রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০
Online Edition

হিমালয় অঞ্চলকে বিধিবদ্ধ সীমানার বাইরে আনাই সংকট সমাধানের পথ?

২৫ জুন, দ্য ডিপ্লোম্যাট : লাদাখের সীমান্ত এলাকায় সড়ক ও বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভারত-চীন সাম্প্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক আলেক্সান্ডার ই.  ডেভিস মনে করেন,  চীন-ভারত উত্তেজনার পাটাতনে দাঁড়িয়ে বরফ আচ্ছাদিত, উঁচু ও বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চলটিকে বিধিবদ্ধ ভূখণ্ডে রূপান্তরের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা সে প্রশ্ন মীমাংসা করাটা জরুরি।

রুথ গ্যাম্বল হলেন লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক। তিনি তিব্বত ও হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশগত ও সংস্কৃতিবিষয়ক ইতিহাসবিদ। আর আলেক্সান্ডার ই. ডেভিস হলেন দ্য ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার প্রভাষক। দ্য ডিপ্লোম্যাটে লেখা এক বিশ্লেষণে ওই দুই লেখক সংঘাতের অবসানের জন্য আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের মনোভাব থেকে সরে আসতে ও হিমালয় অঞ্চলকে সীমারেখার বাইরে রাখতে বিবাদমান দেশগুলোর প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করেন এর মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলের পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদিবাসী গোষ্ঠীকেও ভালোভাবে সেবা দেওয়া যাবে।

গত ১৫ জুন পশ্চিমাঞ্চলীয় হিমালয় সীমান্তে ভারত ও চীনের সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা নিহত এবং আরও ২০ জন গুরুতর আহত হয়। ভারতের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকজন চীনা সেনা নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হলেও বেইজিং এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। চীন-ভারতের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির এ ঘটনাটি গত ৪০ বছরের মধ্যে প্রথম। পশ্চিম হিমালয় অঞ্চল নিয়ে ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চীন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিরোধ চলছে। এ সময়ের মধ্যে লাখো সেনাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে, ক্ষতিসাধন হয়েছে সেখানকার পরিবেশের। ইন্দু, ব্রহ্মপুত্র ও তারিম নদীর অববাহিকায় অবস্থিত হিমবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রুথ গ্যাম্বল ও আলেক্সান্ডার ই.  ডেভিস তাদের নিবন্ধে বলেছেন, ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করতে গিয়ে ভারত ও চীন একে অপরের বিরুদ্ধে সীমান্তে অনধিকার প্রবেশের অভিযোগ তুলে থাকে। পরস্পরের বিরুদ্ধে ‘উপনিবেশিক যুগের সীমান্ত’ কার্যকরের অভিযোগও করে থাকে তারা। তবে ইতিহাসগত সূত্রগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অতি উচ্চতায় অবস্থিত অঞ্চলগুলোর মধ্য দিয়ে শিখর থেকে শীর্ষে সীমারেখা টানার ধারণাটিই খোদ উপনিবেশিক আবিষ্কার।

তিব্বতীয়, লাদাখি, বাল্টি ও গিলগিতের জনগণের সঙ্গে এসব ভূমির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ সীমান্তকে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম বিবেচনা করে না। তাদের মধ্যকার চুক্তিগুলো সেভাবেই করা আছে। যেমন- সপ্তদশ শতকে তিব্বতীয় ও লাদাখিদের মধ্যে স্বাক্ষরিত তিংমসগ্যাং চুক্তিতে সীমান্তকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে পর্বতের পথ হিসেবে। সেখানে ব্যবসা করা যাবে। সেনাবাহিনীর গতিবিধি সেখানে খর্ব করা যাবে। শুধু যাযাবররা অতি উচ্চ এ মরু উপত্যকায় ভ্রমণ করতে পারবেন এবং তাও কেবল গ্রীষ্মকালে।

ব্রিটিশ রাজশাসনের মানচিত্রকাররা এ অঞ্চলের মানচিত্র আঁকা শুরু করেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে। তারা তখন জম্মু ও কাশ্মির এবং তিব্বতের মধ্যে সীমানা সুনির্দিষ্ট করে দিতে চেয়েছিলেন। ডগরা ডাইনেস্টি গোষ্ঠীর সঙ্গে চুক্তির মধ্য দিয়ে এ বিধিবদ্ধ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। ডগরা জনগোষ্ঠী মূলত জম্মুভিত্তিক হলেও ঊনবিংশ শতাব্দীতে তারা অতি উচ্চ অঞ্চল লাদাখ, বাল্তিস্তান ও গিলগিত দখলে নিয়েছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোঁড়ার দিক থেকে তিব্বত কিং সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তবে উচ্চ পর্যায়ের স্বায়ত্ত্বশাসন ছিল তাদের।

ব্রিটিশরা এমন একটি মানচিত্র চেয়েছিল যার মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলকে কিং সাম্রাজ্যের প্রভাবমুক্ত করে নিজেদের প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসতে পারবে। এ কাজটি কঠিন বলে প্রমাণিত হলো। তাদের মানচিত্রটিও যথাযথ ছিল না। যখন তারা স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে গেল, তখন তারা সন্দেহ আর প্রতিরোধের সম্মুখীন হলো। স্থানীয়দের প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করেই তারা অঞ্চলটিকে উপনিবেশিক রূপ দিলো। তবে ব্রিটিশ (ডগারাদের মাধ্যমে), কিং, বা তাদের উত্তরসূরীদের কেউই লাদাখ, পশ্চিম তিব্বত ও দক্ষিণাঞ্চলীয় জিনজিয়াং-এ অবস্থিত এ উঁচু অঞ্চলটিকে নিজেদের আয়ত্ত্বে নিতে পারেনি। তারা মানচিত্র আঁকার মধ্য অঞ্চলটি মালিকানা দাবি করতে লাগলো, তবে সেখানে তাদের শারীরিক উপস্থিতি ছিল না।

অতি উঁচুতে অবস্থিত এ অঞ্চলকে ভূখণ্ডে রূপ দেওয়া শুরু হয় কেবল তখনই, যখন চীন, ভারত ও পাকিস্তান দাবি করলো এসব ভূখণ্ড তাদের পূর্বসূরীদের সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। গত ৭০ বছর ধরে তাদের মধ্যকার এ বিরোধের কারণে প্রাণহানি হয়েছে, পরিবেশ নষ্ট হয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা ও যাযাবরের চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। প্রযুক্তি ছাড়াই উঁচু এ উপত্যকার মানচিত্রায়ন করতে হিমশিম খেয়েছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মানচিত্রকাররা। তবে সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সীমান্তরেখা নির্মাণকারীদের জন্য আরেকটি ইস্যু হাজির করেছে। বিজ্ঞান বলছে, ভূমিকম্পপ্রবণ ও বরফ আচ্ছাদিত এ অঞ্চলটির কতবার বদল ঘটে। লেক, বরফ ও নদী দ্বারা চিহ্নিত সীমারেখাগুলো ঋতু পাল্টানোর সাথে সরে সরে যায়।

অঞ্চলটির পরিবেশ ও এর সীমানাহীন ইতিহাসকে স্বীকার না করলে তা কেবল উত্তেজনাকে বাড়িয়েই দিবে। অথচ এগুলোর স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে সমাধান সূত্র।

যদি সর্বোচ্চ চূড়াগুলোকে ভূখণ্ডে রূপান্তর বন্ধ করা হয়, তবে তার মধ্য দিয়ে অহেতুক প্রাণহানি ও পরিবেশ ধ্বংসের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। আর এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে জড়িত হতে পারবে। সিয়াচেন হিমবাহতে পিস পার্ক স্থাপনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ আগেও দেওয়া হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে অন্য বরফ অঞ্চলগুলো বিভিন্ন কাউন্সিল ও চুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে নয়। যেমন আর্কটিক কাউন্সিলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কণ্ঠও প্রতিধ্বনিত হয়।

গ্যাম্বল ও ডেভিস মনে করেন, জাতীয়তাবাদী ও ভূখণ্ড গত দাবিতে মশগুল না হয়ে বিজ্ঞান ও ইতিহাসগত উপাত্তকে আমলে নিতে হবে। এ অঞ্চলটিকে আদৌ সীমারেখায় বেঁধে রাখা ঠিক হবে কিনা সে প্রশ্নটিকেই সবার আগে স্থান দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ