শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০
Online Edition

বেভুল মুসলিমদের জাগাতে ক্যাথেরিনদের প্রয়োজন 

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী: ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ও ইহুদিসহ পশ্চিমাদের  মিথ্যে অভিযোগ উত্থাপন এবং বানোয়াট প্রচার-প্রচারণা সত্ত্বেও ইউরোপ-আমেরিকার মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টারগুলোতে প্রতিদিন বহু উৎসুক মানুষ দলে দলে কালেমার পতাকাতলে সমবেত হচ্ছেন। সাম্প্রতিক ইসলামগ্রহণকারীদের মধ্যে জার্মানির ক্যাথেরিন হফার একজন দুঃসাহসী নারী। 

ক্যাথেরিন হফার বলেন, মুসলিমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন তাহলে শত্রুদের মোকাবেলায় অবশ্যই বিজয়ী হবেন।

হফার আরও বলেন, ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যে প্রচারণা, ষড়যন্ত্র এবং অন্যায় সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও সত্যদীনের অগ্রগতি প্রতিদিন বাড়ছেই। বর্তমানে ইসলাম ইউরোপসহ পাশ্চাত্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম জীবনবোধ হিসেবে মান্য হচ্ছে। ইসলামের শিক্ষাগুলোই পাশ্চাত্যের মানুষকে এর দিকে আকৃষ্ট করছে বলে হফার মনে করছেন। বিশেষজ্ঞরাও এমনই মনে করেন বলে তিনি জানান।

যেমন, মুসলিমদের উন্নত সামাজিক জীবন, ভ্রাতৃত্ব ও সব ধরনের বৈষম্য বা অন্যায়বিরোধী অবস্থান পশ্চিমাদের দীন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করছে। নারীর প্রতি ইসলামের সম্মানজনক স্বীকৃতি পাশ্চাত্যের শিক্ষিত নারীসমাজকেও আকৃষ্ট করছে এ মহান দীনের দিকে। এসব নারী ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমেই ইসলামগ্রহণ করছেন।

তাঁদের কেউ কেউ গবেষণা প্রতিষ্ঠানেরই কর্মী ছিলেন। গবেষণার মাধ্যমে ইসলামের সত্য উপলব্ধি করে এ মহান আদর্শগ্রহণ করেছেন এমন নারীদের মধ্যে জার্মানির নারী ক্যাথেরিন হফারও অন্যতম। তিনি বলেছেন, “আমি জন্ম নিয়েছিলাম ১৯৬৮ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে এক ক্যাথলিক পরিবারে। আমার পরিবার খ্রিস্টধর্মের অনুষ্ঠানগুলো পালনকে বেশ গুরুত্ব দিতো এবং প্রতি রোববার গির্যার প্রার্থনায় যোগ দিতো।

কিন্তু আমি যখন ১৪ বছর বয়সে পা দেই তখন দেখলাম, ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালনে আমার কোনও আগ্রহ নেই। আর খ্রিস্টধর্ম বিষয়ে যেসব জ্ঞান অর্জন করতাম সেগুলোকে আধুনিক বা বর্তমান জীবনযাত্রার সঙ্গে মেলাতে পারতাম না এবং এসব জ্ঞান আমার কাছে বোধগম্য ছিল না। ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহহীনতার কারণে কিছুকাল এক জ্যোতিষী বা গণকের কাছে যেতাম। কিন্তু সেই গণক আমার আধ্যাত্মিক চাহিদার কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি। কয়েক বছর পর আমি একজন মুসলিমের সঙ্গে পরিচিত হই। তাঁর চিন্তাচেতনা ও জীবনযাপনের পদ্ধতি আমাকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করে। ফলে দীন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠি।”

ইসলাম সম্পর্কে কিছুকাল পড়াশোনার পর এর প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে থাকেন জার্মান নওমুসলিম মহিলা ক্যাথেরিন হফার। এ অবস্থায় তিনি হিজাব ও সালাত সম্পর্কে গবেষণা করেন। এসব বিষয়ে কিছুদিন গবেষণার পর মিসেস হফার ইসলামের কালেমা পড়েন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “যখন হিজাব পরলাম তখন আগের চেয়েও বেশি নিরাপত্তা অনুভব করলাম। হিজাব আমাকে ব্যক্তিত্ব ও বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। কিন্তু যখন আমার মা আমাকে হিজাব-পরা অবস্থায় দেখলেন তখন তিনি অসন্তুষ্ট হলেন এবং এর তীব্র বিরোধিতা করলেন। আমি আমার মাকে খুব ভালোবাসতাম বলে ইসলামের গ-ির মধ্যে থেকেই কিছু সময় পর্যন্ত হিজাবহীন থাকবো বলে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েও ফেলি। কিন্তু আমার বিবেক আমাকে এ কাজে দারুণ বাধা দেয়।

ফলে আমার নিজের মধ্যেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব। প্রায় এক বছরপর হিজাব পরিহিতা জার্মানির দু’জন নওমুসলিমের দেখা পেলাম। নানা সমস্যা ও বাধা সত্ত্বেও হিজাব রক্ষার ব্যাপারে তাঁদের বেপরোয়া ভাব দেখে বিস্মিত হলাম এবং আমি অন্তর থেকে তাদের বেশ প্রশংসা করলাম। ফলে আমি আবারও হিজাবের মধ্যে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম।

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর সাহায্য চেয়ে ও তাঁর ওপর ভরসা করে বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে হিজাব পরলাম। মহান আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর সহায়তা আমাকে জুগিয়েছে জোরালো আত্মবিশ্বাস ও মনোবল। আমার মা যখন আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও অনমনীয়তার বিষয়টি দেখলেন তখন তিনি বিরোধিতা বন্ধ করে ব্যাপারটিকে মেনে নিলেন।”

ইসলামগ্রহণের পরের অনুভূতি প্রসঙ্গে হফার বলেন, “ইসলামগ্রহণের পর আগের চেয়েও বেশি প্রশান্তি অনুভব করলাম। কারণ, আমি এখন এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহর ওপর নির্ভর করছি এবং বিশ্বাস রাখছি। আমার জীবনে রয়েছে স্পষ্ট লক্ষ্য। তাই ব্যক্তিগতভাবে খুবই প্রশান্তি ও আস্থা অনুভব করছি। এখন মহান রব্বুল আলামিন আল্লাহ সম্পর্কে আমার বিশ্বাস ও জ্ঞান অনেক বেশি পরিপূর্ণ।

আমি বুঝতে পেরেছি যে, জীবনের পরিপূর্ণ কল্যাণ রয়েছে মহান আল্লাহ ও তাঁর নবী-রাসূলদের নির্দেশ মানবার মধ্যেই। ইসলাম জানতে পারায় আমি এখন জীবনের গভীর অর্থ ও লক্ষ্য খুঁজে পেয়েছি। আমার জীবন এখন বস্তুবাদীদের জীবনের মতো অর্থহীন নয়। দুঃখজনকভাবে পশ্চিমাদের সমাজজীবনের ওপর তাঁদের ধর্মবিশ্বাসের খুব কম প্রভাব রয়েছে।

আসলে পাশ্চাত্যে ও বিশেষ করে আমেরিকায় ধর্মবোধ তার অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। অথচ মুসলিমরা ব্যক্তিগত ও সামাজিক দিক থেকে পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক অগ্রসর। আল্লাহ বলেন:

“ইন্নামাল মুমিনুনা ইখওয়াতুন ফা আসলিহু বাইনা আখাওয়াইকুম ওয়াত্তাকুল্লাহা লায়াল্লাকুম তুরহামুন” অর্থ: “নিশ্চয়ই মুসলিমরা পরস্পরের ভাই। অতঃপর তোমাদের ভাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনর্গঠিত করে দাও। আর আল্লাহকে ভয় কর। এতে আশা করা যায়, তোমাদের ওপর অনুগ্রহ করা হবে।” -সুরা হুজরাত: আয়াত ১০। 

মুসলিমরা আল্লাহর কালাম মানেন ও বিশ্বাস করেন। কুরআনে অন্যত্র আরও বলা হয়েছে:

“তাঁরা একে-অপরকে দেখতে যায় এবং বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সমস্যাগুলোর সমাধান করে।” 

জার্মান নওমুসলিম মহিলা ক্যাথেরিন হফার ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি ও বিশ্বের মুসলমানদের অবস্থা প্রসঙ্গে কিছু বলেছেন। তিনি বলেন, “বই-পুস্তক পড়ে সত্যকে জানা যায়। কিন্তু ইসলামপ্রচারের আরেকটি পদ্ধতি হলো: আমল তথা বাস্তবে দীনচর্চা বা অনুশীলন।

কথা কখনও কাজের চেয়ে বেশি কার্যকর নয়। মুসলমানরা যেসবে বিশ্বাস করেন তা যদি বাস্তবে চর্চা করেন তাহলে বিশ্বের অন্যদের ওপর তার প্রভাব হবে অনেক বেশি। দুঃখজনকভাবে মুসলমানরা এখন অনেক সংকটে পড়েছেন। এরপরও পাশ্চাত্য ইসলামের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে এবং এটা জানে যে ইসলাম এগিয়ে গেলে অনেকেই এতে আকৃষ্ট হবেন।

তাই পাশ্চাত্য নানা কূট-কৌশলে ইসলামের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, মুসলিমরা যদি একে-অপরকে সাহায্য করেন এবং ঐক্যবদ্ধ থাকেন তাহলে তাঁরা শত্রুদের মোকাবেলায় বিজয়ী হবেন।”

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে মুসলিমরা অনেকে ইসলাম সম্পর্কে উদাসীন। তাঁরা ভোগ-বিলাসে মত্ত। পরস্পরকে ঘায়েলে ব্যস্ত। অর্থের পেছনে ছুটছেন অবিরাম। তবে ক্যাথেরিনরাই বেভুল মুসলিমদের জাগিয়ে তুলতে পারেন। সম্বিত ফেরাতে পারেন। আমরা ক্যাথেরিন হফারকে স্বাগত জানাই। তাঁর সুন্দর জীবন প্রত্যাশা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ