শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

লাদাখ থেকে সিকিম : চীন ভারত নেপাল সীমান্ত বিরোধের গোড়ার কথা

 

আসিফ আরসালান: যদি কেউ মনে করেন যে গালওয়াল উপত্যকায় ১৫ ও ১৬ জুন ভারত চীন সীমান্ত সংঘর্ষ হয়েছে, তাহলে তিনি ভুল করবেন। এই সংঘর্ষের সূত্রপাত আসলে গত মাস, অর্থাৎ মে মাসের ৫ তারিখে।  ঐ দিন গালওয়াল উপত্যকায় প্যাং গং  হ্রদের তীরে চীন  ও ভারতীয় সৈন্যদের মধ্যে মুষ্ঠিযুদ্ধ হয়। এই হাতাহাতিতে ভারতের ১১ জন সৈন্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর তিন দিন পর ভারতের সিকিম রাজ্যের নাথুলা পাসে একটি চীনা টহলদার বাহিনীকে ভারতীয় বাহিনী বাধা দিলে আবার হাতাহাতি হয়। এই দুটি ঘটনাকেই ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এম, এম নরবান হালকাভাবে গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের ৩৫০০ কিলোমিটার উঁচু স্থানে এরকম ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটেই থাকে। কিন্তু এর এক সপ্তাহ পর তিনি লাদাখের রাজধানী লেহ ছুটে যান। এখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৪ নং কোরের হেড অফিস অবস্থিত। এটি মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। যে রকম হন্তদন্ত হয়ে তিনি  ১৪ নং কোর কমান্ডারের অফিস পরিদর্শন করেন তাতে মনে হয় যে বড় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। 

গালওয়াল উপত্যকার ১৫/১৬ জুন ঘটনার অন্তত: ১৮ দিন আগে ২৮ মে বিদেশী সংবাদ সংস্থা এএফপি, রয়টার্স এবং ইন্ডিয়ান টেলিভিশন এনডিটিভি এবং হিন্দুস্তান টাইমসে যেসব  সংবাদ প্রকাশিত বা পরিবেশিত হয় তার সার সংক্ষেপ মোটামুটি নি¤œরূপ: হাজার হাজার চীনা সৈন্য চীন ভারত সীমান্ত পার হয়ে ৩ থেকে ৪ মাইল ভারতের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করেছে। কোনো ক্ষেত্রে তারা হিমালয়ের পাদদেশ অতিক্রম করেছে। তারা একাধিক ভারতীয় সীমান্ত চৌকি উপড়ে ফেলেছে এবং  সেখানে পরিখা ও বাঙ্কার খনন  করে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছে। ভারত লাদাখের গালওয়াল উপত্যকা: প্যাং গং হ্রদ ও ভেমচক এবং সিকিমের নাথুলাকে নিজের এলাকা মনে করে। কিন্তু ১৮ মে’র বিদেশী রিপোর্ট থেকে দেখা যায় যে ঐ ৪ টি পয়েন্টে অন্তত: ১০ হাজার চীনা সৈন্য অবস্থান গ্রহণ করেছে। 

২০ মে’র পর ভারতীয় টিভি চ্যানেল এনডিটিভি উপগ্রহ থেকে ধারণ করা চিত্রে দেখায় যে সীমান্ত থেকে ১২০ মাইল পেছনে চীন সামরিক বিমান ঘাটি নির্মাণ করছে। সামরিক জঙ্গী বিমানের ওঠানামার মত রানওয়েও তারা নির্মাণ করছে।  পক্ষান্তরে গার্ডিয়ানের খবরে প্রকাশ, চীনা তৎপরতার প্রত্যুত্তরে ভারত লাদাখের রাজধানী লেহ’র পদাতিক  ডিভিশন থেকে কয়েক  ব্যাটালিয়ান সৈন্য  অপারেশন এ্যালার্ট এরিয়াতে নিয়ে গেছে এবং আরো অতিরিক্ত সৈন্য সেখানে মোতায়েন করছে। এর পরবর্তী ঘটনাবলী সকলেরই জানা।  ১৫ ও ১৬ জুন গালওয়ানের রক্তাক্ত  সংঘর্ষ এবং ২০ জন ভারতীয় সৈন্যের নিহত ও ৪৬ জন সৈন্যের  আহত হওয়ার ঘটনা। 

॥ দুই ॥

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘ সময় পর রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নিলো কেন? এর সাধারণ উত্তর হলো চীন ভারতের ৩৫০০ কিলোমিটারের (মতান্তরে ৩৮০০ কিলোমিটারের) একাধিক স্থানে বিরোধ। কাশ্মীর ফ্রন্টে আকসাই চীন ও লাদাখ নিয়ে বিরোধ। দালাই লামা স্বাধীনতা ঘোষণা করলে চীন তিব্বতে সামরিক অভিযান চালায় এবং তিব্বতকে চীনের নিয়ন্ত্রণে আনে। দালাই লামা পালিয়ে যান। ভারত তাকে আশ্রয় দেয়। তিনি হিমাচল প্রদেশে আছেন। এটি নিয়ে বিরোধ। ভূটানের দোকলাম সীমান্তে রাস্তা নির্মাণ নিয়ে বিরোধ। অরুণাচলকে চীন দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে মনে করে। সেটি নিয়ে বিরোধ। বিরোধ রয়েছে সিকিম সীমান্তে। সুতরাং বলা যায় যে ভারতের সাথে চীনের বিরোধ অনেক দিন চলবে। কিন্তু গালওয়ান সীমান্তে সংঘর্ষ হলো  প্রায় ১০ বছরের পূঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আক্রোশের বিস্ফোরণ। 

ভারত বিগত ১০ বছর হলো এল.এ.সি বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর রাস্তা এবং বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। সুদূর হিমালয়ের কোল ঘেঁষে নির্মিত রাস্তাও কিছুদিন আগে উদ্বোধন করেছে ভারত। ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও বলেন, এল.এ.সি পর্যন্ত প্রলম্বিত অবকাঠামো চীনা হুমকির আশঙ্কা বৃদ্ধি করেছে। ভূখ-গত বিষয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং একজন  হার্ড লাইনার।  অনুরূপভাবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আপোষহীন। ১৯৬২ সালের চীন ভারত যুদ্ধের পর উভয় দেশের সীমান্তে সেনা তৎপরতা বৃদ্ধি পায় এবং উভয় দেশ রন সাজে সজ্জিত হয়। তবে ৯০ এর দশকে দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সীমান্ত উত্তেজনা অনেক হ্রাস পায়। তাপরেও লাদাখ ও সিকিম সীমান্তে সেদিন লোহার রড ও হাতাহাতি হলো। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত অশোক কে কান্তা বলেন, সম্প্রতি চীন ভারত সীমান্তের একাধিক স্থানে যেসব  সংঘর্ষ হলো সেগুলো স্বাভাবিক নৈমিত্তিক ঘটনা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। বৃটিশ ‘গার্ডিয়ান’ নামক দৈনিককে তিনি বলেন, আমি মনে করি, সংঘর্ষের বিস্তৃতি বেশ সিরিয়াস। এটাকে লোকালাইজড বা স্থানীয় ব্যাপার বললে ভুল বলা হবে। চীনের আচরণ এবার খুব আগ্রাসী। চীন বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ করেছে। এই সীমান্তে এত বিপুল সৈন্য মোতায়েন সাধারণত: দেখা যায়না। ভারতও চীনের প্রত্যুত্তরে বিপুল সৈন্য ও ভারী সমরাস্ত্রে সজ্জিত হচ্ছে। কোনো দেশ যখন অন্যের ভূখ- দাবী করে এবং সেটি অধিকার করতে চায় একমাত্র তখনই এই বিরাট রণসাজ দেখা যায়।  এসবের মাধ্যমে ভারতকে চীন এই বার্তা দিয়েছে যে সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক  বিষয়গুলোকে ভারতকে আরও সাবধানী হতে হবে। 

॥ তিন ॥

ভারতপন্থী  পশ্চিমা মিডিয়ায় জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে যে জিনজিয়াং, হংকং, তাইওয়ানে যে উদ্বেগজনক এবং সহিংস ঘটনার খবর আসছে সেসব ঘটনা থেকে নজর সরানোর জন্যই চীন ভারতীয় সীমান্তে এসব সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। তবে আরেক ধরণের জল্পনা পশ্চিমা মিডিয়ায় চলছে যেটা অনেকের কাছে এখন যোগ্য বলে মনে হয়। সেগুলোতে বলা হচ্ছে যে দালাই লামার প্রতি ভারতের অব্যাহত সমর্থন এবং আমেরিকা, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার সাথে ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতার চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান এবং নেপালের সাথে চীনের ক্রমবর্ধমান সুসম্পর্ক ভারতকে ক্ষুব্ধ করেছে। 

তবে সমস্যাটা যদি শুধুমাত্র চীনের সাথে হতো তাহলে বিষয়টিকে একভাবে ব্যাখ্যা করো যেতো।  কিন্তু যে ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি মোতাবেক নেপালের সাথে গোলামের মতো ব্যবহার করতো আজ সেই নেপালের সাথেও ভারতের শুরু হয়েছে ভূখ-গত বিরোধ। নেপালের সাথে বিরোধ হলো কেন? বিশ্ববাসী জানতো যে নেপাল ও ভূটান ভারতের স্যাটেলাইট স্টেট। অথচ গত বৃহস্পতিবারের সংবাদে দেখলাম, ভূটান চাষাবাদের জন্য ভারতের কৃষকদেরকে পানি দিতে অস্বীকার করেছে। এটি একটি মেজর ডেভেলপমেন্ট। অথচ মাত্র তিন বছর আগে ভূটানের দোকলাম সীমান্তে রাস্তা নির্মাণকে কেন্দ্র করে ৭৩ দিন ধরে ভারত ও চীনা সেনারা মুখোমুখি হয়। ৭৩ দিনব্যাপী টান টান উত্তেজনার পর চীন ও ভারতের সৈন্য পিছু হটে যায়। দোকলামে ভারতের কোনো প্রত্যক্ষ স্টেক নাই। তারা এই স্ট্যান্ড অফে ভূটানের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলো। সেই ভূটান আজ ভারতের কৃষকদেরকে পানি দিচ্ছে না। 

চীন ভারত বিরোধের মধ্যেই ভারত নেপাল সীমান্তে একটি ঘটনা ঘটেছে যেটির তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। গত নভেম্বর মাসে ভারত একটি মানচিত্র প্রকাশ করে। এই মানচিত্রে ভারত তিনটি এলাকাকে ভারতের অংশ হিসাবে দেখিয়েছে। এগুলো হলো লেপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পিয়াধুরা। এই তিনটি অঞ্চলকে ভারত তার উত্তরখান্ডের (সাবেক নাম উত্তরাঞ্চল) অংশ হিসাবে দেখায়। ভারত লেপুলেখ পাস থেকে  তিব্বতের মানস সরোবর পর্যন্ত ৮০ কিঃ মিঃ দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ করেছে। গতমাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা রাজনাথ সিং এই রাস্তাটি উদ্বোধন করেছেন। নেপাল এই ভারতীয় মানচিত্র ও রাস্তা নির্মাণের প্রতিবাদ করেছে । কিন্তু ভারত সেই প্রতিবাদে কর্ণপাত করেনি। 

॥ চার ॥

এর প্রতিবাদে নেপাল নিজেদের একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই মানচিত্রে লেপুলেখ, কালাপানি ও  লিম্পিয়াধুরাকে নেপালের অংশ হিসাবে দেখিয়েছে। নেপালের বক্তব্য, তার অঞ্চল থেকে রাস্তা নির্মাণ করে ভারত তিব্বতের সাথে সংযুক্ত হতে পারেনা। কিন্তু ভারতের বক্তব্য, লেপুলেখ তার রাজ্য উত্তরখান্ডে অবস্থিত। অথচ তিব্বত এখন গণচীনের অংশ। এ কারণেই বিরোধটি এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। 

অথচ ভারত নেপাল সম্পর্ক এতটাই গভীর ছিলো যে দুই দেশের নাগরিকরা পাসপোর্ট এবং ভিসা ছাড়াই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ করতে পারতেন। ভারতীয় সেনবাহিনীতে এখনও নেপালী নাগরিকরা বিশেষত গুর্খারা কর্মরত আছেন। আমি কয়েকবছর আগে যখন নেপাল সফর করি, তখন আমার কাছে কোনো নেপালী মুদ্রা বা কাগজের নোট ছিলো না। ভারতীয় রুপী দিয়ে আমি নেপালে আমার ব্যয় নির্বাহ করি। 

আজ আর কাশ্মীর প্রশ্ন উত্থাপন করলাম না। কারণ কাশ্মীর সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে বুঝতে হলে শুধুমাত্র পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর এবং ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরকে বুঝলে চলবে না। বুঝতে হবে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত গিলগিট ও বাল্টিস্তান, ভারত নিয়ন্ত্রিত লাদাখ এবং গণচীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীনকে। শেষ করার আগে এটুকু বলবো যে লাদাখ সংঘর্ষ শুধুমাত্র সীমান্ত সংঘর্ষ নয়, এর মধ্য দিয়ে চীন সরাসরি কাশ্মীর সমস্যায় জড়িয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের স্বায়ত্ত্বশাসিত মর্যাদা হরণ করে ভারত যখন তার সংবিধানের  ৩৭০ ধারা বাতিল করে লাদাখকে ইউনিয়ন টেরিটরি করে তখনই জন্ম হয় কাশ্মীরে চীনের জড়িত হওয়ার ভ্রুণ। 

asifarsalan15@gmail.com

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ