শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

করোনা এবং জাতীয় অর্থনীতি

আশিকুল হামিদ: করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর আক্রমণে বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি এরইমধ্যে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামনে রয়েছে আরো কঠিন এবং অনিশ্চিত সময়। এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণা রিপোর্টে। যেমন গত ৮ জুন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি জানিয়েছে, ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির আড়ালে ৬৬ দিনের লকডাউনে নতুন করে ৫ কোটি ৯৫ লাখ মানুষ গরীব ও অতিদরিদ্র হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পর কিছু আশংকাজনক তথ্য-পরিসংখ্যান জানিয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা- বিআইডিএস। ব্যাপক জরিপশেষে গত ২৪ জুন প্রকাশিত সংস্থাটির এক গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনার কারণে দেশের এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরীব বা দরিদ্র হয়ে পড়েছে। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর কারণে মানুষের আয় কমে গেছে, বেড়েছে বেকারত্ব। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারাই, যাদের আয় কম। এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয়ের উৎসই বন্ধ হয়ে গেছে।

ওদিকে ব্র্যাকসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ জরিপশেষে গত ১ জুন প্রকাশিত অন্য এক গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, করোনাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সংকটে দেশের ৭৪ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে আশংকাজনক হারে। একযোগে মারাত্মকভাবে বেড়েছে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও। ওই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, করোনা ভাইরাসের অশুভ প্রভাবে দেশের ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে যেমন পড়েছে তেমনি পড়েছে স্বাস্থ্যগত দর্বলতার ঝুঁকিতেও। উপার্জন কমে গেছে ৭৪ শতাংশ পরিবারের। ওদিকে ১৪ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে অথবা ফিরে আসার পর্যায়ে রয়েছে।

তিন সংস্থার ওই গবেষণা রিপোর্টে জানা গেছে, দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক সংকট এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা জগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষই এখন চরম দরিদ্রÑ যাদের দৈনিক আয় ১ দশমিক ৯ মার্কিন ডলার। এদের মধ্যে নতুন দরিদ্র হয়ে পড়া পরিবারগুলোও রয়েছে। উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকা চরম দরিদ্রদের সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখে পৌঁছেছে। পাশাপাশি উচ্চ স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে রয়েছে ৩ কোটি ৬৩ লাখ মানুষ। জরিপকালে যেসব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেসব পরিবারের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশের অন্তত একজন সদস্য বিগত দুই-আড়াই মাসের মধ্যে চাকরি হারিয়েছে। আর গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে গড় পারিবারিক উপার্জন কমে গেছে ৭৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দিনমজুর ও রিকশাচালকসহ যারা দিন এনে দিন খাওয়াদের দলে পড়ে।

শুধু আয় বা উপার্জন কমে যায়নি, অনেকের উপার্জন একেবারে বন্ধও হয়ে গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নি¤œ আয়ের এবং উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষদেরই করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। চিকিৎসা পাওয়ার এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাও তাদের নেই বললেই চলে। এসব পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হলে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিশ্চিতভাবে অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার হতে হবে। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষেও তাদেরই মৃত্যু ঘটবে বেশি। গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, সরকারের দেয়া খাদ্য ও নগদ সহায়তার খুব কম অংশই প্রকৃত অভাবী ও দরিদ্রদের ভাগ্যে জুটেছে। এক্ষেত্রেও দলীয় লুটেরাদেরই তৎপর দেখা গেছে-যাদের কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রাথমিক দিনগুলোতে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত তার ‘ভাগের’ কম্বল পাননি। সেই একই ‘চাটার দল’ এখনও সমানভাবেই তৎপর রয়েছে!

ওদিকে করোনার কারণে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে দেশের উৎপাদন খাতে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের রফতানি কমেছে ৮৪ শতাংশ। এর প্রতিক্রিয়ায় গত ৭ এপ্রিলের মধ্যে এক হাজার ১১৬টি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চাকরি হারিয়েছে প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক। আরো অনেক কারণেই প্রচন্ড চাপের মুখে পড়েছে জাতীয় অর্থনীতি। করোনাকে এক পাশে রেখেও বলা দরকার, অর্থনীতির কোনো খাতের সূচকই সাধারণভাবে আশাবাদের সৃষ্টি করতে পারেনি। মূল্যস্ফীতির কথাই ধরা যাক। বাজারদর স্থিতিশীল রয়েছে বলে প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তবে করোনা পরিস্থিতির আগে থেকেই প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি বাড়ছে মূল্যস্ফীতিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান জানিয়েছে, ২০১৮ সালের শেষ থেকে ২০২০ সালের প্রথম পর্যন্ত সময়ে দেশের মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৯ সালের শুরু থেকে বেড়ে আসা মূল্যস্ফীতি চলতি বছরের মার্চ মাস শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনার পাশাপাশি ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির খবর অত্যন্ত আশংকাজনক। কারণ, অর্থনীতির নিয়ম ও ব্যাখ্যার মূলকথা হলো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকার অংকে পণ্য ও পণ্যসেবার মূল্য বেড়ে গেলে তাকেই মূল্যস্ফীতি বলা হয়। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশে পণ্যের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আগে ১০০ টাকায় যে পণ্য কেনা যেতো সেটাই এখন ১০৫ দশমিক ৫৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এটা অবশ্য কাগজে-কলমে গবেষণার তথ্য। অন্যদিকে বাস্তবে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে অনেক বেশিÑ যে সম্পর্কিত সঠিক তথ্য পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। প্রসঙ্গক্রমে যানবাহনে ভাড়া বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা দরকার। মালিকদের স্বার্থে এক লাফেই সরকার ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়িয়েছেÑ যে কোনো দেশের জন্যই যা এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত। এদিকে বাজেটের পরপর অন্য সব পণ্যের সঙ্গে ডিমের মূল্য ডজনেই বেড়েছে ১০ টাকা।

উদ্বেগের কারণ হলো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপই এখনো সরকারকে নিতে দেখা যাচ্ছে না। অথচ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমে যায়। এতে বেশি বিপদে পড়েছে বিশেষ করে নি¤œ ও সীমিত আয়ের মানুষেরা। নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্ত হিসেবে পরিচিতদের-লজ্জায় যারা নিজেদের অক্ষমতা ও দুরবস্থার কথা বলতেও পারেন না। 

বলা দরকার, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যখন কথায় কথায় সিঙ্গাপুরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ভাষণ দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর ওঠানোর সুযোগ নেই। কারণ, ভারতের শুধু নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের উদাহরণও বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক। শ্রীলংকার কথাই ধরা যাক। ২০১৮-১৯ সালে সার্কের এই সদস্য রাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির হার ছিল এক শতাংশেরও অনেক নিচে-মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানও বাংলাদেশকে লজ্জায় ফেলেছে। কারণ, ২০১৮-১৯ সালে মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মূল্যস্ফীতি ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এ ধরনের বৃদ্ধিকে কোনো গুরুত্বই দেয়া চলে না। 

বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে উদ্বেগের কারণ আসলে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা। ২০১৮ সালের শেষদিকেও যেখানে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মার্চশেষে একই মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছেছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশে। এরপর এসেছে করোনার ধাক্কা। এভাবে বাড়তে থাকলে জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তিই শুধু বাড়বে না, একই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেও। সে কারণে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং বলিষ্ঠ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও ভারতের পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ আফগানিস্তানও যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং কমিয়ে আনতে পারে তাহলে বাংলাদেশেও সেটা সহজেই সম্ভব হওয়া উচিত। এজন্য দরকার শুধু সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং সরকারের সদিচ্ছার। এদিকে জাতীয় অর্থনীতির দ্বিতীয় প্রধান বিষয় হিসেবে সম্প্রতি আবারও বেকারত্ব নিয়ে জোর 

আলোচনা শুরু হয়েছে। করোনার অশুভ প্রভাবে তৈরি পোশাক শিল্পে অন্তত ২২ লাখ মানুষের বেকার হয়ে পড়ার তথ্য আগেই জানানো হয়েছে। এরই পাশাপাশি গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, দেশে শিক্ষিতসহ বেকারের সংখ্যা যখন লাখের অংকে বেড়ে চলেছে তেমন এক সময়ে গার্মেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে শুরু হয়েছে ঢালাও ছাঁটাই কার্যক্রম। বিভিন্ন কোম্পানি যুক্তি দেখিয়ে জানিয়েছে, তাদের মুনাফা তথা আয় নাকি অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে! যেমন একটি কেবলস কোম্পানির যুক্তি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটি যেখানে ১১৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা আয় বা মুনাফা করেছিল, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে সেখানে আয় হয়েছে মাত্র ২৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর ফলে এক বছরের ব্যবধানেই কোম্পানিটির মুনাফা নাকি ৭৮ দশমিক ২৪ শতাংশ কমেছে! 

অন্য সব দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক কোম্পানির অবস্থাও প্রায় একই রকম। এসবের মধ্যে বেশি বিস্ময়ের কারণ ঘটিয়েছে ‘রমরমা’ বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানিগুলো। এসব কোম্পানির পাশাপাশি ব্যাংক-বীমাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও ছাঁটাই কার্যক্রম চলছে পাল্লা দিয়ে। ছাঁটাইয়ের কর্মকান্ডে বীমা কোম্পানিগুলো শ্রম আইন লংঘন করেছে এবং কাউকেই আগে নোটিস দিয়ে জানায়নি। প্রায় সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানতে পেরেছেন অফিসে ঢুকতে যাওয়ার সময়। তারা অফিসে ঢুকতে পারেননি। পরে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, তাদের চাকরি নেই। অর্থাৎ বিনা নোটিসে তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট এসব কোম্পানি যথেচ্ছভাবে লুণ্ঠন তো করেছেই, হাজার কোটি টাকার অংকে অর্থও পাচার করেছে বিদেশে। 

এভাবে গার্মেন্ট কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বিচারে ছাঁটাই কার্যক্রম চালানোর ফলে বেকার হয়ে পড়ছেন হাজার হাজার মানুষ। একযোগে ভীড় বাড়ছে বেকার তথা চাকরি প্রত্যাশীদের বাজারে। বিআইডিএস ও সিপিডিসহ অর্থনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের জরিপ রিপোর্টের ভিত্তিতে জানিয়েছে, বেকারের সংখ্যা বাড়লেও সে তুলনায় চাকরির সুযোগ বাড়ছে না। ফলে চাকরিও পাচ্ছে না বেকাররা। চাকরি প্রত্যাশীদের সংখ্যা বরং বেড়ে চলেছে অবিশ্বাস্য হারে। 

অন্য বিভিন্ন দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও এ ধরনের পরিসংখ্যানের সত্যতা পাওয়া গেছে। যেমন রাষ্ট্রীয় গবেষণা সংস্থা বিবিএসÑ বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিক্সের পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, দেশের প্রতি তিনজন যুবকের মধ্যে একজন বেকার। ওদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৯ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আইএলও’র একই রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। 

এভাবে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট ও পরিসংখ্যানের উল্লেখে যাওয়ার পরিবর্তে এক কথায় বলা যায়, উন্নয়নের বিচারে বাস্তবে দেশ এখনো অনেক পেছনেই পড়ে আছে। এই মুহূর্তে কথায় কথায় করোনাকে দায়ী করা হলেও অর্থনীতিবিদ ও তথ্যাভিজ্ঞরা এমন অবস্থার প্রধান কারণ হিসেবে বিনিয়োগ না বাড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, বিশেষ করে শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে বিনিয়োগের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে বলেই চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে বেকারের সংখ্যা শুধু বেড়েই চলছে না, তাদের মিছিলও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সিপিডি’র হিসাবে দেশের শ্রম বাজারে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় আট লাখ বেকারÑ যাদের মধ্যে শিক্ষিত তরুণদের সংখ্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উদ্বেগের কারণ হলো, দেশে যেখানে চাকরিই পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো নতুন কাউকে চাকরি দেয়ার পরিবর্তে উল্টো ঢালাওভাবে ছাঁটাই কার্যক্রমকে জোরদার করেছে। হাজার হাজার চাকরিজীবীকে নীরবে ছাঁটাই করা হচ্ছে এবং প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই শ্রম আইন মানা হচ্ছে না। 

বর্তমানে চলমান এই ছাঁটাই কার্যক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের উচিত ছাঁটাই বন্ধ করার জন্য কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা। সরকারকে একই সঙ্গে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেও সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ব্যাপারে বিশেষ করে বিদেশি শিল্প উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট ও উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেয়া দরকার। কথাটা বলার কারণ, নিকট অতীতেও দেখা গেছে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য জমি কেনা ও তার রেজিস্ট্রেশন করা থেকে গ্যাস-পানি ও বিদ্যুতের সংযোগ পাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে প্রধানত ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসা বহু শিল্প উদ্যোক্তা মাঝপথে থেমে পড়তে বাধ্য হয়েছেন। তাদের অনেকে এমনকি ভারত ও ইন্দোনেশিয়াসহ আশপাশের অন্য দেশগুলোতে গিয়ে বিনিয়োগ করেছেন।

পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলা দরকার, জাতীয় অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক এ অবস্থার শুধু অবসান ঘটালে চলবে না, পাশাপাশি এমন পরিবেশও সৃষ্টি করতে হবে, বিদেশিরা যাতে আস্থার সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন। সব মিলিয়ে শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে দেশে একদিকে শিল্পায়ন যেমন ঘটবে অন্যদিকে তেমনি বেকার সমস্যারও সমাধান হবে অনেকাংশে। সে লক্ষ্যেই সরকারের উচিত দ্রুত উদ্যোগী হয়ে ওঠা। এই কঠিন সত্য অনুধাবন করতে হবে যে, করোনার সংকট স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে না। কিন্তু দেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। এজন্য চিকিৎসার সমন্বিত ব্যবস্থা যেমন দরকার তেমনি দরকার চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা, মানুষ যাতে খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। মানুষকে যাতে দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে মরতে না হয়। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ