শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০২১
Online Edition

চাকরি হারানোর শঙ্কায় পোশাক শ্রমিকরা

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : একদিকে বেতন না পাওয়ার আহাজারি অন্যদিকে চাকরি হারানোর গভীর সঙ্কায় রয়েছেন পোশাক খাতের শ্রমিকরা। দেশে বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত সর্বমোট এক হাজার ৯২৬টি তৈরি পোশাক কারখানা চালু রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৮৫৫টির মালিক তাদের শ্রমিকদের মে মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করেছেন। তবে এখনও ৭১ কারখানার শ্রমিক বেতন-ভাতা পাননি। এ তথ্য জানিয়েছে পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বিজিএমইএ বলেছে, এক হাজার ৯২৬ কারখানার মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় রয়েছে ৩৩৩টি। এর মধ্যে মে মাসের বেতন দিয়েছে ৩১৪টি প্রতিষ্ঠান। গাজীপুরের ৭১৩ কারখানার মধ্যে বেতন দিয়েছে ৬৯৩টি, সাভার-আশুলিয়ায় ৪১২টির মধ্যে বেতন দিয়েছে ৩৯৭টি, নারায়ণগঞ্জের ১৯৮টি কারখানার মধ্যে বেতন দিয়েছে ১৯৬টি, চট্টগ্রামের ২৫২টি কারখানার মধ্যে ২৪০টি এবং প্রত্যন্ত এলাকার ১৮টি কারখানার মধ্যে ১৫টি বেতন পরিশোধ করেছে। সব মিলিয়ে মে মাসের বেতন পরিশোধ করেছে চালু থাকা এক হাজার ৮৫৫টি (৯৬.৩০ শতাংশ) কারখানা। তবে ৭১টি কারখানার (৩.৭০ শতাংশ) শ্রমিকদের বেতন ২৫ জুন পর্যন্ত পরিশোধ করেনি মালিকপক্ষ।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এই প্যাকেজ থেকে উৎপাদনের ন্যূনতম ৮০ শতাংশ পণ্য রফতানি করছে এমন সচল প্রতিষ্ঠান সুদবিহীন সর্বোচ্চ ২ শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জ দিয়ে ঋণ নিতে পারছে। জানা যায়, তহবিল থেকে ঋণ পেতে বিজিএমইএর সদস্য এক হাজার ৩৭০টি ও বিকেএমইএর সদস্য ৫১৯টি কারখানা আবেদন করেছিল। বিভিন্ন কারণে বিকেএমইএর ৯৯ সদস্য কারখানাসহ বেশি কিছু আবেদন বাতিল হয়। তবে এরপরও পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের সিংহভাগ অর্থই ঋণ হিসেবে পেয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকরা। ফলে দুই মাস ধরে পোশাক শ্রমিকদের একটি বড় অংশের মজুরি হচ্ছে প্রণোদনার টাকায়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চলমান সংকটে শ্রমিক-কর্মচারীদের আরও তিন মাসের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ চান দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকরা। এই বরাদ্দ চেয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী বরাবর চিঠি দেয় রফতনিমুখী পোশাক মালিকদের বড় দুটি সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
এ বিষয়ে বিকেএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, চলমান সংকটে রফতানিমুখী শিল্পের ক্ষতির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বেচ্ছায় বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ দিয়েছেন। ওই টাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পোশাক কারখানা তিন মাসের মজুরি দিচ্ছে। তিনি বলেন, প্যাকেজের ঋণের অর্থে আমরা এপ্রিল, মে ও জুন- এ তিন মাসের মজুরি দেয়ার সুযোগ পেয়েছি। এখন আগামী জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বরের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য আগের মতো সহজশর্তে অর্থবরাদ্দ চেয়েছি। কারণ আজ থেকে তিন-চার মাস পর আমাদের যে কাজ প্রোডাকশন লাইনে যাবে বা শিপমেন্ট হবে সেটা এখনই কনফার্ম হওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের কাছে এ মুহূর্তে কোনো অর্ডার আসছে না। তাই আগামী তিন মাস শ্রমিকদের বেতন দেয়ার মতো পরিস্থিতি কারখানাগুলোর নেই। এমন অবস্থায় আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি বেতন দেয়ার জন্য ঋণের সুবিধা আরও তিন মাস যেন দেয়া হয়।
এদিকে মিল-কলকারখানা চালু হলেও কোনো শিল্প ইউনিট ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। সক্ষমতার বিপরীতে অর্ডার নেই। বড় জোর ৩০ শতাংশ শ্রমিক-কর্মচারী দিয়ে মিল ফ্যাক্টরি চালানোর সুযোগ আছে। তাও কতদিন চলবে- তা অনিশ্চিত। এ হিসাবে কমপক্ষে বস্ত্র সেক্টরের ৭০ শতাংশ কর্মীর চাকরি হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গার্মেন্ট সেক্টরেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি লোকের কাজ থাকবে না। সূত্রমতে, বিজিএমইএর দাবি অনুযায়ী তাদের শ্রমিক সংখ্যা ৪৫ লাখ হলে এর ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ৩১ লাখের বেশি শ্রমিকের কাজ থাকছে না। এছাড়া তৈরি পোশাকের পশ্চাৎপদ শিল্প যেমন স্পিনিং, টেক্সটাইল, এক্সেসরিজ, পরিবহন, ফ্রেইট ফরোয়াডার্স, সিএন্ডএফ এজেন্টসহ পরোক্ষভাবে জড়িত শ্রমিক-কর্মচারীদের বড় অংশ কর্মহীন হয়ে পড়বে। এর বাইরেও পরোক্ষভাবে একটি কারখানাকে কেন্দ্র করে আরও অনেক ছোটখাটো ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে ওঠে। সেগুলোর কাজ কিংবা আয়ের পথ বন্ধ হবে। সব মিলিয়ে হিসাব করলে কোটির কাছাকাছি হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প মালিকদের কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যে যাই বলুক না কেন, বাস্তবতা হল বর্তমানে গার্মেন্টে যে কাজ আছে সেখানে ৩০ শতাংশের বেশি শ্রমিক কাজে লাগানোর সুযোগ নেই। যদি সুবিধামতো অর্ডার না পাওয়া যায় তাহলে চালু রাখা তো দূরের কথা, পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দেয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না। এর সঙ্গে ছাঁটাইয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। কাজ না থাকলে বেতন দেবে কে? ব্যবসার স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে কেউ থাকতে পারবেন না। ইতোমধ্যে শিল্প মালিকরা লোকসান দিয়ে হলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রেখেছেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হলে সামনের দিকে সামলানো সম্ভব হবে না। তারা বলেন, অবস্থাদৃষ্টে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে সামগ্রিকভাবে বস্ত্র খাত আদৌ আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। তাই সংকট নিরসনে সরকারকেই এখন এগিয়ে আসতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির তথ্য অনুযায়ী করোনার প্রভাবে আগের বছরের তুলনায় চলতি বছর বিশ্বের পোশাক বাজারে বিক্রি ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে পোশাক রফতানি ১০ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পাবে। চলতি অর্থবছরের ৮ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) পোশাক শিল্পে ঋণাত্মক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। করোনার প্রভাবে মার্চ পর্যন্ত ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে গেছে। কারণ বহির্বিশ্বে বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। অনেক বড় বড় ক্রেতা দেউলিয়াত্বও বরণ করেছে। অর্ডার কমে যাওয়ায় চলমান পরিস্থিতিতে কোনো কারখানাই সামর্থ্যের শতভাগ ব্যবহার করতে পারছে না। অনেক কারখানা ৩৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। বড় কারখানাগুলোও ৬০ শতাংশের বেশি সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। জুনে কারখানাগুলো গড়ে ৫৫ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে কোনোরকমে উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখছে। জুলাইর পরিস্থিতি এখনই অনুমান করা কঠিন। গত ৪ জুন এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক এমন বাস্তবতা তুলে ধরে বলেছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কারখানাগুলো ক্যাপাসিটির ৫৫ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। এ ক্যাপাসিটিতে কারখানা চালিয়ে শতভাগ কর্মী রাখা উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমন প্রেক্ষাপটে জুন থেকে শ্রমিক ছাঁটাই করা হতে পারে। এটি অনাকাঙ্খিত বাস্তবতা, কিন্তু করার কিছু নেই।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ভোগ ও চাহিদা কমে যাওয়ায় সারা বিশ্বেই শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর বাইরে নয়। কারণ একদিকে পোশাকের অর্ডার কমে গেছে। অন্যদিকে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে কারখানায় লে-আউট প্ল্যান পরিবর্তন করতে হয়েছে। এতে ৩০ শতাংশ মেশিন সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। সেই ৩০ শতাংশ শ্রমিককেও সরকারের প্রণোদনা তহবিলের টাকায় এপ্রিল ও মে মাসে কাজ ছাড়া বেতন দেয়া হয়েছে। এ টাকা মালিকদেরই পরিশোধ করতে হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় এক কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কোনো মালিকই শ্রমিক ছাঁটাই করতে চান না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মহামারীর কাছে মালিকরা অসহায়। শুধু গত ২ মাসেই প্রায় ৩শ’ গার্মেন্ট বন্ধ হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে কী হবে তা কেউ বলতে পারছে না।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, তৈরি পোশাকের পশ্চাৎপদ শিল্প হিসেবে টেক্সটাইল খাতও কোভিড-১৯ এ চরম ক্ষতিগ্রস্ত। অর্ডার যেভাবে বাতিল হচ্ছে, তাতে রফতানিমুখী টেক্সটাইল খাতের উৎপাদন কমবে। পাশাপাশি দেশে লকডাউন থাকায় স্থানীয় সুতা-কাপড়ের চাহিদা কমে এসেছে। এভাবে চললে ভবিষ্যতে কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা এখন লাভের জন্য নয়, বেঁচে থাকার জন্য কারখানা চালাচ্ছেন। কিন্তু করোনা দীর্ঘায়িত হলে সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে যাবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টশ অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি আবদুল কাদের খান বলেন, আগের অর্ডার দিয়ে জুন পর্যন্ত কারখানা চালানো যাবে। কিন্তু জুলাইয়ে কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। গার্মেন্ট থেকে এক্সেসরিজের অর্ডার দিচ্ছে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ