রবিবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

গ্র্যাসামের সূত্র ও আমাদের সমাজ

ড. মো. নূরুল আমিন: বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার ফারহানা রুমিন সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে একটি বক্তৃতা করেছেন। বক্তৃতায় তিনি শুধু বাজেট নয়, বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সামগ্রিক অবস্থা উল্লেখ করে আমাদের ব্যর্থতার একটা চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি ঘুষ, দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, সরকারি দুঃশাসনের মুখে সুশাসনের মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থা, শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র বিরাজিত নৈরাজ্য এবং সমাজ জীবনের প্রত্যেকটি স্তরে মন্দ ও সমাজবিরোধীদের মুখরিত পদচারণায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সরকারি ব্যর্থতার নিন্দা করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অর্থনীতির বিখ্যাত Grasham’s Law সূত্র বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেছেন। সংসদে তার বক্তৃতাটি শুনে দীর্ঘদিন পর একজন শিক্ষিত মানুষের বক্তব্য শুনছি বলে মনে হলো। বিএনপির  আরেক এমপি জনাব হারুনও ভালো বক্তৃতা করেন, তবে ফারহানা রুমিনের বক্তব্যটি আমার ভালো লেগেছে। তার কণ্ঠে ছিল দরাজ ভাষা ছিল শালীন এবং সাবলীল। জাতি তার কাছ থেকে এ ধরনের আরো বক্তব্য আশা করে।

এখন গ্র্যাসামের সূত্র প্রসঙ্গে আসি। গ্র্যাসামের সূত্র অর্থনীতিতে বহুল পঠিত ও বহুল আলোচিত একটি সূত্র বা বিধি। এই সূত্রটি এখন আধুনিক বিশ্বে আচরণ বিজ্ঞানেও ব্যবহৃত হয় এবং মানব সম্পদ উন্নয়নে বিশেষজ্ঞরা তাকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধি হিসেবে ব্যবহার করেন। এর ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই জানেন না।

স্যার থমাস গ্র্যাসাম ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর একজন বণিক এবং প্রথিতযশা একজন অর্থনীতিবিদ। তিনি বৃটিশ রাজপরিবারের উপদেষ্টাও ছিলেন এবং বৃটিশ মুদ্রা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার ব্যাপারে রাজাদের পরামর্শ দিতেন। স্যার গ্র্যাসাম রাজকীয় এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং উইল করে তার যাবতীয় সম্পত্তি গ্র্যাসাম কলেজকে দান করে দিয়ে গিয়েছিলেন। গ্র্যাসাম কলেজ ছিল লন্ডনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রথম প্রতিষ্ঠান।

বাজারে প্রচলিত একাধিক খাদ বিশিষ্ট ধাতব মুদ্রার ব্যাপারে ভোক্তা আচরণের পূর্বাভাস হচ্ছে গ্র্যাসামের সূত্রের মূল কথা। গ্র্যাসামের যামানায় ইংল্যান্ডের বাজারে দু’ধরনের মুদ্রা ছিল। একটি ছিল আসল ধাতব মুদ্রা যার কোনো খাদ ছিল না, আরেকটি ছিল খাদ বিশিষ্ট মুদ্রা যা পরবর্তীকালে মুদ্রার উৎপাদন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে সরকার প্রচলন করেছিলেন। যাই হোক, সরকারিভাবে উভয় মুদ্রাকে একই মূল্যমানের বলে গণ্য করা হয়। ফলে বিশুদ্ধ ধাতু দিয়ে তৈরি আসল মুদ্রাকে মানুষ তথা ভোক্তা জনগণ ভালো মুদ্রা (Good Money) এবং খাদ বিশিষ্ট মুদ্রাকে খারাপ মুদ্রা (Bad Money) হিসেবে গণ্য করতে শুরু করে। এর কারণ ছিল স্বাভাবিক। কেননা ভালো মুদ্রা খাদমুক্ত তথা মৌলিক ধাতু দিয়ে তৈরি এবং খারাপ মুদ্রা ছিল খাদযুক্ত ধাতুর তৈরি। দেখা গেল মানুষ আসল ধাতুর তৈরি টাকা বা মুদ্রা মওজুত করতে শুরু করেছে। এতে করে ভালো মুদ্রা বাজার থেকে উঠে গেছে এবং খারাপ বা খাদযুক্ত মুদ্রায় বাজার ভর্তি হয়ে গেছে। এটাকেই বলা হয় Bad Money drives Good Money out of circulation. খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে বাজারছাড়া করে এবং! এটাই গ্র্যাসামের সূত্র নামে খ্যাতি অর্জন করে।

সরকারি কর্তৃপক্ষ যখন ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে অস্বীকৃতি জানায় তখনই গ্র্যাসামের সূত্রটি প্রযোজ্য হয়। নোবেল বিজয়ী পণ্ডিত রবার্ট মানডেল যথার্থই বলেছেন, ‘ভালো এবং মন্দ যদি একই দামে পাওয়া যায় তাহলে মন্দের প্রাধান্য ভালোকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়।’ এ ক্ষেত্রে মুদ্রার মূল্যায়ন যদ তার আসল গুণ ও মূল্যমানের উপর ভিত্তি করে করা হয় তাহলে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে পারে।

উল্লেখ্য যে, এই সূত্রটি গ্র্যাসামের নামে প্রচলিত হলেও তার জন্মের আগে থেকেই বিশ্বে প্রচলিত ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে তাইমিয়াও একই কথা বলেছিলেন। মধ্যযুগের লেখক নিকোলাস অরেসাম চতুর্দশ শতাব্দীতেও এটি জানতেন (১৪৭৩-১৫৪৩)। প্রাচীন ইতিহাসের কোনো কোনো পর্যায়ে এই সূত্রটি কপার্নিকান সূত্র হিসেবেও প্রচলিত ছিল। যা হোক ১৮৫৮ সালে হেনরী ডানিং নামক একজন বৃটিশ রাজকীয় অর্থনীতিবিদ এককভাবে এটিকে গ্র্যাসামের সূত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য ধাতব মুদ্রার ব্যবহার কমে যাবার কারণে গ্র্যাসামের সূত্রটির কার্যকারিতাও বর্তমানে হ্রাস পেয়েছে। তথাপিও এর নৈতিক শিক্ষা অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে সারা দুনিয়ায় স্বীকৃতি লাভ করেছে। এই সূত্রটি এখন আর শুধু অর্থনীতির সাথে জড়িত নয়; যেখানে ভাল মন্দের পার্থক্য করা হয় না, ভালদের উৎসাহিত করা হয় না এবং এর ফলে সমাজে মন্দরা জেঁকে বসে সেখানেই এই সূত্র প্রয়োগ করা হয়। সূত্রটি শুধু মুদ্রা বাজার নয়, সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এটি এখন সমভাবে প্রযোজ্য। গ্রাসামের জন্মের প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে এরিস্টোফেন নামক একজন মনীষী ও মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কথা বলতে গিয়ে তার বিখ্যাত নাটক ‘Frog’ এ অবিকল এই সূত্রটির কথা বলেছিলেন। এতে তিনি বলেছিলেন,

 “The course our city runs is the same towards men and money she has true and worthy sons she has fine new gold and ancient silver coins untouched with alloys gold or silver Each well minted tested each and ringing Clear yet we never see them! others pass from hand to hand sorry brass just struck last week and branded with a wretched brand So with men we known for upright blameless names and noble names

Those we spurn for men of brass”

এখানে এরিস্টোফেন আক্ষেপ করে বলছেন যে এথেন্সে সোনার মানুষ তথা যোগ্যলোকের অভাব নেই কিন্তু তথাপিও নগরীটি পরিচালনা করছে পিতলের লোক তথা অযোগ্য লোকেরা। এটি তখনি ঘটে যখন যোগ্য ও গুণী লোকের পুরস্কার এবং অযোগ্য ও সমাজের দুষ্টু লোকেরা তিরস্কার না পায়। প্রকৃতপক্ষে গ্রাসামের আগে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনার সাথে এই সূত্রটি সম্পৃক্ত করে সর্বপ্রথম বলেছিলেন যে সমাজে যদি ভাল লোককে সম্মান ও প্রাধান্য দেয়া না হয় তাহলে মন্দ লোকেরা সমাজ থেকে তাদের তাড়িয়ে দিয় সর্বত্র প্রাধান্য বিস্তার করে। এতে সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। মানুষ ভাল হওয়াকে অপরাধ মনে করে। ফলে ভাল মানুষের জন্ম হয় না। মনীষী ড. শহিদুল্লাহ বলেছেন যে দেশে ভাল মানুষের কদর নেই সে দেশে ভাল মানুষের জন্ম হয় না। পবিত্র কুরআনে সু-শাসনের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এতে তাকওয়ার ভিত্তিতে আল্লাহর প্রতি জবাবদিহিতা সম্পন্ন লোক তৈরির একটি চমৎকার পরিকল্পনা বিধৃত আছে এবং বলা হয়েছে যারা অন্যায় অবিচার, ঘুষ, দুর্নীতি, জুলুম নির্যাতন, অন্যদের হক নষ্ট করাও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত থেকে জীবন যাপন করবে এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে নিজের আচরণকে সংযত রাখবে তারা পুরস্কার হিসেবে জান্নাত পাবে, অন্যথায় জাহান্নামী হবে এবং অনন্তকাল শাস্তি ভোগ করবে। এই নীতিকে উর্ধ্বে রেখে চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা:) মিশরের গভর্ণরকে দেয়া এক চিঠিতে পরিস্কার বলেছিলেন,

‘ভাল এবং মন্দ উভয়ের প্রতি সমান ব্যবহার করোনা। এতে ভাল ব্যক্তি ভাল কাজ করতে নিরুৎসাহিত এবং মন্দ ব্যক্তি মন্দ কাজ করতে উৎসাহিত হবে (http//amana.org/ismali/html) দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে সদগুণ সম্পন্ন মানুষগুলো হতাশ হচ্ছে এবং দুষ্ট লোকেরা উৎসাহিত হচ্ছে। এতে সুকৃতির উচ্ছেদ এবং দুষ্কৃতির প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। একটি সভ্য জাতির জন্য এই অবস্থা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। এ ব্যাপারে সরকার এবং সরকার পরিচালনার সাথে যারা জড়িত তাদের সুমতি কামনা করি।

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ