শনিবার ০৮ আগস্ট ২০২০
Online Edition

এক বছর চাকরি করেও কর্মহীন হচ্ছেন খুলনার ২১১ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী

 

খুলনা অফিস : এক বছর চাকরি করেও কর্মহীন হচ্ছেন খুলনার সিভিল সার্জন দপ্তরের আওতাধীন বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২১১ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী। অথচ এরাই করোনা পরিস্থিতিতে সম্মুখযোদ্ধার ভূমিকা পালন করেছেন। আবার এই এক বছর চাকরি করলেও এখনও বেতন পাননি কেউ। যদিও চাকরিতে প্রবেশের আগে পোড়াতে হয়েছে অনেক কাঠ-খড়। কয়েক খাতে খরচ করতে হয়েছে মোটা অংকের অর্থ। তাদের চাকরিতে যোগদানের কয়েক মাসের মাথায় পরিবর্তন হয় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ খুলনার সিভিল সার্জন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বিগত এক বছর ধরে চেষ্টা করে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে লোক নিয়োগের অনুমোদনও এনেছেন। 

আগামী তিন বছরের জন্য অনুমোদন আনা হলেও এখন নতুন করে তাকে অংশ নিতে হবে টেন্ডারে। আবার বর্তমান সিভিল সার্জন আউটসোর্সিং কর্মচারীদের ডেকে ইতোমধ্যেই এলান দিয়েছেন যে, জুন মাসের পর তাদের কারও চাকরি থাকবে না। তাতে তারা বেতন পাক আর না পাক। পক্ষান্তরে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের বিগত এক বছরের বেতন না দিয়ে তাদের কার্যাদেশ বৃদ্ধির তদবিরে ব্যস্ত রয়েছেন। এতে এক বছর বেতনবিহীন চাকরি করা ২১১ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী এখন দিশেহারা।

এদিকে, সিভিল সার্জন ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা চললেও আগামী মাস থেকে যদি এই ২১১ জন কর্মচারী চাকরিচ্যুত হন তাহলে খুলনার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের ধাক্কা পড়বে বলে আশংকা করা হচ্ছে। বিগত এক বছর ধরে বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করে অন্তত যে অভিজ্ঞতা অর্জন করা হয়েছে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হলে নতুন করে লোক নিয়োগ করতে গিয়ে হয়ত কয়েক মাস জনবলবিহীন কাজ করতে হবে সিভিল সার্জনের দপ্তরকে। তাছাড়া নতুন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পর নতুন করে লোক নিয়োগ করা হলে সবকিছু নতুন করেই সাজাতে হবে। সেটিও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর একটি জটিলতার কারণ হবে বলেও অভিজ্ঞমহল মনে করছেন। সেই সাথে যেসব গরীব মানুষগুলো বিভিন্ন লোককে ম্যানেজ করে চাকরিতে প্রবেশ করেছেন তারাও চাকরিহারা হয়ে অন্যরকম এক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে খুলনার বর্তমান সিভিল সার্জন ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, যেহেতু আগের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভুল ছিল সেহেতু নতুন করে ঠিকাদার নিয়োগ করে নতুনভাবে লোক নিয়োগ না করা হলে আবারও বেতন বঞ্চিত হতে পারে এসব কর্মচারী। তাছাড়া মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনাই আছে যে, প্রতি বছর টেন্ডার আহবান করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে লোক নিয়োগ করতে হবে।

পক্ষান্তরে আউটসোর্সিং কর্মচারী সরবরহাকারী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স তাকবীর এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইকতিয়ার উদ্দিন বলেন, যেহেতু মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তিন বছরের জন্য লোক নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেহেতু বর্তমান প্রশাসন ইচ্ছা করলে তাদের প্রতিষ্ঠানকেই আরও এক বছরের জন্য বর্ধিত করতে পারেন। তাছাড়া বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে নতুন করে টেন্ডার আহবান করতে গেলে মাঝপথে স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়ই একটি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগ হলে বর্তমান জনবলকে তারা নাও নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন স্বাস্থ্যকর্মীদের দিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে গেলে অনভিজ্ঞতারও জন্ম নিতে পারে। 

এজন্যই খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রসহ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ইতোমধ্যে সুপারিশও করেছেন যাতে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি না করে পুরাতন ঠিকাদারের কার্যাদেশ বর্ধিত করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা চলমান রাখা হয়। কিন্তু সেটি মানতে নারাজ বর্তমান সিভিল সার্জন।

এ ব্যাপারে বিগত এক বছর আগে নিয়োগ পাওয়া আউটসোর্সিং কর্মচারীরা বলেন, এক বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করে যখন তারা বেতন পেতে যাচ্ছেন তখনই তাদেরকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। যেটি অত্যন্ত অমানবিক। এমনটি করা হলে তাদেরকে রাস্তায় বসা ছাড়া বিকল্প কোন পথ খোলা থাকবে না। অনেকে জমি-সম্পদ বিক্রি করে, সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করে এক বছর ধরে মানবেতন জীবন চালিয়েছেন। এখন নতুন করে তারা চাকরিহারা হলে তাদের আর যাওয়ার কোন জায়গা থাকবে না। এজন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। উল্লেখ্য, গত বছর (২০১৯) মে মাসে এক সাথে খুলনা জেনারেল হাসপাতাল ও জেলার নয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ৩০টি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে ২১১ জন আউটসোর্সিং কর্মচারীকে কাজের অনুমতিসহ পদায়ন করা হয়। 

খুলনার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. এএসএম আব্দুর রাজ্জাক মেসার্স তাকবীর এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে এ সংক্রান্ত পত্রও দেন। ওই পদায়নের ভিত্তিতে জুন মাস থেকেই কাজ শুরু করেন ২১১ জন কর্মচারী। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বেতন হয়নি। বিগত এক বছর ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে তদবির করে তিন বছরের জন্য অনুমোদন আনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি। নিয়োগের কয়েক মাস পরই তৎকালীন সিভিল সার্জন অবসরে গেলে বর্তমান সিভিল সার্জন যোগদান করেন। তিনিও যোগাদানের পর এসব কর্মচারীদের বেতন অনুমোদনের জন্য চেষ্টা করেন। কথা বলেন বিভিন্ন দপ্তরে। শেষ পর্যন্ত উভয়ের চেষ্টায়ই হয় প্রশাসনিক অনুমোদন। কিন্তু অনুমোদনের পরই নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। চলতি অর্থ বছর শেষ হচ্ছে আর কয়েকদিন পরই। আগামী অর্থ বছরের শুরুতেই নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করা হবে এমন প্রশ্নে অটল বর্তমান সিভিল সার্জন। এতে বেতনবঞ্চিত ওই ২১১ জন কর্মচারীর চাকরিহারা হবার আশংকা দেখা দিয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ