শুক্রবার ২১ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

বেসরকারি হাসপাতালে ব্যবস্থা নেই করোনা চিকিৎসার ॥ উদ্বিগ্ন খুলনাবাসী 

খুলনা অফিস: দেশের সকল বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড ও নন  কোভিড চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি খুলনাতে। নির্দেশনার প্রায় এক মাস অতিবাহিত হলেও কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য খুলনার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো কোনটাই বাস্তবায়ন হয়নি। এদিকে খুলনা জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে মারা গেছে ১২ জন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারা দেশের ন্যায় খুলনায়ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাস্থ্য সেবায় অর্ধেক এর বেশি ভূমিকা রাখে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানগুলো তেমন কোন সেবা দিতে পারছে না। ফলে দিনরাত পরিশ্রম করেও হিমশিম খাচ্ছে সরকারি হাসপাতালগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা চিকিৎসার জন্য খুলনার একমাত্র হাসপাতালে ৮০টি বেডের ব্যবস্থা রাখার কথা থাকলেও শনিবার পর্যন্ত সেখানে ছিল মাত্র ৬০ জন। করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালকে করোনা চিকিৎসা শুরুর নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ২৪ মে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি দেশের সব বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তবে খুলনার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এ আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান হাসপাতাল মালিকরা। তারা বলছেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ছাড়া শুধু আদেশ দিলে বেসরকারি হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ বেসরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল কোনটিই নেই। 

প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকদের সংগঠন সূত্রে জানা যায়, খুলনায় বেসরকারি পর্যায়ে হাসপাতাল ক্লিনিক-এর সংখ্যা শতাধিক হলেও মাত্র ৪টি প্রতিষ্ঠানে ৫০ বা তার থেকে বেশি শয্যা আছে। এর মধ্যে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আদদ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। অপরটি হল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল। এর বাইরে বড় বড় কয়েকটি হাসপাতাল যেমন নার্গিস মেমোরিয়াল হাসপাতাল, গরীব নেওয়াজ হাসপাতালসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ৫০-এর কাছাকাছি রোগী ভর্তি রাখলেও এদের কারোই অনুমোদন ১০ বা ২০ বেডের বেশি না। যে চারটি প্রতিষ্ঠানে সরকারি চিঠি এসেছে তাদের কোন প্রতিষ্ঠানেরই অবকাঠামো ও জনবল কিছুই নেই। খুলনায় করোনা চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড একমাত্র সরকারি হাসপাতালে একজন চিকিৎসক একটানা ১০ দিন চিকিৎসা দেন, এরপর টানা ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে যান। পরবর্তিতে সেখান থেকে ৭ দিন বাড়িতে সময় কাটানোর পর আবার হাসপাতালে এসে যোগদান করেন। এতে করে নিয়মিত জনবলের তিনগুণ জনবল প্রয়োজন হয়। সরকারি হাসপাতালে জনবলের ঘাটতি মেটাতে ইতোমধ্যে ২২ জন চিকিৎসক ও ৯১ জন নার্স নিয়োগ দেয়া হয়েছে খুলনায়। 

এদিকে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল তুলনামূলক অনেক কম নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে বেসরকারি হাসপাতালগুলো। তিনগুণ জনবল এই মুহূর্তে নিয়োগ দিয়ে তাদের পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল মালিকরা। 

এছাড়া একই ভবনে কোভিড ও নন কোভিড রোগীদের চিকিৎসার যে কথা বলা হয়েছে তা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন হাসপাতাল মালিকরা। কোন হাসপাতালে  কোভিড রোগী ভর্তি করলে অন্য রোগী সেই হাসপাতালে আসতে চাইবেন না। ফলে সাধারণ রোগীরাও সেবা বঞ্চিত হয়ে কম মানসম্পন্ন হাসপাতালে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। 

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বড় চারটি হাসপাতালের কোনটিতেই সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারা বলছেন, কোভিড ও নন কভিড রোগীদের আলাদা আলাদা প্রবেশ ও বাহির পথ না থাকায় কোন ব্যবস্থা নিতে পারেননি তারা। 

বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির সভাপতি ডা. গাজী মিজানুর রহমান বলেন, করোনা চিকিৎসায় সরকারি নির্দেশনা যাতে খুলনার বেসরকারি হাসপাতাল মালিকরা পালন করতে পারে সেজন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনীয় জনবল ও যোগানও দিতে হবে। পিসিআর মেশিন সংগ্রহ করতে হবে। কোভিড, নন কভিড নয় প্রয়োজনে সরকার পুরো হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার জন্য সংযুক্ত করতে পারবেন। কিন্তু আর্থিক ও জনবল সব ধরনের সহযোগিতা ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে করোনা চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়।

খুলনা সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমদে জানান, রোববার দুপুর পর্যন্ত খুলনা জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা ছিল ৯৪৬ জন। রাতে খুমেকের ল্যাবে আরো ১৩৪ জন শনাক্ত হয়। এই নিয়ে রোগীর সংখ্যা দাঁড়ালো ১ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১২ জন। 

২৬ জুন পর্যন্ত ধান-চালের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ : করোনা পরিস্থিতির কারণে ২২ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত খুলনার ধান চাল বণিক সমিতিভুক্ত সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। জানা গেছে, খুলনা বড় বাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতি ও খুলনা ধান-চাল বনিক সমিতি আওয়াতাভুক্ত রয়েছে বড় বাজারের প্রায় সকল নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দোকান পাট।

খুলনা বড় বাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সোহাগ দেওয়ান বলেন, সমগ্র বাংলাদেশে করোনাভাইরাস যেভাবে মহামারী আকারে ধারন করেছে, সেভাবে খুলনায় প্রতিদিন বহু মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাজার সমিতির অন্তর্ভূক্ত কিছু ব্যবসায়ীও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরন করেছেন এবং কিছু কিছু ব্যবসায়ী আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ্য অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন। ফলে এই বাজারে করোনার ভয়াবহতা চরম আকার ধারণ করেছে। তাই সকলের সুস্থ থাকার জন্য সোমবার থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত সমিতির অন্তর্ভূক্ত সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

খুলনা ধান চাল বণিক সমিতির সভাপতি মো. মুনীর আহমেদ রোববার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, সমিতির ১৫তম কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদের নিয়ে মোবাইল কনফারেন্স’র মাধ্যমে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের কারণে সতর্কতা হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার পক্ষে সকলে মতামত ব্যক্ত করেন। সে কারণেই মোবাইল কনফারেন্সের সভায় ২২ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত খুলনার ধান চাল বণিক সমিতিভুক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসমুহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

তথ্য গোপন করে জানাযা-দাফন স্বজনদের খুলনা ত্যাগ : নগরীর যোগিপোল ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা কেবল শিল্প লি. এর সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও খানজাহান আলী থানা ইসলামী আন্দোলনের সহ-সভাপতি মোশারফ হোসেন (৭০) ১৪ জুন মৃত্যুবরণ করেন। পরিবারের দাবি তিনি হার্ট এ্যাটাকে মৃত্যুবরন করেছেন। তবে মৃত্যুর ছয় দিন পর ১৯ জুন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবের রির্পোটে দেখা যায় তিনি করোনা পজেটিভে আক্রান্ত ছিলেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্বজনরা এলাকা ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি দিয়েছেন।

মৃত মোশারফ হোসেনের স্বজনরা মৃত্যুর সঠিক কারণ গোপন করায় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা এবং এলাকায় জনপ্রিয়তা থাকায় প্রায় হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে তার জানাযা অুনষ্ঠিত হয়। এছাড়া তার গোসল থেকে দাফন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি সম্পৃক্ত ছিলেন।

প্রতিবেশি দোকানদার ফারুকসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, মোশারফের স্বজনরা মৃত্যুর কারণ গোপন করায় স্বাস্থ্যবিধি না মেনে হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে তার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি আরো বলেন, মোশারফ হোসেন জ্বর, শ্বাসকষ্টের কারণে স্বজনরা ১৪ জুন সকালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পিসিআর ল্যাবে করোনা টেস্টের জন্য নুমনা দিয়েছিল এ কথা তারা গোপন রাখে। ঐ দিন বিকেল ৫টায় তিনি মারা গেলে পরের দিন ১৫ জুন জোহরবাদ যোগিপোল ঈদগাহে হাজার মুসল্লির উপস্থিতিতে জানাযা সম্পন্ন হয়। পরবর্তিতে ১৯ জুন রিপোর্টে তার করোনা ধরা পড়ে। করোনা পজেটিভ ধরা পড়ার পরায় ২০ জুন এলাকাবাসী জানতে পারে তিনি করোনা পজেটিভে আক্রান্ত ছিল। এরপর থেকে মোশারফের পরিবারের সদস্যরা বাড়ীতে তালা দিয়ে ঢাকায় চলে গেছে। এ ব্যাপারে মোশারফের স্বজনরা বলেন, গত ২০ জুন আমরা টেস্টের রির্পোট পেয়ে জানতে পারি তিনি করেনা পজেটিভে আক্রান্ত ছিলে। কেন তারা মৃত্যুর কারণ গোপন করলেন এ বিষয়ে কোন উত্তর দিতে পারিনি। করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেলে স্বজরা তথ্য গোপন করে দাফন-কাফনসহ সকল কাজ সম্পন্ন করছে। এতে করে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করায় করোনাভাইরাস সংক্রামণের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে যায়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ