বৃহস্পতিবার ০১ অক্টোবর ২০২০
Online Edition

প্রশ্ন যেখানে জীবন বাঁচানোর

আশিকুল হামিদ: থাকেন ফ্ল্যাট বাড়ির দোতলায়। কিন্তু ঘণ্টাখানেক ধরে নিজের ফ্ল্যাটের গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। নিচে নামতে পারছেন না। কারণ, একই ফ্ল্যাট বাড়ির পাঁতলার একটি ফ্ল্যাটের একজন রোগীর জন্য সিঁড়ি দিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার ওঠানো হচ্ছে। যারা ওঠাচ্ছেন তারা ওই ফ্ল্যাটের মালিক। অন্যদিকে আমার যে পরিচিতজন বিষয়টি সম্পর্কে ফোনে জানাচ্ছিলেন তিনি একজন ভাড়াটে। ভাড়াটে বলে তিনি আপত্তি বা প্রতিবাদ যেমন জানাতে পারছিলেন না তেমনি সিলিন্ডার ওঠানো থামাতে বলাও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। 

তাকে অবশ্য মান হারাতে বা অসম্মানিত হতে হয়নি। এক ঘণ্টার মধ্যেই অক্সিজেনের পাঁচটি সিলিন্ডার ওঠানোর কাজ শেষ হয়েছিল। বেচারা লেবারদের ঘাম আর গায়ের বিশ্রি গন্ধ শুকতে শুকতে আমার ওই পরিচিতজন দোতলা থেকে নিচে নেমে আসতে ‘সক্ষম’ হয়েছিলেন। নেমে আসার পর ফোনেই তিনি আমাকে সবকিছু জানিয়েছিলেন। বলেছেন, ফ্ল্যাট বাড়ির পাঁতলায় এক বয়ষ্ক ব্যক্তি নাকি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে তার স্ত্রী-সন্তানরা অনুমান করেছেন। সত্যিই আক্রান্ত হয়েছেন কি না সে বিষয়ে পরীক্ষারও আগে চিকিৎসকের পরামর্শে তারা কিছু ওষুধপত্তর যেমন কিনেছেন তেমনি আগাম সতর্কতা হিসেবে  অক্সিজেনের পাঁচটি সিলিন্ডার কিনে ‘স্টক’ও করেছেন। কারণ, ভদ্রলোকের শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তখন যদি অক্সিজেনের সিলিন্ডার না পাওয়া যায়!  

পেশাগত কারণে কিছুটা খোঁচ-খবর রাখতে হয় বলে অক্সিজেনের পাঁচ-পাঁচটি সিলিন্ডার কিনে ‘স্টক’ করার খবর জেনে স্তম্ভিত আমি কিন্তু একই সঙ্গে ভীত ও উদ্বিগ্নও হয়েছিলাম। একটি কারণ হলো, অক্সিজেনের সিলিন্ডারকে জীবন্ত বোমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সিলিন্ডারগুলোকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে সমতল কোনো স্থানে রাখতে হয়। রাখার এবং ব্যবহার করার সময় সামান্য এদিক-সেদিক হলেই সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তেমন বিস্ফোরণে মানুষের মৃত্যুই শুধু ঘটে না, ঘরের ভেতরে-বাইরে আগুনও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই তো মাত্র দিন কয়েক আগে রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হাসপাতালে এ ধরনের এক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ডে পাঁচ-পাঁচজন করোনা রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। 

সুতরাং দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকজনের ব্যবস্থা না করে কোনো বাসাবাড়িতে অক্সিজেনের সিলিন্ডার নিয়ে ওঠানো বা স্টক করার অর্থ আসলে সেখানে জীবন্ত বোমা রাখার মতো বিপদজনক কাজ করা। 

তাছাড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কোনো রোগীর শ্বাসকষ্টে বা চিকিৎসায় যখন অক্সিজেন ব্যবহার করা হয় তখন সেটা একটি থেরাপি। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ও নির্দেশনা ছাড়া কোনো রোগীকে অক্সিজেন দেয়াই যাবে না। রোগীর সেচুরেশন কত, ক্যানোলা নাকি মাস্কÑ কিভাবে অক্সিজেন দেয়া হবে সেটা কেবল একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকই বুঝতে পারবেন। এটা জানা কোনো সাধারণ মানুষের কাজ নয়। এজন্য দরকার ওয়েলট্রেইন্ড বা সুপ্রশিক্ষিত চিকিৎসা কর্মির। তাছাড়া কতক্ষণ ও কি পরিমাণে অক্সিজেন দিতে হবে, কখন ক্যানোলা বা মাস্ক খুলে অন্য চিকিৎসা শুরু করতে হবেÑ এসব কারণেও চিকিৎসক এবং সুপ্রশিক্ষিত চিকিৎসা কর্মির উপস্থিত থাকা দরকার। নাহলে বড় ধরনের প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটতে পারে। আগুনে পুড়ে যেতে পারে সম্পূর্ণ বাড়িও। 

অন্যদিকে চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা ও পরামর্শ  উপেক্ষা করে একদিকে একদিকে যেমন বাসাবাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার ‘স্টক’ করার কার্যক্রম শুরু হয়েছে অন্যদিকে তেমনি চাালানো হচ্ছে সিলিল্ডারের রমরমা বাণিজ্য। সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত রপোর্টে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে আগে প্রতি বছর ৬৫ হাজার অক্সিজেন সিলিন্ডার দরকার হতো। করোনার কারণে মানুষের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে সিলিন্ডারের চাহিদা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। হঠাৎ বেড়ে যাওয়া এই চাহিদারই সুযোগ নিচ্ছে টাউট ব্যবসায়ীরা।

প্রকাশিত রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, দেশে মেডিক্যাল ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল-এই দুই ধরনের অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহ করা হয়। মেডিক্যাল অক্সিজেন পাইপ লাইনের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করা হয়। হাসপাতালে বসানো বড় অক্সিজেন ট্যাংকের ধারণক্ষমতা সাধারণত পাঁচ থেকে বিশ টন থাকে। অনেক বড় সরকারি হাসপাতালে এখনো অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করা হয়নি। এসব হাসপাতালের পাশাপাশি অন্য হাসপাতালগুলোতেও পাইপলাইনের মাধ্যমে রোগীদের অক্সিজেন দিয়ে জীবন বাঁচানো হয়। করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ বহু সরকারি হাসপাতালেই এখনো ট্যাংক এবং পাইপলাইনের ব্যবস্থা করা হয়নি। সে কারণে এসব হাসপাতালকেও সম্পূর্ণরূপে সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। 

একই কারণে একদিকে যেমন অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাহিদা রাতারাতি অনেক বেড়ে গেছে এবং এখনো বেড়েই চলেছে অন্যদিকে তেমনি অসৎ পন্থায় বেশি মুনাফা লুণ্ঠনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে ব্যবসায়ী নামের টাউট লোকজন এবং তাদের গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেট। পাঁচ-ছয় হাজার টাকা দামের সিলিন্ডার চট্টগ্রামে তারা এমনকি ২৫-৩০ হাজার টাকায়ও বিক্রি করছে। একই অক্সিজেন সিলিন্ডার ঢাকায় কিনতে হচ্ছে ৩৫-৪০ হাজার টাকায়। উত্তরার মতো কোনো কোনো এলাকায় ৪৫ হাজার টাকায়ও সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে। 

বড়কথা, জরুরি প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন সিলিন্ডার বেশি টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। মুহূর্তের মধ্যে লুকিয়ে ফেলছে টাউট ব্যবসায়ীরা। সিলিন্ডারের  অক্সিজেন কমে বা শেষ হয়ে গেলে রিফিল করার সময়ও কয়েকগুণ পর্যন্ত বেশি টাকা লুটে নিচ্ছে বিক্রেতারা। সাধারণ সময়ে রিফিল করার জন্য ১২২ টাকা দিতে হলেও বর্তমানে আদায় করা হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। শুধু টাকা দিলেও ‘অনুগ্রহ’ দেখাচ্ছে না ব্যবসায়ী বা বিক্রেতারা। তাদের হাতে-পায়ে ধরে অনুরোধ পর্যন্ত করতে হচ্ছে। কর্মারীদের অনেককে নগদ অর্থে ঘুষও দিতে হচ্ছে।

সংশয় ও প্রশ্ন রয়েছে অক্সিজেনের মান ও কার্যকারিতা নিয়েও। চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাণিজ্যিক অক্সিজেনে ঘনত্ব থাকে সাধারণত ৬০-৭০ শতাংশ। অন্যদিকে এক দশমিক চার কিউবিক লিটার মেডিক্যাল অক্সিজেনের সিলিন্ডারে ঘনত্ব থাকতে হয় ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশের কাছাকাছি। এ ব্যাপারেও মানুষের জীবন নিয়ে জালিয়াতি করছে ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা। বিপন্ন মানুষের জরুরি চাহিদার সুযোগ নিয়ে তারা মেডিক্যাল অক্সিজেনের পরিবর্তে বাণিজ্যিক অক্সিজেন চালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু দাম ঠিকই আদায় করছে মেডিক্যাল অক্সিজেনের। এর ফলে বহু মানুষেরই জীবন বিপন্ন হচ্ছে। নির্ধারিত মাত্রা ও ঘনত্বের অক্সিজেন না পাওয়ায় অনেকে এমনকি মারাও যাচ্ছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন তিনটি মাত্র মেডিক্যাল গ্রেড পিউরিটির অক্সিজেন প্রস্তুত করার বৈধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান তিনটিই সকল হাসপাতালে সরাসরি অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু করোনার বর্তমান মহামারির সুযোগে অনেক স্থানেই গোপনে অক্সিজেন তৈরি করা এবং সেসব অক্সিজেন বিক্রি ও সরবরাহ করা হচ্ছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, শ্বাসকষ্টে আরাম দেয়ার এবং মৃত্যুর কবল থেকে রক্ষা করার প্রধান উপাদান অক্সিজেন নিয়ে দেশে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। এমন অবস্থা কোনোক্রমেই চলতে দেয়া যায় না। এজন্যই এ ব্যাপারে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলেছেন, টাউট এবং মুনাফাখোর বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সরকারকে অক্সিজেন উৎপাদন ও সরবরাহও এমনভাবে বাড়াতে হবে, বাজারে যাতে যথেষ্ট পরিমাণে ও ন্যায্য মূল্যে অক্সিজেন পাওয়া যায় এবং জনগণকে যাতে ভোগান্তির শিকার না হতে হয়। একজন মানুষও যাতে অক্সিজেনের অভাবে কষ্ট না পায় এবং প্রাণ না হারায়। এ ব্যাপারে জনগণেরও উচিত সচেতন হওয়া এবং চরম স্বার্থপরের মতো বাসাবাড়িতে অক্সিজেনের মজুত না গড়ে তোলা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ