সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করুন

অ্যাডভোকেট মো. সাইফুদ্দীন খালেদ: চিকিৎসা সেবা মানবতার সেবায় নিয়োজিত এক মহৎ পেশা। অন্যদিকে সেবা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার। অসুস্থ হওয়ার সাথে সাথে সাধারণত মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে, দুর্বল হয়ে যায়। এই দুর্বল সময়ে চিকিৎসকই তার বড় অবলম্বন, যেন অসহায়ের সহায়। এজন্য চিকিৎসা সেবাকে মহান পেশা বলা হয়। মানুষের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন কারও কিছু করার সামর্থ থাকে না, ঠিক সেই সময়টাতে চিকিৎসকরাই এগিয়ে আসতে পারেন। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সেবা করার এক দারুণ সুযোগ চিকিৎসকদের দিয়েছেন। চিকিৎসকদের কর্তব্য সমাজের প্রতি তার দায়িত্ব পালন করা ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় আইন সমূহ মেনে চলা। চিকিৎসা পেশার মহত্ত্ব ও মানবতার কথা মনে রেখে একজন চিকিৎসক রোগীর সেবা করার জন্য সদা প্রস্তুত থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। রোগীর প্রতি চিকিৎসকের আচরণ হবে সৌজন্যমূলক, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহানুভূতিশীল। রেজিষ্ট্রার্ড চিকিৎসকদের নির্দেশনা সংক্রান্ত মেডিক্যাল নীতিমালা রয়েছে। এই নীতিমালা একজন চিকিৎসকের সাধারণ কর্তব্য, রোগীর প্রতি কর্তব্য এবং সহকর্মী চিকিৎসকের প্রতি কর্তব্যের দিক নির্দেশনা বহন করে।

১৯৪৯ সনের ১২ অক্টোবর লন্ডনে বিশ্ব মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক এই নীতিমালা পরিবর্তিতরূপে গৃহীত হয় এবং এটিই জেনেভা ঘোষণা নামে পরিচিত। এই নীতিমালায় চিকিৎসকদের ব্যাপারে বলা হয় ‘‘আমি নিজে প্রতিজ্ঞা করছি যে, মানবতার সেবায় আমি আমার জীবন উৎসর্গ করব। আমি আমার সর্ব শক্তি দিয়ে চিকিৎসা পেশার সম্মান ও গৌরবময় ঐতিহ্য বজায় রাখবার চেষ্টা করব। আমার রোগীর শারীরিক অবস্থাই আমার প্রথম বিবেচ্য বিষয় হবে। ধর্ম, গোত্র, জাতীয়তা, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা সামাজিক অবস্থিতির কোন কিছুই আমার রোগী ও আমার কর্তব্যের মাঝে আসবে না। আমি আমার চিকিৎসা জ্ঞানকে হুমকির মুখে ও মানবতার পরিপন্থী কোন কাজে প্রয়োগ করব না ইত্যাদি।’’ যে কোনো রোগী বা তার স্বজনদের প্রত্যাশা হলো চিকিৎসকের কাছে গেলে বা হাসপাতালে এলে যেন ডাক্তার পাওয়া যায় এবং চিকিৎসা শুরু হয়। আমাদের দেশে ভালোমানের এবং ভালো মনের চিকিৎসক অনেক আছেন, এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সার, প্রসূতি মায়ের সেবা, দুর্ঘটনায় আহতসহ অন্যান্য নিয়মিত রোগের চিকিৎসা মিলছে না বলে রোগীরা অভিযোগ এনেছেন। সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা যেন অপ্রতুল। জ্বর, সর্দি-কাশির মতো লক্ষণ থাকলেই এসব হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেও অন্য রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসা পেতে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল অসুস্থ রোগী নিয়ে ধরণা। মিলছে না চিকিৎসা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে রাস্তায়ই প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি পর্যায়ে কয়েক দফা নির্দেশনা, বেসরকারি হাসপাতাল মালিকদের প্রতিশ্রুতির পরেও চিকিৎসার বেহাল চিত্র বদলায়নি। কিন্তু কোন পক্ষই এর দায় নিচ্ছেন না। সাধারণ রোগীরাই হচ্ছেন ভোগান্তির শিকার। কেউ নিশ্চিতভাবে করোনা আক্রান্ত না হলে সেসব জায়গায় ভর্তি করানো হচ্ছে না। ফলে সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য রোগীরা কোথায় যাবেন এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না। বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা পাওয়া সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। চিকিৎসা সেবায় অবহেলা চিকিৎসা সেবা আইন, ২০১৬ এবং বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০ অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

 

কর্তব্য কর্মে ইচ্ছাকৃত অবহেলা, অযৌক্তিক দায়িত্বহীনতা বা বড় রকমের অযোগ্যতা প্রদর্শন করে কোন চিকিৎসক দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করলে বা দায়িত্ব পালনে বিরত থাকলে এর পরিণতিতে যদি রোগীর মৃত্যু হয় বা রোগী আহত হয়, তবে সেটা চিকিৎসকের অন্যায়-আচরণ বা অসদাচরণ বলে পরিগণিত হবে। একজন চিকিৎসকের পক্ষে তা দুই রকমের অপরাধ বলে পরিগণিত হতে পারে; দেওয়ানী ও ফৌজদারী। পরিশেষে বলব- দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ সব রোগীর জন্য হাসপাতাল উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। আর সে কারণেই এখন জরুরি যে কাজটি হচ্ছে, হাসপাতাল যাতে রোগী ফিরিয়ে না দেয় সেটি নিশ্চিত করতে মনিটরিং বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। চিকিৎসকদেরও তাদের সেবামূলক পেশার প্রতি আন্তরিকতা ও আনুগত্য থাকতে হবে। নিজের জীবন বাজি রেখে যারা করোনায় আক্রান্তদের সেবা প্রদান করছেন নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখেন। পাশাপাশি সাধারণ রোগীরা যেন নিয়মিত চিকিৎসা সেবা পায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলেই আন্তরিক হবেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ