মঙ্গলবার ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০
Online Edition

গলওয়ানের পর এবার চীনের টার্গেট ‘দেপসাং উপত্যকা’

সংগ্রাম ডেস্ক : গলওয়ান উপত্যকা, প্যাংগং লেকের পর এবার দেপসাং ভ্যালিও চীন কব্জা করার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ভারত।
ভারতের দাবি, দেপসাংয়ে ইতিমধ্যেই সেনার সংখ্যা বাড়াতে শুরু করেছে চীন। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন এলাকায় সেনার সঙ্গে ট্যাঙ্ক, কামানও মোতায়েন করতে শুরু করেছে। ওই এলাকায় চীন দ্রুত সেনা মোতায়েনের জন্য রাস্তাও তৈরি করছে।
ভারতের সেনা সূত্রের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে কলকাতার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম।
এ বিষয়ে লে. জে. (অব.) রামেশ্বর রায় বলেছেন, ‘এতদিন চীনের পক্ষে দেপসাং ভ্যালিতে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা মুশকিল ছিল। কারণ পাহাড়ের ওপর দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি থেকে ভারত ওই এলাকায় কর্তৃত্ব করে। কিন্তু এখন চীনের সেনা দেপসাং ভ্যালির দক্ষিণে, গলওয়ান ভ্যালিতে পাহাড়ের মাথায় চলে এসেছে। ওদিকে প্যাংগং লেকের মধ্যে ঢুকে আসা ফিঙ্গার ফোর নামক পাহাড়ের মাথাতেও চীনের সেনা ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। এরপর চিন দেপসাংয়েও সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করবে। বাস্তবের জমিতে এর অর্থ হলো, দেপসাং ভ্যালি থেকে একেবারে নীচে ডেমচক পর্যন্ত কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা চীনের রয়েছে।’ আনন্দবাজার, দ্য ইস্টার্নলিঙ্ক।
তিনি আরও বলেন, ‘দারবুক থেকে শিয়ক হয়ে দৌলত বেগ ওল্ডি বিমানঘাঁটি পর্যন্ত যে রাস্তা তৈরি হচ্ছে, তা আমাদের এলাকায় হলেও তা চীনের মাথা ব্যথার কারণ। চীন পাহাড়ের ওপর থেকে এই রাস্তায় গতিবিধির ওপর নজরদারি করতে চায় বলেই গলওয়ান ঘাঁটির ১৪ নম্বর পেট্রলিং পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার তোয়াক্কা না করে পাহাড়ের ওপরে চলে এসেছে। সেখান থেকে চীন দৌলত বেগ ওল্ডির দিকে যাওয়া রাস্তায় নজরদারি করতে পারবে। ফলে সামরিক দিক থেকে আমাদের দৌলত বেগ ওল্ডি দুর্বল হয়ে পড়ল।’
আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেপসাং ভ্যালিতে চীনের সেনা ২০১৩-র এপ্রিলে প্রায় তিন সপ্তাহ ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল। আগস্ট মাসেই দেপসাংয়ের ওপরে কর্তৃত্ব করতে বিশ্বের সর্বোচ্চ বিমানঘাঁটি দৌলত বেগ ওল্ডি চালু করে ভারত। এবার গলওয়ান বা প্যাংগং থেকে চীনের সেনাকে সরানো সহজ হবে না বলেই মনে করছেন সাবকে সেনা কর্মকর্তারা।
রামেশ্বর বলেন, ‘অনেকে বলছে, চীনের সেনা শীতে সরে যাবে। সরে যাওয়ার মনোবাঞ্ছা থাকলে কংক্রিটের বাঙ্কার তৈরি করত না। আমাদের সেনা সদস্যরা শীতের সময় ওই ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় থাকতে পারলে, ওরা পারবে না কেন?’
অবসরপ্রাপ্ত এ লেফটেন্যান্ট জেনারেল বলেন, ‘আমি যদি মনে করি, আমাদের পাল্টা আক্রমণে যাওয়ার উপায় নেই, তা হলে তাদের অন্তত ওখানেই আটকাতে হবে। গলওয়ান, প্যাংগং বা দেপসাং, কোথাও এগোতে দেয়া চলবে না। চীন কথা বোঝে না। সমানে সমানে শক্তি হলে তবেই গুরুত্ব দেয়। সেটাই করতে হবে।’

ভারতীয় সৈন্যদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যার রোমহর্ষক ছবি প্রকাশ
গত ১৫ জুন লাদাখে ভারত-চীন সীমান্তে এক সংঘর্ষে চীনা সেনাদের হাতে ভারতের ২০ জন সৈন্য নিহত হয়েছে। ভারতীয় সেনা সদস্যদের পিটিয়ে হত্যার রোমহর্ষক কিছু ছবি প্রকাশিত হয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যম এসব ছবি দেশটির সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পেয়েছে বলে দাবি করে প্রকাশ করেছে।
সংবাদ মাধ্যমটি আরও দাবি করেছে যে, ওই দিনের সংঘর্ষে চীনের অন্তত ৪৪ সৈন্য নিহত হয়েছে। তবে চীনা সৈন্যদের হতাহতের কোনো ছবি সংগ্রহ না করতে পারার কথা জানিয়েছে ইস্টার্নলিঙ্ক।
এদিকে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে চীনা সৈন্যদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ব্যাপারে শনিবার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করে বেইজিং। এই মন্তব্যে ভারতীয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকানি দেয়ার অভিযোগ এনেছে দেশটি।
এছাড়াও ৯ জুন গালওয়ান উপত্যকার উপগ্রহের ছবি থেকে ১৬ জুনের ছবি অনেকটাই আলাদা। উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, সীমান্তের কাছে চীনের বড় সড় সামরিক প্রস্তুতি চলছে।
এলএসি বরাবর চীনা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ১২৭টি গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এলাকাটি এলএসি থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
ভারত সীমান্ত থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে পুরোদস্তুর বিমান ঘাঁটিও গড়ে তুলেছে চীন। লাদাখের প্যাঙগঙ লেকের ২০০ কিলোমিটার দূরে তিব্বতের ‘গাড়ি কুনসা’য় ১০ বছর আগে বিমানবন্দর নির্মাণ করে চীন।
বেইজিং তখন জানিয়েছিল অসামরিক বিমান পরিবহনের জন্য বিমানবন্দরটি তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু উপগ্রহ চিত্রে ধরা পড়েছে, এক মাসে এ বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের অনেক বেড়ে গেছে। সেখানে রীতিমতো বিমান ঘাঁটি বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
‘সে রাতে আটক চীন সেনারাও’! ভি কে সিংহের বক্তব্যে অনেক প্রশ্ন
লাদাখে চীনের সেনার হাতে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু এবং ১০ জন সেনাকে চীন তিন দিন বন্দী করে রাখার পরে প্রশ্ন উঠেছে, নরেন্দ্র মোদি সরকার কি বেজিংয়ের সামনে আত্মসমর্পণ করে ফেলল! রাহুল গান্ধী আজ নরেন্দ্র মোদিকে ‘সারেন্ডার মোদি’ বলে তকমাও দিলেন। এই পরিস্থিতিতে এ বার মোদি সরকার দাবি করল, গত সোমবার রাতের সংঘর্ষের পরে চীনের সেনারাও ভারতের হেফাজতে ছিল।
প্রাক্তন সেনাপ্রধান, বর্তমানে মোদি সরকারের সড়ক প্রতিমন্ত্রী জেনারেল ভি কে সিংহের দাবি, ‘‘যখন মারামারি হয়, তখন আমাদের কয়েক জন অন্ধকারের মধ্যে ওদের এলাকায় চলে যান। ওদের কয়েক জন আমাদের দিকে চলে আসেন। সংবাদমাধ্যমে খবর হচ্ছে, আমাদের এত লোককে ওরা আটকে রেখেছিল, তার পরে ছেড়ে দিয়েছে, তা হলে একই ভাবে আমরাও ওদের লোকদের ছেড়ে দিয়েছি। এখানে কাউকে কয়েদ করে রাখার বিষয় নেই।’’
সরকারের একটি সূত্রের দাবি, চীনের অন্তত ১৫ জন ফৌজি ভারতের হেফাজতে ছিল। শুধু তাই নয়, ভি কে সিংহ জানিয়েছেন, ভারতের ২০ জন মারা গেলে, চীনের দিকেও তার দ্বিগুণের বেশি জওয়ান মারা গিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘‘৪৩ জনের হিসেব দেওয়া হয়েছে। এদের আমাদের সেনারা পড়ে থাকতে দেখেছে। এর বাইরেও কত জন ঘায়েল হয়েছেন, তা কেউ জানে না।’’

কাশ্মীর ছেড়ে লাদাখ সীমান্তে যাচ্ছে ভারতীয় সেনারা
চীন-পাকিস্তান-নেপাল। ত্রিমুখী সীমান্ত সঙ্কটে প্রায় দিশেহারা এখন ভারত। চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে ভারতীয় সেনা নিহত হওয়া এবং গালওয়ানসহ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় প্রতিবেশী দেশটির প্রবল উপস্থিতি নতুন করে সেনাবিন্যাসে মনোনিবেশ করতে হচ্ছে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগকে। ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের আগে থেকে যে সেনারা কাশ্মীরের নানা জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে মোতায়েন ছিল, তাদের এখন লাদাখ সীমান্তে পাঠানো হচ্ছে। খবর আনন্দবাজার পত্রিকা।
৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের আগে থেকে এই সেনারা কাশ্মীরে মোতায়েন ছিলো। তবে রাতারাতি সেনা সরে যাওয়ায় কাশ্মীরের পির পাঞ্জাল ক্ষেত্রের মতো কিছু জায়গা কার্যত সেনাশূন্য হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, সেনাদের শূন্যস্থানে পাঠানো হচ্ছে সিআরপি সদস্যদের।
কাশ্মীরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনা, আধাসেনা ও পুলিশকে নিয়ে একটি কোর গ্রুপ গঠন করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সে গ্রুপের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কাশ্মীর থেকে আইটিবিপির ২০ কোম্পানি সেনা এরই মধ্যে লাদাখে পৌঁছেছে। আরও কিছু সেনা পাঠানো হবে। আইটিবিপি ও সেনারা মিলে চীন ও ভারতের মধ্যে ৩,৪৮৮ কিলোমিটার এলএসির নিরাপত্তার দায়িত্বে আইটিবিপির যে সেনাদের সেখানে পাঠানো হয়েছে বা হচ্ছে, গত এক বছর ধরে তাদের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
আইটিবিপি ছাড়া সেনার কিছু বাহিনীকেও লাদাখে পাঠানো হচ্ছে। ১০ নম্বর ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের যে রোমিও বাহিনী পির পাঞ্জাল ও আখনুরে মোতায়েন রয়েছে, তাদের একাংশ লাদাখে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এক সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই দুই অঞ্চলে এখন সেনা নেই। সিআরপিকে সেখানে আনা হবে। আপাতত লাদাখেই নজর মোদি সরকারের।
নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রের খবর, ১০ নম্বর ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের কয়েকটি শিখ ইউনিটকেও লাদাখে পাঠানো হচ্ছে।

বিশেষ পর্বত বাহিনী মোতায়েন ভারতের
সীমান্তে চীনা আগ্রাসন ঠেকাতে বিশেষ পর্বত বাহিনী মোতায়েন করেছেন ভারত। চীন-ভারতের মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (সীমান্ত) রয়েছে। এই পুরো সীমান্ত জুড়ে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছে দেশটি। চীনা লিবারেশন আর্মি পশ্চিম বা মধ্য সেক্টরে সীমান্ত লঙ্ঘন করলে জবাব দেবে এ বিশেষ বাহিনী।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীনা সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে কোনো আগ্রাসন চালালে তা প্রতিহত করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এ বিশেষ বাহিনীকে।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের জন্য এসব বাহিনীকে প্রস্তুত করা হয়েছে। চীনা সেনাবাহিনীর বিপরীতে মোতায়েন করা এসব পর্বত বা পাহাড়ি সেনার গেরিলা ও অতি উচ্চতায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এসব কসরত কার্গিল যুদ্ধে দেখানো হয়েছে বলে খবরে বলা হয়েছে।
ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জানিয়েছেন, পর্বতে যুদ্ধ করা কঠিন। এসব বাহিনী বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত। এরা অতি উচ্চতায় থেকে যুদ্ধ করতে পারে। শতাব্দি ধরে উত্তরখন্ড, গর্খা, অরুনাচল এবং সিকিম সেনাবাহিনী পাহাড়ে যুদ্ধের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এরপরই শুক্রবার সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে তিনি জানান, কেউ (চীন) সীমান্ত অতিক্রম করেনি।
পরবর্তীতে কূতনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা হলেও উভয় দেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন অব্যাহত রেখেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ