মঙ্গলবার ০৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ইন্তিকাল

স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ইন্তিকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। গতকাল শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর শ্যামলী বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তার স্ত্রী ও তিন ছেলে রয়েছে।
আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় বনানী কবরস্থান এলাকায় জানাযা নামায শেষে বনানী কবরস্থানে মায়ের কবরের পাশে মোহাম্মদ নাসিমকে দাফন করা হবে। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
গত ১ জুন শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন মোহাম্মদ নাসিম। পরে রাতে তার করোনা ভাইরাস পজেটিভ শনাক্ত হয়। করোনা ভাইরাস আক্রান্ত অবস্থায় মোহাম্মদ নাসিম ৫ জুন ভোরে স্ট্রোক করেন। পরে জরুরিভাবে তার অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর চিকিৎসকরা তাকে প্রথমে ৭২ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। পরে পর্যবেক্ষণের সময় আরো ৭২ ঘণ্টা বাড়ানো হয়। এরপরে অবশ্য তার করোনা টেস্ট দুইবারই নেগেটিভ আসে। ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তার চিকিৎসায় একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়।
এদিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমকে দাফন করা হবে এমনটা জানিয়েছেন তার পরিবার ও আওয়ামী লীগ নেতারা। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় জানাযা শেষে মায়ের কবরেই তাকে সমাহিত করা হবে। মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ‘বাবাকে গ্রামের বাড়ি ও তার নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধির কথা চিন্তা করে তা বাতিল করা হয়েছে।’ জয় জানান, শনিবার রাতে বাবার মৃতদেহ বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। তার আরেক ভাই তন্ময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে রাতেই দেশে ফিরবেন।
মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় জানাযায় দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে উপস্থিত না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলেন, আপনারা সবাই যে যার অবস্থান থেকে তার জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেহেতু দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করেছে, তাই দেশের এই পরিস্থিতিতে তার লাশ কোথাও নেয়া হবে না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক জানান, রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় বনানী কবরস্থান মসজিদে নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে জানাযা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
মোহাম্মদ নাসিম ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের মুখপাত্র ছিলেন। আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।
তার পিতা অন্যতম জাতীয় নেতা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মোহাম্মদ নাসিমের মায়ের নাম মোসাম্মৎ আমিনা খাতুন, যিনি আমেনা মনসুর হিসেবেই পরিচিত। তিনি একজন গৃহিণী ছিলেন। পারিবারিক জীবনে নাসিম বিবাহিত এবং তিন সন্তানের জনক। তার স্ত্রীর নাম লায়লা আরজুমান্দ। মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৬, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে তিনি সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৪-১৮ সরকারে নাসিম স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালের সরকারে তিনি স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ১৪ দলীয় মহাজোটের মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আছেন মোহাম্মদ নাসিম। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন।
ছাত্রজীবনের প্রথম দিকে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। পরে অল্প কিছু দিন ছাত্রলীগের রাজনীতিও করেন। ছাত্ররাজনীতি ছাড়ার পরে যুবলীগের রাজনীতি করলেও ১৯৮১ সালের আওয়ামী লীগের সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মোহাম্মদ নাসিম। ওই সম্মেলনে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের যুব সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৮৭ সালের সম্মেলনে তিনি দলের প্রচার সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালের সম্মেলনে মোহাম্মদ নাসিমকে দলের একমাত্র সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ২০০২ ও ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত দলের সম্মেলনে তাকে দলের কার্যনির্বাহী কমিটির এক নম্বর সদস্য পদে রাখা হয়। এরপর ২০১২ সালের সম্মেলনে তাকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর টানা তিন মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন।
মোহাম্মদ নাসিম ভোটের রাজনীতিতে অত্যন্ত সফল। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জ-১ সংসদীয় আসন (কাজীপুর) থেকে পাঁচবার বিজয়ী হয়েছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ১/১১ সরকারের দেওয়া মামলার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেননি নাসিম। ওই নির্বাচনে তার সন্তান তানভীর শাকিল জয়কে মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিমকে আবার মনোনয়ন দেয় আওয়ামী লীগ। সে সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
রাজনৈতিক জীবনে রাজপথে সবসময়ই সক্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ নাসিম। সরকারবিরোধী আন্দোলনের কারণে বিভিন্ন সময় নির্যাতন সইতে হয়েছে তাকে। রোষানলের শিকার হয়েছিলেন ১/১১ সরকারেরও। সে সময় গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাগারে কাটান তিনি। পাশাপাশি এই সময়ে চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন।ফ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ