শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

কোথায় যাবে মধ্যবিত্তরা?

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন: করোনা ভাইরাস বর্তমান বিশ্বের এক মহামারির নাম। অদৃশ্য এই ভাইরাসের নিষ্ঠুরতা পুরো বিশ্ব ক্ষতবিক্ষত। আক্রান্ত ও মৃত্যের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। মৃত্যুর মিছিল দীঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তবু থামছে না নিষ্ঠুরতা। যারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন তারা টের পেয়েছেন করোনা কি জিনিস? আরশের মালিকের কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি তিনি যেন করোনা নামক ভাইরাসের গজব থেকে সমগ্র জাতিকে রক্ষা করেন। আমরা আল্লাহতায়ালার সাথে আদি যে ওয়াদা করেছিলাম তা বেমালুম ভুলে গেছি। আর ভুলে গেছে বলেই এখন পৃথিবীতে ফিল্মি স্টাইলে জুলুম-নির্যাতন, অসষ্ণিুতা, প্রহসন-প্রতারণার বিভীষিকা চলছে। এতদিন যারা পৃথিবীর সুপার পাওয়ার বলে হুঙ্কার দিতো তারাও আজ ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করছে। করোনা গজব নাকি আর্শিবাদ তা বলতে পারব না। কিন্ত মানুষ চিনতে করোনা সাহায্য করেছে। কারণ সন্তান বাবা-মাকে চিনছে না। বাবা-মা কলিজার টুকরা সন্তানকে চিনছে না। স্বামী স্ত্রীকে চিনছে না। স্ত্রী স্বামীকে চিনছে না। ভাই বোনকে চিনছে না। বোন ভাইকে চিনছে না। মৃত স্বজনের লাশ কেউ গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। এরকম ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটবে তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। অথচ করোনা পরিস্থিতিতে কোথাও কোথাও এসব ঘটনা হরহামেশাই ঘটেছে। বিশ্বে ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য একের পর এক আনবিক বোমার পরীক্ষা চলছে। নিউক্লিয়ার ও মিসাইল আজ যেন কোনো কাজে আসছে না। অবৈধ উপায়ে লুন্ঠিত সম্পদও কাজে আসছে না। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা কত যে জরুরী সেটা করোনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও ক্ষমতার লোভে অন্ধ মানুষ তা দেখে না। কিন্তু অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকে।

একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে যখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে না তখন সেখানে শান্তি ও সুখ বিরাজ করে না। সমাজের সব ঘটনা সবাইকে এক রকম করে ভাবায় না। এটা ঠিক। কিন্তু চোখের সামনে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে যখন বাংলাদেশ তখন রাষ্ট্রের নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের করুণ কাহিনী পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হচ্ছে। এত উন্নয়ন তবু কেন মধ্যবিত্ত পরিবার শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমরা যত না উন্নয়ন করেছি তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ফলাও প্রচার করেছি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির কথা লিখলে সমাপ্তি টানা যাবে না। তবু বিবেকের তাড়নায় লিখতে বসেছি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা না পারেন অভাব-অনটন সইতে, না পারেন গলা উঁচিয়ে তা জাহির করতে। কারণ তারা মানসম্মানের ব্যাপারে সচেতন। অভাব-অনটন মুখ বুঝে সহ্য করতে পারেন। কিন্তু কারো কাছে হাত পাততে পারেন না। তারা বিত্তবান কিংবা বিত্তহীনদের মতো অর্থ যেনতেন উপায়ে করতে পারেন না। বিষয়টি এরকম, ‘করিতে পারি না কাজ/ সদা ভয় সদা লাজ/ পাছে লোকে কিছু বলে। এরকম নৈতিকতাবোধ মধ্যবিত্তের মননে কাজ করে থাকে। এ আত্মসম্মানবোধ মধ্যত্তিকে আত্মসংযম করতে যেমন শিখিয়েছে তেমনি বিপদে ও ফেলেছে। যারা ধনাঢ্য তাদের ব্যাপারে কারও মাথাব্যাথা নেই। কারণ তারা বেগমপাড়ার মানুষ। ২৮ মে একটি সহযোগী পত্রিকায় দেখলাম গত ১০ বছরে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে ধনী বাড়ার শীর্ষে স্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। ২০১০ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে দেশে ধনকুবেরের (৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের অধিকারী) সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাঙ্ক হারে। বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শ দানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ শীর্ষক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। এ থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে পুঁজিবাদের ফর্মুলা দিয়ে ধনী গরিবের বৈষম্যের সমাধান করা সম্ভব না। একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কেবল জাতি এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

এই করোনা সঙ্কটে নি¤œবিত্তরা অন্যের কাছে হাত পেতে কিংবা লাইনে দাঁড়িয়ে সাহায্য গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলো কারো কাছে সরাসরি কোন সহায়তা চাইতে পারেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির যারা আছেন তারা নিজেদের লালিত মূল্যবোধ, আত্মসম্মানের কারণে ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করলেও কারও কাছে হাত পাততে পারেনি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে।

আয় নেই অথচ ব্যয়ের খাতটি ঠিকই সচল রাখতে হচ্ছে। খাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম ঊধ্বমুখী। বাজারে চাল,ডাল, তেল, পেঁয়াজ শাকসবজি থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই, যার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। মধ্যবিত্তরা সঞ্চয় ভেঙে কিছুদিন চললেও এখন বাসা ভাড়া দিতেই হিমশিম খাচ্ছে। যা বেতন পান তার অর্ধেকই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। বাকি অর্ধেকে টেনেটুনে কোনো মতে মাসটা পার করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্কট যে ছিল না এমন নয়। জীবনের সঙ্গে লড়াই সংগ্রাম করেই তাদের টিকে থাকতে হয়েছে। কিন্তু করোনা তাদের জীবনে যে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে তা কল্পনাতীত। তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার মধ্যরাতে, সকাল কিংবা দুপুরে তুলে দিচ্ছেন পিকআপে। ফিরে যাচ্ছেন গাঁও গেরামে। 

এতদিন আমরা যে উন্নয়নের জোয়ারে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতাম তার খোলসটা করোনা উন্মোচন করে দিয়েছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বস্তগত উন্নয়নের সংজ্ঞা কি? দেশটির বন, নদী, পানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানুষের জীবনযাত্রার মান কেমন তা বিশ্লেষণ করলেই উন্নয়নের চিত্রটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে। একটি উন্নয়নশীল দেশের যোগ্যতার মাপকাঠি তিনটি-মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি হ্রাস। অথচ বাংলাদেশে এই সূচকগুলো বির্তকিত। জিডিপি, ঊর্ধ্বমুখী ইমারত, ওভারব্রিজ, বড় বড় দালানকোঠা, মেট্রোরেল যে জীবনমানের প্রকৃত নির্দেশক নয় তা এখন খোলাসা হয়ে গেছে। পুজিঁবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মধ্যবিত্ত পরিবার সবসময়ই বিপদে ছিল। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে সেভাবে তাদের আয় বাড়েনি। রাজধানী ঢাকায় চলার পথে একটু দৃষ্টি দিলেই দেখতে পাবেন বাসা ভাড়ার টু-লেটের ছড়াছড়ি। বাসা ভাড়ার এমন বিজ্ঞাপন আগে কখনো দেখা যায়নি। কিছু বাড়ির মালিক অবশ্য করোনা সঙ্কটের কারণে ভাড়া কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এ সংখ্যাটা খুবই নগণ্য। উন্নয়নের শ্লোগান দিয়ে বাজিমাত করা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু ভারসাম্য উন্নয়ন হচ্ছে কি না সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। উন্নয়ন হয়নি এটা বলছি না। কিন্তু উন্নয়নের জোয়ারে ধনিক শ্রেণির আয়তন ও জিডিপি বাড়ার সাথে সাথে কত নদী বিনাস হলো,কত বন উজাড় হলো,বাতাস কত দূষিত হলো, মানুষের জীবন কত বিপন্ন হলো, নাগরিকদের বঞ্চনা ও বৈষম্য কত প্রকট হলো, বিরোধী মতালম্বীদের ওপর নিপীড়নের নিষ্ঠুরতা, এসব উন্নয়নের নামে জায়েজ করা মোটেও সুখকর নয়!

পৃথিবীতে করোনার চেয়ে ভয়াবহ নিষ্ঠুর এক ভাইরাস রয়েছে যা আমরা অনেকে জানি না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৯ সালে বিশ্বজুড়ে এ ভাইরাসটিতে প্রায় ৮২ কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৯০ লাখ মানুষ মারা গেছে। প্রতিদিন গড়ে এই ভাইরাসে মারা যাচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। এই ভাইরাসটির কাছে করোনা একটি শিশু মাত্র। কারণ এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৯৩ লাখ ছাড়িয়েছে। মারা গেছে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার। ভাইরাসটির নাম কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে? কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ভাইরাসটির নাম ক্ষুধা। 

প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একজন শিশু এবং প্রতি তিন সেকেন্ডে প্রায় দুইজন মানুষ ক্ষুধার কারণে মারা যায়। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শিশু ক্ষুধার্ত হয়ে মারা যায়। ক্ষুধা নামক ভাইরাসটির প্রতিষেধক বিশ্ব জানে। কিন্তু ক্ষুধার প্রতিষেধক খাদ্য সমস্যার সমাধান করা সম্ভভ হয়নি। ক্ষুধা যে কেবল দারিদ্র্যতার কারণে হয় সেটিও সত্য নয়! ক্ষুধা হতে পারে খাদ্য অব্যবস্থাপনার জন্য,অপচয় ও দুর্নীতির জন্য। অনেকে মনে করেন পরিশ্রম মানুষকে ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কিন্তু আফ্রিকান এক নারী আক্ষেপ করে বলেছিলো, পরিশ্রম যদি দরিদ্রতা দূর করতে পারতো, তবে আফ্রিকান নারীরা হতো বিশ্বে শ্রেষ্ঠ ধনী। আমরা মনে করি সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কৃর্তপক্ষ এগিয়ে আসবে এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ