মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান থেকে সরতে চীন-ভারত সমঝোতা

সংগ্রাম ডেস্ক : লাদাখের গালওয়ান উপত্যকার বিতর্কিত সীমান্তে মুখোমুখি অবস্থান থেকে সেনা সরানোর বিষয়ে ভারত ও চীনের সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। সোমবার দুই পক্ষের সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে চলা বৈঠকে এ সমঝোতা হয় বলে গতকাল মঙ্গলবার ভারতের সরকারি সূত্রগুলো বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে। “পূর্ব লাদাখের সবগুলো সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সেনা পেছানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং উভয়পক্ষই তা বাস্তবায়ন করবে,” বলেছে সূত্রগুলো। গত সপ্তাহে হিমালয় পর্বতের পশ্চিমাংশে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতার গালওয়ান উপত্যকায় দুই পক্ষের সেনাদের হাতাহাতি লড়াইয়ে ভারতের ২০ সেনা নিহত ও অন্তত ৭৬ জন আহত হয়। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস চীনের দিকেও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করলেও বিস্তারিত কিছু জানায়নি। এরপর থেকে লাদাখ সীমান্তের বেশ কয়েকটি এলাকায় দুই পক্ষের সেনারা মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে ছিল। বিরাজমান উত্তেজনা কমিয়ে আনতে উভয়পক্ষের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৈঠকে বসেন। গতকাল মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সীমান্তের বিতর্কিত অংশে উত্তেজনা লাঘবে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে চীন ও ভারত একমত হয়েছে। গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে চীনের ৪০ জন সেনা নিহত হওয়ার যে খবর সম্প্রতি গণমাধ্যমে এসেছে সেগুলোকে ‘ভুয়া খবর’ বলে বর্ণনা করেছেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান। রোববার ভারতের একজন মন্ত্রী গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওই সংঘর্ষে চীন অন্তত ৪০ জন সেনা হারিয়েছে বলে দাবি করেছিলেন।
ভারতের যেসব দাবি মেনে নিল চীন
লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় সেনা পেছনোর বিষয়ে ‘পারস্পরিক ঐকমত্যে’ পৌঁছেছে ভারত ও চীন। শুধু তাই নয়, সীমান্তে আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে ভারতের পক্ষ থেকে যেসব দাবি জানানো হয়েছিল চীনা বাহিনী নাকি তা মেনে নিয়েছে। মঙ্গলবার ভারতীয় সেনা সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। লাদাখে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সোমবার পূর্ব লাদাখে চুসুল সেক্টরে দুদেশের কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠক হয়।
বৈঠকে লেহতে মোতায়েন ১৪ নম্বর কোরের লেফটেন্যান্ট জেনারেল হরেন্দ্র সিংহ ও চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির দক্ষিণ শিনজিয়াং মিলিটারি ডিস্ট্রিক্টের মেজর জেনারেল লিন লিউয়ের মধ্যে প্রায় ১১ ঘণ্টা আলোচনা হয়।
বৈঠকে গলওয়ান উপত্যকার ১৫ জুনের চীনা হামলা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান হরেন্দ্র। পাশাপাশি পিএলএ-র তরফে ৪ জুনের কোর কমান্ডার স্তরের বৈঠকে সিদ্ধান্ত মানা হয়নি বলেও তথ্যপ্রমাণ পেশ করেন তিনি।
তবে সরকারিভাবে কোনো পক্ষই গতকালকের ওই বৈঠক নিয়ে এখনও কোনো বিবৃতি দেয়নি।
খবরে বলা হয়, পূর্ব লাদাখের চুসুল লাগোয় মলডো অঞ্চলে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে ইতিবাচক ও গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। পূর্ব লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় সংঘাতের ক্ষেত্রগুলো থেকে সেনা পেছোনোর বিষয়ে আলোচনায় সম্মতি দিয়েছে চীন। সেনা পেছনোর পাশাপাশি, এলএসি বরাবর স্থায়ী বাঙ্কারসহ বিভিন্ন নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার বিষয়টিতেও চীনা ফৌজের কর্মকর্তারা নীতিগতভাবে সম্মতি জানিয়েছেন বলে ভারতীয় সেনা সূত্রের খবর। গলওয়ান উপত্যকার পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৪ এবং ১৫ এর পাশাপাশি গোগরা উপত্যকার হট স্প্রিং এলাকার পেট্রোলিং পয়েন্ট ১৭ এবং প্যাংগং লেকের উত্তরাংশে ফিঙ্গার ৪ থেকে ফিঙ্গার ৮ পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই স্থায়ী ও অস্থায়ী নির্মাণ করেছে চীন। প্রসঙ্গত লাদাখের গলওয়ান উপত্যকায় গত ১৫ জুন চীনা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে ভারতীয় সেনার। তাতে কর্নেল-মেজরসহ ২০ ভারতীয় সেনা প্রাণ হারান। আহত হন আরও ৭৬ জন সেনা।
ভারতকে হুঁশিয়ারি
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ভারতকে হুঁশিয়ার করে বলা হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরে চীনবিরোধী মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ‘৬২ সালের যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে ভারতকে। তবে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যুদ্ধের বদলে উত্তেজনা প্রশমন করতে চাইছেন গ্লোবাল টাইমস।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে লাদাখ সীমান্তে ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যে উত্তেজনার পর গত ১৫ জুন (সোমবার) উভয় পক্ষ সংঘাতে জড়ায়। এতে ভারতের পক্ষে ২০ সেনা নিহত হওয়ার কথা জানানো হয়। দাবি করা হয়, বেশ কয়েকজন চীনা সেনাও নিহত হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কিছু জানায়নি বেইজিং। ভারত ও চীন পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করার অভিযোগ এনেছে।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ভারতে চীনবিরোধিতা জোরালো হয়েছে। চীনা পণ্য বয়কটের ক্যাম্পেইন চলছে সেখানে। রবিবার (২১ জুন) চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমাগত বাড়তে থাকা চীনবিরোধী মনোভাবকে ভারত সরকার নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সেদেশের অবস্থা ১৯৬২ সালে সীমান্ত সংঘাতকালীন পরিস্থিতির চেয়েও নাজুক হবে।
সম্প্রতি, ভারতের সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রী ভিকে সিং বলেছেন, ‘আমাদের পক্ষের যদি ২০ জন নিহত হয়ে থাকে, তবে তাদের (চীন) পক্ষের অন্তত দ্বিগুণ সংখ্যক সেনা প্রাণ হারিয়েছে।’ গ্লোবাল টাইমস মনে করে, এ ধরনের হুঙ্কার দিয়ে ভারত মূলত দেশের কট্টরপন্থীদেরকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। সরকার চায় না কট্টরপন্থীরা সরকারের ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করুক এবং চীনকে উসকে দিক।
বেইজিংও এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষে প্রাণহানির সংখ্যা প্রকাশ করেনি, কারণ দেশটিও উত্তেজনা প্রশমিত করতে চায়। গ্লোবাল টাইমস মনে করে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেদেশের সেনাদেরকে চীন সীমান্তে যেকোনও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দিলেও তিনি মূলত গালওয়ান উপত্যকায় সাম্প্রতিক সংঘাতজনিত উত্তেজনা প্রশমিত করতে চাইছেন। জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘কেউ আমাদের সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেনি। কেউ এখন সেখানে নেই। আমাদের কোনও নিরাপত্তা চৌকিও দখল হয়ে যায়নি।’
কত সেনা নিহত হয়েছে লাশ কোথায়? তোপের মুখে চীন সরকার : গালওয়ান উপত্যকায় ১৫ জুন রাতে ভারতীয় সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) নিহত সদস্যদের নামধাম এখনো প্রকাশ করেনি চীন। এমনকি, সরকারিভাবে জানানো হয়নি নিহতদের সংখ্যাও। এই পরিস্থিতিতে ক্রমশ ক্ষোভ দানা বাঁধছে সে দেশের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
চীনা নাগরিকদের একাংশ সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি শাসক কমিউনিস্ট পার্টি এবং সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিশানা করে বলছেন, 'কিভাবে শহীদদের সম্মান করতে হয়, তা ভারতকে দেখে শিখুন।' কতজন সেনা নিহত, তাদের দেহ কোথায় রয়েছে, শেষকৃত্য হয়ে গেছে কিনা, সে সব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।
গালওয়ানে সংঘর্ষের ঘটনায় পিপলস লিবারেশন আর্মির এক কমান্ডারের মৃত্যুর খবর গতকাল ভারত-চীন সেনা কর্মকর্তাদের বৈঠকে স্বীকার করেছিল বেইজিং। চীনের সরকারি সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের দাবি, সংঘর্ষে ভারতের চেয়ে চীনের কম সেনা নিহত হয়েছে। যদিও ১৫ জুনের পরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, পিপলস লিবারেশন আর্মির অন্তত ৪৫ জন সদস্য হতাহত হয়েছে।
সম্প্রতি আমেরিকার একটি সামরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতীয় সেনার পাল্টা হামলায় নিহত চীনা সেনার সংখ্যা অন্তত ৩৪। চীনা নেটিজেনদের একাংশের দাবি, পিএলএ’র নিহত কমান্ডারের দেহ গোপনে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিহত অন্য সেনাদের বিষয়ে এখনো মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে চীনের সরকার। সূত্র : আনন্দবাজার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ