রবিবার ২৫ জুলাই ২০২১
Online Edition

হটছে বৈষম্য ও উপনিবেশবাদের প্রতীক

প্রকৃতি ও মানুষ এই পৃথিবীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্যই প্রকৃতিজগৎ সম্পর্কে যেমন গবেষণা হয়, তেমনি গবেষণা হয় মানবজগৎ সম্পর্কেও। স্রষ্টাতো প্রকৃতিজগৎকে মানববান্ধব করে সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতি নানাভাবে মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি মানুষের আচরণ কেমন? বান্ধবের প্রতি সঙ্গত আচরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে মানুষ। বরং লোভী, আগ্রাসী ও দাম্ভিক মানুষের আচরণে প্রকৃতি বিপর্যস্ত হচ্ছে নানাভাবে। এর ফলাফল মানুষের জন্যও শুভ হচ্ছে না। লোভী ও দাম্ভিক মানুষ যে শুধু প্রকৃতির সাথে অন্যায় করছে তা নয়, সাধারণ মানুষের প্রতিও তাদের আচরণ নিষ্ঠুর ও নির্মম। ক্ষমতাদর্পী এইসব মানুষ কখনো ন্যায় এবং নীতির ধার ধারে না। ক্ষমতা এবং সম্পদই তাদের জন্য সবকিছু। ফলে তারা কখনো মানুষ কিংবা প্রকৃতির বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হতে পারেনি। এজন্য তাদের হুমকি-ধমকিও দাপটের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। সাধারণ মানুষ তথা ব্যাপক জনগোষ্ঠী সুযোগ পেলেই সংগঠিত হয়ে গণশত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং আওয়াজ তোলে জুলুম-নিপীড়ন ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে। এমন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে বর্তমান সময়েও।

নিউইয়র্ক সিটির মিউজিয়াম অব নেচারাল হিস্ট্রির সামনে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত ২১ জুন রোববার ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরদিন সোমবার ট্রাম্প তার বিরোধিতার কথা জানান। উল্লেখ্য যে, মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহরে গত ২৫মে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তার নির্মমতায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে এ ঘটনার প্রতিবাদসহ বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। বিক্ষোভ হয় ওই জাদুঘরের সামনেও। প্রতিবাদকারীরা সেখান থেকে রুজভেল্টের ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্যটি অপসারণের দাবি জানান। অনেকের মতে, এ ভাস্কর্য বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিকতা সম্প্রসারণের এক প্রতীক।

উল্লেখ্য যে, ১৯৪০ সালে ঘোড়ার পিঠে বসা রুজভেল্টের ভাস্কর্যটি সেখানো বসানো হয়। ঘোড়ার পাশে একজন ন্যাটিভ আমেরিকান ও একজন কৃষ্ণাঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ৮০ বছর পর এখন এটি সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ভাস্কর্যটি অপসারণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষের কাছে এটি সরানোর আবেদন জানালে নগর কর্তৃপক্ষ তাতে সম্মতি দেয়। নগরীর মেয়র বিল ডি ব্লাজিও বলেন, জাদুঘর কর্তপক্ষের অনুরোধ তারা রক্ষা করেছেন। সমস্যা আছেÑ এমন ভাস্কর্য অপসারণের জন্য জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে সঠিক ও সময়োপযোগী বলে মনে হচ্ছে। আর জাদুঘরের প্রেসিডেন্ট অ্যালেন ভি ফুটার বলেন, এখন সাবেক প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সময় এসেছে।

নিউইয়র্ক সিটির মিউজিয়াম অব নেচারাল হিস্ট্রির সামনে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। কারণ ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সাথে বর্ণবাদ বিরোধী প্রতিবাদকারীদের দাবি একমাত্র বিষয় নয়, এর সাথে যুক্ত হয়েছে দু’টি কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও সিদ্ধান্ত। নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ বলেছেন, ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার ব্যাপারে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত সঠিক ও সময়োপযোগী হয়েছে। আর জাদুঘরের কর্তৃপক্ষ বলেছেন ওই ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সময় এসেছে।

আসলেই রুজভেল্টের ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলার সময় এসেছে। কারণ ওই ভাস্কর্যটিকে অনেকেই বর্ণবৈষম্য ও ঔপনিবেশিকতা সম্প্রসারণের প্রতীক বলে মনে করেন। ৮০ বছর আগে ওই ভাস্কর্যটি স্থাপনের সময় আমেরিকায় বর্ণবাদ ও উপনিবেশবাদের যে দাপট ছিল, তেমন বাস্তবতা তো এখন বর্তমান নেই। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক জনগোষ্ঠী এখন বর্ণবাদ বা উপনিবেশবাদের পক্ষে নেই। তাইতো বর্ণবাদবিরোধী মিছিলে সামিল হয়েছেন কালো, সাদা, বাদামী সববর্ণের মানুষ। অবশ্য শে^তাঙ্গ জাতীয়তাবাদে বিশ^াসী মানুষও আমেরিকায় আছে। যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাইতো বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন রুজভেল্টের ভাস্কর্য সরানোর সিদ্ধান্তটি অপছন্দ হয়েছে ট্রাম্পের। তিনি বিশ^ পরিবেশ আন্দোলকেও পছন্দ করেন না।

বহু আগেই মানুষ সমাজ গঠন করেছে, রাষ্ট্র গঠন করেছে। আর বর্তমান সভ্যতায় তো গড়ে উঠেছে নানাবিধ সংগঠন, ফেডারেশন, ফোরাম ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। সবাইতো উন্নয়ন, অগ্রগতি, শান্তি-সৌহার্দ্য, প্রগতি ও মানবিকতার কথা বলছেন। কিন্তু কাক্সিক্ষত এই সব শব্দমালার সাথে আমাদের আচরণ কতটা সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে? কথা ও কাজে মিল না থাকলে কখনো লক্ষ্যে পৌঁছা যায় কী ? গড়মিলের এই সভ্যতায় তাই কথিত শান্তি-সমৃদ্ধি সোনার হরিণ হয়ে গেছে। ঝলমলে এই সভ্যতা ক্রমেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। মানুষ মানুষের সাথে, রাজা-প্রজার সাথে, রাষ্ট্র-রাষ্ট্রের সাথে সঙ্গত আচরণ করছে না। আর শিল্পের নামে, বিজ্ঞানের নামে, উন্নয়নের নামে ক্ষমতাবানরা প্রকৃতির ওপর চালিয়ে যাচ্ছে অত্যাচার। জীববৈচিত্র্যে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতেও এখন মানুষ কুণ্ঠিত নয়। অবশ্য নেতিবাচক এইসব কর্মকা-ে সব মানুষের দায় এক রকম নয়। যারা যত ক্ষমতাবান, ক্ষতিকর কর্মকা-ে তারা ততই বেপরোয়া। আন্তর্জাতিক পরিম-লে এসব নিয়ে কথা হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ তেমনকিছু হয়নি। যারা অভিযুক্ত তারা কথামালায় ব্যস্ত থাকেন, চাতুর্যের পথে চলেন এবং কখনো কখনো প্রদর্শন করেন দাম্ভিক আচরণ। এর ফলাফল যা হবার তাই হচ্ছে। 

করোনা ভাইরাস আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এই মহামারি বর্তমান সভ্যতার অজাচার, অনাচারেরই ফল। এ বিষয়ে কথা বলেছেন জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা ও ডব্লিউডব্লিউএফ ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, করোনা ভাইরাসের মতো মহামারি, মানুষের হাতে প্রকৃতি ধ্বংসের ফল। একই সঙ্গে তারা আরো বলেছেন, এই কঠিন বাস্তবতাকে বিশ্ববাসী দশকের পর দশক ধরে এড়িয়ে চলেছেন। যুক্তরাজ্যের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানকে ওই সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলেছেন, বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হারে যেসব রোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তার পেছনে চালকের ভূমিকায় আছে বণ্যপ্রাণীর অবৈধ ও অস্থিতিশীল বাণিজ্য এবং বনভূমি ও অন্যান্য বন্যএলাকা উজাড় করার মতো বিষয়গুলো। করোনা ভাইরাসের মতো মহামারি থেকে পরিত্রাণ পেতে সবুজ ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলা আহ্বান জানান তারা। এছাড়া প্রকৃতি ধ্বংস ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস থেকে ফিরে আসার কথাও উল্লেখ করেন তারা। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের বক্তব্য আমাদের মহান স্রষ্টার সেই সতর্কবার্তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। যেখানে বলা হয়েছে, জলে-স্থলে যে বিপর্যয় তা মানুষের হাতের অর্জন। কিন্তু মানুষ তার অর্জন সম্পর্কে সতর্ক হবে কী?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ