছে না! সুস্থ, অসুস্থ সবাই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার একালে সাঁজানো গোছানো সকল আয়োজন স্তব্ধ। জীবনের চলমান দ্রুতযান হঠাৎ থমকে গেছে।

এরপরও অসভ্যদের সভ্যতা ফিরে আসেনি। যে সময়টিতে মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। দেশের শাসকগোষ্ঠী জানমালের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্দ ঘোষণা করেছে। কিন্তু সরকারি দলের সমর্থকরা জনগণের সেই বরাদ্দকে নিজের আখের গোছাতে গোগ্রাসে লুটছে!

গত দুই মাসে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা ও ভঙ্গুর অবস্থার ভয়াবহ চিত্র পরিষ্কার হয়েছে। এখানে শুধুই হাকডাক, কাজে ঠনঠন! সরকারিভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে সীমিত আকারে করোনা পরীক্ষা চললেও ক’দিন ধরে কীটের অভাবে তাও বন্ধ হতে চলছে। মিডিয়ার কল্যাণে জানা গেছে, সেই কীট এখন মুনাফালোভীদের খপ্পরে মওজুদ রয়েছে, এতে নাকি স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়েরও হাত আছে! এমন অভিযোগ তুলেছেন খোদ আওয়ামী লীগের নেতারা।

করোনা পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রী নিয়ন্ত্রণের বাইরে! করোনা রুগীদের হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসার অভাবে বাসায় অথবা হাসপাতালে নেয়ার পথেই প্রাণ হারাচ্ছে রুগী! মারাতœকভাবে অসুস্থ করোনা রুগীদের আইসিইউর জন্য হাহাকার! আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ব্যয় অসাধ্যের সাধণ! যা সিংহভাগ মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব! জানি না এ জাতির কপালে শেষতক কী আছে!

সবাইকে পৃথিবী ছাড়তে হবে। আস্তিক-নাস্তিক, সভ্য-অসভ্য, ভাল-মন্দ । কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে প্রস্থান করলেও তাদের জন্য মানুষের ভালবাসা ও সম্মান  থেকে যায় অটুট! আবার কিছু মানুষের জন্য অভিশাপ ও ঘৃণা! আমাদের মাঝে কেউ করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হলে দোয়ার ঝড় উঠে আবার কেউ আক্রান্ত হলে অকল্যাণের ঝড়! এসব কিছুই ব্যক্তির হাতের কামাই।

মানুষ যেহেতু সৃষ্টির সেরা জীব, তাদের উচিত সেরা কাজটা করা। বর্তমান বৈশ্বিক মহামারিতে সেরা কাজটি হলো সামর্থ্যবান প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান অসহায়, অসুস্থ, দরিদ্র, কর্মহীন ব্যক্তি ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। কারণ আপনি আজকে পৃথীবির সকল আয়োজনকে পিছনে ফেলে সীমাহীন গন্তব্যে, হয়ত এরপর আমার পালা। আমি আপনি প্রস্তুত থাকি আর না থাকি মৃত্যু আমাকে আপনাকে গ্রাস করবেই। আল্লাহ তা’য়ালা বিশ্বাসীদের জন্য এই দুনিয়াকে ক্ষণস্থায়ী ও পরীক্ষা ক্ষেত্র হিসাবে তৈরি করেছেন। সুতরাং বুদ্ধিমানরা কখনো অস্থায়ী বা অলাভজনক বিষয়ে ব্যতিব্যস্ত না হয়ে প্রকৃত কল্যাণ লাভের প্রত্যাশায় অভীষ্ট লক্ষ্যার্জনে সর্বশক্তি ও পুঁজি আতœনিয়োগ করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে জীবনটা যেন তাসের ঘর!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ