বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজা-রাণীরা যা চান তাইতো হয়

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : রাজা-বাদশাহরা অসীম ক্ষমতাবান। তাঁরা যা ইচ্ছে করেন তাই ঘটতে বাধ্য রাজ্যে। রাজ্য বা দেশের মালিক তাঁরা। আগের যুগে পিতা রাজা-বাদশাহ হলে পুত্রও তাই হন। অনেক সময় রাজপুত্র বা শাহজাদারা ক্ষমতাসীন পিতাকে হত্যা কিংবা কারারুদ্ধ করেও পিতার সিংহাসন দখল করে নিতেন। যেসব দেশে রাজপ্রথা বা কিংশিপ চালু আছে সেসব দেশে এমন ঘটনা এখনও ঘটে। রাজা-বাদশাহরা যা বলেন, যা ইচ্ছে করেন তা অবলীলায় ঘটে। কারুর কিচ্ছু বলবার এবং করবার থাকে না।
পৃথিবীর দুয়েকটা দেশে এখন ভোট লাগে না বললেই চলে। ভোটের আগের রাতে অলৌকিকভাবে ভোট সম্পন্ন হয়ে যায়। নাটক চলে সারাদিন। চলে নানা আনুষ্ঠানিকতাও। পিকনিক টাইপের খানাপিনা হয়। কে নির্বাচিত হবেন আর কে হবেন না, তা আগেভাগেই ঠিক করা হয়। শুধু ঘোষণা দেয়া বাকি থাকে। আজকাল রাজা-বাদশাহরা এভাবেই ক্ষমতাসীন হচ্ছেন। কাজেই তাঁদের ক্ষমতা অসীম। তাঁরা এখন যা করেন তাই আইন। অর্থাৎ রাজা-বাদশাহরা নিরঙ্কুশ। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বলতে পারেন। তাঁদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কথা বলবার বা করবার কিচ্ছু নেই প্রজাসাধারণের।
গতবছর ৭ সেপ্টেম্বর শীর্ষখবর ডটকম একটি রিপোর্ট করেছিল। সেটির কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজের একজন ‘বেগম অধ্যাপক’। আট বছর যাবৎ কলেজে কোনও ক্লাস নেননি তিনি। তবে এতে থেমে নেই তাঁর বেতন-ভাতা উত্তোলন। ক্লাস নেয়াসহ একাডেমিক কোনও কাজে অংশগ্রহণ না থাকলেও নিয়ম বহির্ভূতভাবে কলেজ থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলনসহ ভোগ করেন সকল সুযোগ-সুবিধা। এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হলেও ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না। কারণ তিনি ওই অঞ্চলের এক রাজা বা বাদশাহর বেগম। হ্যাঁ, বাদশাহর বেগম থাকবেন এটাইতো স্বাভাবিক। তবে তিনি স্বেচ্ছাচারিতা চালাবেন তা কারুর কাম্য নাও হতে পারে। বলতে দ্বিধা নেই, আলোচ্য বেগমের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ এলাকার সচেতন মহল।
অনেকেই বলছেন, আলোচ্য বেগমের কাছ থেকে এমন নীতিবহির্ভূত কাজ কাম্য নয়। কলেজে হাজির না হয়ে, ক্লাস না নিয়েই তিনি বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন, তা কতটা নৈতিক?
নাম প্রকাশ না করবার শর্তে রাজশাহী বরেন্দ্র কলেজের এক শিক্ষক জানান, দীর্ঘ আট বছর যাবৎ কোনও ক্লাস নেন না তিনি। ক্লাস নেবার জন্য তিনি মিমি নামের একজন প্রক্সি ঠিক করে রেখেছেন। তাঁর ক্লাসগুলো নেন মিমি। বিনিময়ে প্রক্সি মিমিকে মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দেয়া হয়। বাদশাহ মানে রাজার রাণী বা বেগম হবার সুবাদে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভয়ে মুখ খোলে না। দাপট দেখিয়ে বছরের পর বছর এভাবেই বেতন-ভাতা উত্তোলন করে আসছেন বেগম অধ্যাপক। এছাড়াও বেশ কিছুদিন আগে এ বেগমের বিরুদ্ধে নিয়োগবাণিজ্যের গুঞ্জন উঠেছিল।
কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘বেগম পরিচয়ে আমাদের একজন ম্যাডাম আছেন বলে জানি। তাঁকে আমরা কখনও ক্লাস নিতে দেখিনি।’
নাম প্রকাশ না করে রাজশাহীর একজন প্রবীণ কলেজশিক্ষক বলেন, কোনও শিক্ষক ছুটিতে গেলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর ক্লাস নেবার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারেন। তবে তাঁকে নিবন্ধিত শিক্ষক হতে হয়। কিন্তু নিজে অনুপস্থিত থেকে একজন অনিবন্ধিত শিক্ষক দিয়ে ক্লাস নেয়ানো নিয়মবহির্ভূত। তিনি আরও বলেন, কলেজে হাজির না হয়ে বেতন-ভাতা উত্তোলন অবৈধ। আলোচ্য বেগম অধ্যাপক যদি সেটি করে থাকেন তবে তাঁর বিরুদ্ধেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ নিয়ে কোনও ব্যবস্থা না নেয়া হলে এ সুযোগ আরও অনেকেই নেবার চেষ্টা করবেন। এতে শিক্ষাব্যবস্থা কলুষিত হবে বলেও মনে করেন ওই প্রবীণ শিক্ষক।
এ ব্যাপারে জানতে মোবাইলে বেগম অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করবার চেষ্টা করে তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে শীর্ষনিউজ জানিয়েছিল। তবে কলেজের অধ্যক্ষ আলমগীর মুহাম্মদ আব্দুল মালেক বলেন, ‘বেগম অধ্যাপক নিয়মিত কলেজে আসতে পারেন না। সে কারণে একজনকে ঠিক করে দিয়েছেন তাঁর ক্লাস নেবার জন্য। মাঝেমধ্যে তিনি কলেজে আসলে নিজে ক্লাস নেন। তিনি ঢাকায় ব্যস্ত আছেন।’ এর বেশি আর কিছু বলতে চাননি অধ্যক্ষ সাহেব।
বেচারা অধ্যক্ষ আর কী বলবেন এবং করবেন? বেগমদের রাজা-বাদশাহ থাকলে তাঁদের টিকি ধরে কে? তাঁদের যারা প্রজা কিংবা চাকরবাকর তাদেরতো কোনও ক্ষমতা থাকবার প্রশ্নই ওঠে না। রাজা-বাদশাহরা যা চাইবেন এবং করবেন তাইতো রাজ্যে ঘটবে। এর ব্যতিক্রম করে কার সাধ্য?
তাঁরাতো সীমাহীন ক্ষমতার মালিক। তাঁরা যা বলেন তাই করতে এবং মানতে হয় প্রজাসাধারণকে। অন্যথা হবার উপায় নেই। ডিসি, ইউএনও, প্রিন্সিপাল সকলকে রাজা-বাদশাহ এবং শাহজাদারা দাসানুদাস মনে করেন। যা হুকুম হয় তাই তামিল করতে হয় সকলকে। কাজেই বেগম অধ্যাপক কলেজে পড়ান কিংবা না পড়ান তাতে কিচ্ছু যায় না। আসেও না। বেতনভাতা যথানিয়মে একাউন্টে জমা হয়ে যায়। দিন, মাস, বছর বলে কোনও কথা নয়। দীর্ঘ ৮ বছর ধরে ক্লাস না নিলেও বেগম অধ্যাপকের কোনও সমস্যা হয়নি বেতনভাতা তুলতে। রাজা যেহেতু সিংহাসনে, অতএব রাণীর চিন্তা কী?
বেগম অধ্যাপকের ক্লাস না নেয়াতে ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছে, পড়ালেখায় ওরা পিছিয়ে পড়ছেন, নিয়মিত ক্লাস না হওয়াতে পরীক্ষায় তাঁরা হয়তো খারাপও করছেন। সেদিকে খেয়াল নেই। ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকলে একজন কলেজটিচার বছরের পর বছর কীভাবে ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে পারেন তা আমাদের জানা নেই। তাও আবার ফুল বেতন-ভাতা দীর্ঘ ৮ বছর যাবত তুলে নিয়ে দিব্যি ঘরে বসে আছেন বা অন্যকোনও বিজনেস নিয়ে বিজি থাকছেন! যেজন্য তাঁকে মাইনে দেয়া হয় সেব্যাপারে তাঁর কোনও হদিস নেই। এ হচ্ছে একজন কলেজটিচারের কর্তব্যবোধ।
ক্লাস না নিয়ে যথারীতি বেতনভাতা নেয়া কয়েক রকমের অপরাধ। এক. শিক্ষার্থীদের শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত ও তাঁদের অধিকার নষ্ট করা। দুই. জনগণের অর্থের অপচয় করা। তিন. শিক্ষকের দায়িত্ব, মর্যাদা ও নীতিনৈতিকতা জলাঞ্জলি দেয়া। এতে শিক্ষকের নীতিহীনতা এবং ফাঁকিবাজি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা শিক্ষকদের এমন দায়িত্বহীনতা প্রত্যক্ষ করেন এবং ভবিষ্যত কর্মজীবনে নিজেরাও দায়িত্বহীন শিক্ষকের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে আগ্রহী হতে পারেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সমগ্র জাতির ওপর। তাই কোনও শিক্ষকের ক্লাস না নিয়ে বছরের পর বছর বেতনভাতা নেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ বৈকি। এখন কী অবস্থা তা অবশ্য জানা যায়নি।
তবে আলোচ্য কলেজের সহকারী বেগম অধ্যাপক একাই দাপুটে ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন এমন নয়। সারাদেশে আরও অনেক যেমন বাদশাহ আছেন, তেমন অনেক বেগমও আছেন। এসব রাজা-বাদশাহ এবং রাণী-বেগমের প্রতাপ অনেক। তাঁদের বিরুদ্ধে কারুর কিছু বলবার বা করবার ক্ষমতা তেমন থাকে না। তাঁরা যা চান, তাই হয়। যেভাবে চলতে বলেন, সেভাবেই সবাইকে চলতে হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে কিছু বলা মানে ধৃষ্টতা প্রদর্শন। এতে কোনও মহৎ কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হোক আর না হোক। বাদশাহ-বেগমদের বিরুদ্ধে কথা বললে বা পদক্ষেপ নিতে গেলেই নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। হতে পারে হিতে বিপরীতও। তাই বাদশাহ-বেগমরা যেভাবে চলতে চান সেভাবেই চলতে দিতে হয়। যেভাবে চালাতে চান সেভাবেই চলতে হয় সংশ্লিষ্ট সকলকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ