শনিবার ১৫ আগস্ট ২০২০
Online Edition

প্রস্তাবিত বাজেট : জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় : কোনো লক্ষ্যমাত্রাই অর্জিত হবেনা

আসিফ আরসালান : একটি দেশের সাধারণ মানুষের বাজেটের প্রতি তেমন আগ্রহ থাকেনা। বিশেষ করে আমজনতার। শুধুমাত্র আমজনতাই বা বলবো কেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরাও বাজেট নিয়ে তেমন একটা আগ্রহী বলে অতীতে দেখা যায়নি। এর কারণ হতে পারে যে এটি অর্থনীতির বিষয় এবং বিষয়টি জটিল। তাই দেখা যায় যে শিক্ষিত সচেতন মানুষও বাজেটের খুঁটিনাটি পড়েন না। অর্থমন্ত্রী যখন বাজেট পেশ করেন তখন সেই বাজেট বক্তৃতার সাথে কতিপয় মোটা চিকন বই পেশ করা হয়। এগুলোকে বলে বাজেট ডকুমেন্টস। এই যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার বাজেট পেশ করা হয় তার খুঁটিনাটি এই সব ডকুমেন্টে থাকে।  আরো থাকে অর্থনৈতিক সমীক্ষা। এটি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং গবেষকদের কাছে খুবই প্রয়োজনীয়। তবে সাধারণ মানুষ বাজেটের সময় একটি বিষয়ের প্রতি তীক্ষè নজর রাখেন। সেটি হলো, কোন্ কোন আইটেমের ওপর ট্যাক্স বাড়লো, কোন্ কোন বিষয়ের ওপর ট্যাক্স কমলো। অন্যকথায়, কোন্ কোন আইটেমের দাম বাড়লো, আর কোন্ কোন আইটেমের দাম কমলো। তবে বাংলাদেশের বিগত অর্ধশতাব্দীর ইতিহাসে দেখা যায় যে বাজেটে ট্যাক্স বাড়া কমার সাথে পণ্যসামগ্রীর দাম হ্রাস বৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নাই। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে বাজেটে কোনো কোনো পণ্যের ট্যাক্স কমানো হয়েছে, কিন্তু সেই পণ্যের দাম আর কমেনা। বিগত ৫০ বছরে কোনো আইটেমের দাম একবার বাড়লে সেটি আর কোনোদিন কমেনি, বরং আরো বেড়েছে।  আর জিনিসপত্রের দাম কমার কোনো অবকাশ নাই। বছরের যে কোনো সময় পাইকারী বা খুচরা বাজারে হঠাৎ কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ঐ যে বাড়লো, সেটি আর কমেনা।
তবে এবারের বাজেটের কথা আলাদা। সারা বিশ্ব এবং সেই সাথে করোনাভাইরাসের যে তাণ্ডব, সেটি শুধু মানুষের জীবনের ওপরই আঘাত হানেনি, জীবিকাও তছনছ করে দিয়েছে। সেই পটভূমিতে এসেছে এবারের বাজেট।  তাই এবারের বাজেট নিয়ে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মানুষের মনে আগ্রহ ছিল বেশি। তারা ভেবেছিলেন, এবারের বাজেট হবে করোনাভাইরাসের বাজেট।  কিন্তু ১১ জুন বৃহস্পতিবার মোস্তফা কামাল যে বাজেট দিলেন, সেটিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) সহ অনেক অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এবং অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি‘গতানুগতিক বাজেট’ বলেছেন। তাদের মতে এটিকে আর যাই বলা হোক না কেন, কোনো অবস্থাতেই করোনা মোকাবেলার বাজেট বলা যাবেনা।
করোনা তান্ডবের ফলে বাংলাদেশ সহ সারা বিশ্বে যে অর্থনৈতিক মহামন্দার সৃষ্টি হয়েছে সেটি কাটিয়ে ওঠার একটি পথনির্দেশ পাওয়া যাবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেছিলাম। তাই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা শুনলাম এবং পরদিন পত্র পত্রিকাগুলোয় প্রকাশিত বাজেট সম্পর্কিত বিশ্লেষণ সমূহ পড়লাম।
দেশের সব শ্রেণীর মানুষই ভাবছিলেন যে এবারের বাজেট উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন সরকারের প্রধান বিষয় হবেনা, বরং বিশ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকার কত ধরনের ইনসেন্টিং প্যাকেজ দিচ্ছেন এবং সেই সাথে আর কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন, সে গুলো হাইলাইট করা হবে। মানুষের ধারণা ছিলো,  মানুষের জীবন রক্ষা ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠির আর্থিক দুর্দশা লাঘব হবে এবছরের বাজেটের সেন্ট্রাল ফোকাস। একটি বিষয় ইতোমধ্যেই সকলের নিকট প্রতিভাত হয়েছে যে করোনার বিগত কয়েক মাসের তাণ্ডবে দারিদ্র্যসীমা আর আগের পর্যায়ে নাই। সেখানে যুক্ত হয়েছেন ২৩ শতাংশ নতুন দরিদ্র। সরকার বলেন যে তারা দারিদ্র্যসীমা ২০ শতাংশ কমিয়েছেন। কিন্তু বেসরকারি খাতের অর্থনীতি খাতের অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সমূহ বলেন যে দারিদ্র্যসীমা ২০ শতাংশ নয়, ২৪ শতাংশ নেমে এসেছিলেন। এখন আরও ২৩ শতাংশ মানুষ নতুন দরিদ্র যুক্ত হওয়ায় হতদরিদ্রের অংশ দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশ। এখানে যেমন রয়েছেন দিনমজুর, তেমনি রয়েছেন ইনফরমাল সেক্টরের কর্মীবৃন্দ। বেসরকারি খাতের কেরানী  পিওনও এখন হত দরিদ্রের কাতারে এসেছেন। এদের সিংহভাগই বিগত ৩ মাসের বেতন পাননি।  আর যারা পেয়েছেন তারা অর্ধেক বেতন, না হয় ৪০ শতাংশ বেতন পের্য়েছেন। রিকশা চালক , সিএনজি চালক, প্রাইভেট বাস, ট্রাক ও হাফ ট্রাকের চালক ও কন্ডাক্টর, ইলেক্ট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, রং মিস্ত্রি থেকে শুরু করে সব ধরনের কর্মী যারা ছিন্নমূলের পর্যায়ে পড়েন না, তারাও বেকারের পর্যায়ে পড়েছেন। এরা সকলে মিলেই ঐ ৪৭ শতাংশের অংশ। অনেক অর্থনীতিবিদ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাব করেছেন যে ঐসব হত দরিদ্র  এবং নতুন দরিদ্রের  সংখ্যা হবে ৬ কোটি। এই ৬ কোটি মানুষের কষ্ট লাঘব এবং তাদেরকে অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করাই হবে বাজেটের সেন্ট্রাল থিম বা মূল সূর। কিন্তু এমন অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে প্রস্তাবিত বাজেটে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
বলা হচ্ছে যে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এই বৃদ্ধিও একটি আইওয়াশ। কারণ বৃদ্ধির ২৪.৩৭ শতাংশই খরচ হবে অনুন্নয়ন খাতে। স্বাস্থ্যখাতে এবারেও যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটি এখনও জিডিপির ১ শতাংশের নিচে।  কিন্তু সিপিডির তথ্য মোতাবেক, বাংলাদেশের মত অন্ততঃ ৩০ টি উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির ১ শতাংশের বেশি।
॥ তিন ॥
স্বাস্থ্যখাতে এমন অবহেলার কারণ বোধগম্য নয়। মনে হচ্ছে, করোনার অবসান সম্পর্কে সরকার ভ্রান্ত ধারণায় আছেন। করোনার প্রাদুর্ভাব শোনা গিয়েছিলো হঠাৎ করেই। সরকার সম্ভবতঃ মনে করছেন যে করোনা এসেছে যেমন হঠাৎ করে তেমনি যাবেও হঠাৎ করে। আর তখন থেকে সরকার ঘুরে দাঁড়াবে, অর্থনীতির চাকা বেগবান হবে এবং ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। এটা কিভাবে সম্ভব? চলতি বছরও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার একই ধরা হয়েছিলো।  সরকার অর্থনীতিকে স্বাভাবিক নিয়মে পরিচালনা করতে পেরেছিলেন ২৫মার্চ পর্যন্ত।  তার মানে হলো এই যে সরকার চলতি অর্থ বছরের ৮ মাস ২৫ দিন, বা প্রায় ৯ মাস পর্যন্ত স্বাভাবিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে। সাধারণ ছুটি (যেটিকে অনেকে বলেন লকডাউন) ঘোষণা করে ২৬ মার্চ। আবার ১ জুন থেকে সব খুলে দেওয়া হয়েছে। তাহলে অঙ্কের হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে সরকার বস্তুত ১০ মাস সময় পেয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার। তারপরেও ৮.২ শতাংশের স্থলে মাত্র ৩.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলো কেন? এই ৩.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয় নাই বলে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বলছে। আইএমএফের পূর্বাভাস ৩.৮ শতাংশ।  বিশ্ব ব্যাংকের পূর্বাভাস ১.৬ শতাংশ। লন্ডনের বিখ্যাত ম্যাগাজিন, ‘ দি ইকোনোমিস্টও’ একই রকম আভাস দিয়েছিলো।  এদিকে দেশের অভ্যন্তরে সিপিডি বলেছে যে এটি হবে ২.৫ ভাগ।  কিন্তু অর্থমন্ত্রী তারপরেও তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.২ শতাংশ অর্জিত হবে।
আগামী ৩০ তারিখ অর্থাৎ ৩০ জুন চলতি অর্থবছর শেষ হবে। তারপর কিন্তু অর্থমন্ত্রী তথা সরকারকে বলতেই হবে যে প্রকৃতপক্ষে কত শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।  আর সেটি শুধু বললেই  হবে না, অর্থনীতিরর বিভিন্ন সূচক এবং সেক্টর ওয়াইজ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে তাদেরকে সেটি জাস্টিফাই করতে হবে।
॥ চার ॥
চলতি বাজেটের (২০১৯/২০) আকার ধরা হয়েছিলো ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ৬০০  কোটি টাকা। সেখানে ঘাটতি ধরা হয়েছিলো ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এই দুটি লক্ষ্যের কোনোটিই অর্জিত হয়নি। সেখানে আগামী বা প্রস্তাবিত বাজেটের আকার এবং ঘাটতি উভয়ই আরো বড় ধরা হয়েছে কোন যুক্তিতে? প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার ৯০ কোটি টাকা। ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতির অর্থায়ন হবে কোত্থেকে? গতবছর ঘাটতির অর্থায়ন ধরা হয়েছিলো নিম্নোক্ত সূত্র সমূহ থেকে। রাজস্ব আয় ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, ব্যাংক ঋণ ৪৭ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, নিট বিদেশি ঋণ ৬৪ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ঋৃণ ২৭ হাজার কোটি টাকা প্রভৃতি। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এর কয়েকটি খাতই ঊর্ধ্বমুখী। যথা, রাজস্ব আয় ৩ লক্ষ ৭৮ হাজার ৮৯  কোটি টাকা, ব্যাংক ঋণ ৮৪ হাজার ৪ কোটি টাকা।
চলতি বছর জিডিপির আকারের টার্গেট ধরা হয়েছিলো ২৮ লক্ষ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে সেটি বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩১ লক্ষ ৭১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।  অর্থাৎ বাজেটের আকার বাড়বে ২ লক্ষ ৮৫ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা।  পাঠকদের নিকট বিষয়টি পরিস্কার করে বলতে চাই যে ২ লক্ষ ৮৫ হাজার কোটি টাকা আকার বৃদ্ধি হলো জিডিপির ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি।
চলতি বাজেটের কোনো লক্ষ্যই অর্জিত হয় নাই। না জিডিপি প্রবৃদ্ধি, না রাজস্ব আদায়। ব্যাংক ঋণের টার্গেটও দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
 আমাদের কাছে সবগুলো পরিসংখ্যান আছে। পরিসংখ্যান দিয়ে পাঠকদের আর ভারাক্রান্ত করতে চাই না। তবে এক কথায় শেষ করতে চাই যে এই বাজেট কল্পনা প্রসূত, কাগজে কলমে পরিসংখ্যান নির্ভর নয়। বাস্তবায়নযোগ্য নয়।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ