সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

করোনা মহামারিতে পল্লী চিকিৎসকদের ভূমিকা

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন : পল্লীর এই শ্যামল প্রকৃতিতে খেটে খাওয়া মানুষের দেহে কত রোগ বাসা বাঁধছে তার সঠিক হিসেব কারো জানা নেই। তবে তাঁদের সেবা দিতে হবে। এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। হ্যাঁ, আজ আমাদের পল্লী চিকিৎসকের কথা বলবো, যাঁরা সপরিবারে গ্রামের মানুষের সাথে মিশে থাকে। যাঁর দ্বার (দরজা) খেটে খাওয়া মানুষের জন্য সদা উন্মুক্ত থাকে এবং দুঃসময়ে এই খেটে খাওয়া মানুষের বাড়ি ছুটে চলে যায়, তিনিই গ্রামীণ জনপদের পল্লী ডাক্তার। গ্রাম বাংলার ৬৮ হাজার গ্রামে হাজার হাজার পল্লী চিকিৎসক রয়েছেন। আমি তাঁদেরকে মানবিক ডাক্তার বলি। আমার গ্রামের কথাই উল্লেখ করতে চাই। যোগেন্দ্র ডাক্তার, গোপাল ডাক্তার, লল ডাক্তার, হাশিমপুরে কম্পাউন্ডার, কাজী আবদুর রহিম সাহেব, বাসু ডাক্তার, নুর মোহাম্মদ ডাক্তার, জাহাঙ্গীর ডাক্তার, আদিত্য ডাক্তারসহ নাম না জানা গ্রাম বাংলায় অসংখ্য পল্লী চিকিৎসক রয়েছেন, যাঁরা আমার দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর চিকিৎসক। রাত দিন নেই, মানুষের সেবায় তাঁরা নিয়োজিত। এমএএমএফ/এমআরপি সনদ নিয়ে তাঁরা চিকিৎসা দেন। গ্রামীণ সমাজে তাঁদের কদর ও সম্মান আজোও বিদ্যমান। কারণ তাঁরা মানবিক ও বিবেকজাগ্রত মানুষ। অল্প টাকায় সন্তুষ্ট হয়ে ভালো চিকিৎসা দেন। আমরা সেই সব মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। গ্রামের মানুষ গ্রামীণ জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির প্রথম কারণ এই পল্লী চিকিৎসকের ফল। আজ কেন তাঁদের কথা বলছি? কারণ কি?  কারণ, আজ সারা বিশ্বে করোনার কারণে মানুষ মরছে লাখে লাখে। পৃথিবী থেমে আছে! করোনার চিকিৎসা আজো আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। মানুষ বাঁচার জন্য সমগ্র বিশ্বের চিকিৎসকসমাজ প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছেন। গবেষণা চলছে। হয়তো মহান আল্লাহ বিজ্ঞানীদের মেধার মাধ্যমে এই ওষুধ আবিষ্কারে সহায় হবেন। সফলতা আসবেই। কথা হলো আমাদের চিকিৎসক কি করছেন? মাননীয় ডাক্তারগণ, আমাদের দেশে বিশ্বের নামীদামী চিকিৎসকের বিপরীত অবস্থানে আছেন! আমাদের দেশে ডাক্তারের সামনেই অবহেলায়/ চিকিৎসা না পেয়ে রোগী মারা যাচ্ছেন। বেসরকারী হাসপাতালে করোনার অজুহাতে রোগী ভর্তি করাচ্ছে না। কী অমানবিক! সরকারের আদেশ মানা হচ্ছে না কোথাও। 

প্রতিদিন সংবাদে দেখা যাচ্ছে কত রোগী বিনা-চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন, অথচ ডাক্তাররা কিছুই করছেন না। তবে সব ডাক্তার যে চিকিৎসা দিচ্ছেন না তা নয়। সরকারি হাসপাতাল ও  কলেজে আমাদের দেশে ডাক্তারি পড়তে কত খরচ হয় জানেন? অবশ্যই জানার কথাও নয়! তবে বেসরকারি প্রাইভেট হাসপাতালে ডাক্তারি পড়তে কোটি টাকা খরচ হয়। তারপরেই ডাক্তার। আমাদের রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকা খরচ করে যাঁদেরকে চিকিৎসক     বানিয়েছেন দেশ এবং দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য, তাঁরা আজ দেশের মানুষের বিপর্যস্ত অবস্থায় কোথায় রয়েছেন? মানবিক বিবেকবোধ কোথায়? চিকিৎসক হওয়ার পরে তাঁদের শপথবাক্য আজ তাঁরা কি মনে রেখেছেন? প্রাইভেট হসপিটালগুলো আজ বিপদগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে নাটকের অভিনয় করছে। 

এই অভিনয়ের শেষ কোথায়? পল্লী চিকিৎসক প্রসঙ্গে কথা। যাঁরা গ্রামীণ মানুষকে এই মহৎ সেবা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসছেন তাঁদেরকে আমরা গ্রামীণ ডাক্তার বলে ডাকি বা চিনি। তাঁদেরকে ডাক্তার ডাকলে শিক্ষিত ডাক্তারদের গায়ে লাগে! ওদের ডাক্তার বলা যাবে না। ডাক্তার শুধু তাঁরাই? তাঁরা একত্রিত হয়ে এই বিষয় নিয়ে সংসদে বিল উঠালেন। বিলটি পাসও হলো। গ্রামীণ জনপদের লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ ডাক্তার আইনের কারণে আর ডাক্তার নন। অনেকে দোকানের সাইনবোর্ড থেকে ডাক্তার পদবি কেটে দিলেন। বড় বড় শিক্ষিত ডাক্তারগণ খুশি। করোনা বিশ্বে সেই পল্লী ডাক্তার/চিকিৎসকগণ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে নিজেদের পবিত্র দায়িত্ব পালন করে মানুষের কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন। 

অথচ সরকার কোটি টাকা খরচ করে যাঁদেরকে চিকিৎসাবিজ্ঞানী বানিয়েছেন তাঁরা মানুষ থেকে অনেক দূরে। এই বিপদে পাশে নেই। গ্রামীণ চিকিৎসকদের ভূমিকা আমি শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। একই সাথে দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আকুল আবেদন করছি, গ্রামীণ জনপদের গ্রামীণ ডাক্তারদের ডাক্তার বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। একজন মানুষকে সামাজিক মর্যাদায় বেঁচে থাকার জন্য গ্রামীণ ডাক্তার বা গ্রামীণ চিকিৎসক বললে এমন কী ক্ষতি হতে পারে?  যাঁরা বড় বড় ডাক্তার সরকারের কোটি টাকা খরচে ডাক্তার হয়েছেন, তাঁরা তো মানুষের পাশে নেই। 

আর প্রান্তিক জনপদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ছোটখাটো মানুষগুলো এই চিকিৎসাবিদ্যা শিখে মানুষকে সাধারণ প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাঁদেরকে গ্রামীণ ডাক্তার বা পল্লী চিকিৎসক অথবা ডাক্তার বললে আমাদের এমন কী ক্ষতি হয়? মানুষের অন্তরে তাঁরা যে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসন গেড়ে বসেছেন তা কি আইনের মারপ্যাঁচে দূর করতে পারবে? তাঁরা তো মানুষকে চিকিৎসার নামে লক্ষ কোটি টাকা খরচ করান না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে মানুষকে হয়রানি করায় না। তাহলে সেই সমস্ত সহজ-সরল পল্লী প্রান্তরের মানুষগুলোর এই চিকিৎসকের প্রতি এত অমর্যাদা কেন? গ্রামীণ চিকিৎসক ডাক্তার বেঁচে না থাকলে এত বড় বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামের মানুষগুলো বাঁচিয়ে রাখা কিংবা বিপদের সময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানো কি সম্ভব? মানুষ বেঁচে থাকলেই তো দেশ, আমার দেশ আছে বলেই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তৈরিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান স্মরণীয় বরণীয়। 

আপনি তাঁর যোগ্য উত্তরাধিকারী, আপনার কাছে আমার এই খোলা চিঠি, আপনি দয়া করে অনুগ্রহবশত গ্রামীণ চিকিৎসকদের মূল্যায়ন করুন। তাঁদেরকে গ্রামীণ ডাক্তার বলার সুযোগ দিন। তাঁরা ডাক্তার বললে উৎসাহ বোধ করে, তাঁদের উদ্যম বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখবে। তাঁরা রাজনীতির নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করবে না। হাসপাতলে তাঁদের কোনো চাকরি নেই। তবু তাঁরা মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেন। এই জন্য তাঁদের কাছে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। আসুন আমরা গ্রামীণ জনপদের সেই ডাক্তারদের মূল্যায়ন করি। তাঁদের সর্মথন দিয়ে মানবিক কাজে আরো উৎসাহ দিয়ে দেশ ও মানুষ বাঁচাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ