বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মেয়েটি সামনে এসে বলল খালু আমি হালিমা

 

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : দেশে করোনাকালের ছুটি ততো দিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল। তারও তিন মাস আগে গত বছর ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। চীন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) বিষয়টি অবহিত করে এবং আশঙ্কা ব্যক্ত করে যে, এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে পারে। চীন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরো শহর লকডাউন করে দেয়। সবকিছু বন্ধ। সকল যানবাহন, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ- সব। অর্থাৎ গোটা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে উহানকে। শুরুতে এই ভাইরাসকে গুরুত্বসহকারে নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। অব্যাহত থাকে চীনের সঙ্গে বিমান যোগাযোগ। চীনে যখন লকডাউন চলছিল, ইউরোপের কোনো কোনো দেশের সরকার তখন ছুটি ঘোষণা করে। আর ছুটি পেয়ে তারা বিনোদনে মাতোয়ারা হয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে  পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা বিশ্ব। তারপরও বিদেশ থেকে করোনা ভাইরাস নিয়ে শ’ শ’ প্রবাসী শ্রমিক বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করে। তাদের যথাযথভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখতে পারেনি সরকার। বাংলাদেশেও দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে করোনার। 

তারপর বাংলাদেশেও সে স্লোগানের বিস্তৃতি লাভ করে ‘মুখোশ (মাস্ক) পরুন, দূরে থাকুন’। আর ঘর থেকে কেউ বের হবেন না। ঘর থেকে বের হলেই করোনার ভয়। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা বিশ্বেই একই আওয়াজ উঠল। এ ছাড়া ভিন্ন কোনো উপায়ও ছিল না। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে হয় কোভিড-১৯ রোগ। এ রোগীর হাঁচি-কাশি আর স্পর্শের মাধ্যমে এ রোগ একজন থেকে আর একজনে সংক্রমিত হয়। মানুষ কথা বললে, হাঁচি-কাশি দিলে অতি সূক্ষ্ম পানির কণা বের হয়। সেটা অন্য কারও নাক-মুখ-চোখ দিয়ে অপরকে সংক্রমিত করে। আর এই কোভিড জীবাণু স্পর্শের মাধ্যমে অন্যের শরীরে যায়। তারপর মুখ-নাক-চোখের মাধ্যমে অপর ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা  সংক্রমিত হয়। আর সেই কারণে সবার আগে বলা হলো, বিশ সেকেন্ড ধরে বার বার হাত ধোন। মুখে পরুন মাস্ক। আর একজন থেকে আর একজন কমপক্ষে ৩ ফুট দূরে থাকুন। যাতে কথা বলার সময় অন্যের মুখের রোগবাহী সূক্ষ্ম কলকণা আর একজনের দেহে প্রবেশ না করে। ব্যস, সর্বশ্রেণির সকল পেশার মানুষের মুখে উঠকে লাগল মুখোশ। এই মুখোশে কেউ কেউ চেনাই থাকল, কেউ কেউ অচেনা হয়ে গেল।

যতদিন যেতে থাকল, আমরা কোভিড-১৯ সম্পর্কে অনেক কথা জানতে শুরু করলাম। বয়স ৬০-এর উপরে হলে ভয়, হৃদরোগ থাকলে ভয়, ডায়াবেটিস থাকলে ভয়, কিডনি রোগ থাকলে ভয়। এরা তো ঘর থেকে একদম বের হবেন না। সেভাবেই ঘরবন্দী হয়ে পড়লাম। চেম্বার থেকে ডাক্তারেরা উধাও হয়ে গেলেন। পরিচিত ডাক্তাররাও ফোন তুলছিলেন না। দিন ১৫ পরে এক বন্ধু ডাক্তার ফোন তুললেন। তুলেই বললেন, ঘর থেকে একদম বের হবেন না। রাস্তায় হাঁটতেও বের হবেন না। ছাদে হাঁটবেন। কিন্তু অফিস তো আছে। সেখানেও অনিয়মিত হয়ে গেলাম। ফোনে ভার্চুয়ালে কাজ সারি। এভাবেই দিন যেতে থাকে।

সরকার সব বন্ধ করে দেয়। কলকারখানা, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, যানবাহন হকার সব উধাও। পুলিশ সকলকে তাড়া করে। আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে যায় সবকিছু। রাস্তাঘাট কারফিউ-এর মতো ফাঁকা হয়ে যায়। আগে যে পথ যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগত, এখন লাগে ৭ থেকে ১০ মিনিট। মাঝে মাঝে পুলিশ হাত তুলে থামায়, আবার ছেড়ে দেয়। এর নাম হলো ‘লকডাউন’ সবকিছু বন্ধ, অচল।

এটা চীনের উহানে কিংবা ইউরোপ-আমেরিকায় যতটা সহজ ছিল, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোতে ততোটা সহজ ছিল না। উন্নত দেশে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড কিংবা বাকিতেও সংসারের প্রয়োজনীয় সবকিছু পাওয়া সম্ভব। আর ওসব থাকে সবার কাছেই। ফলে তারা এই ‘লকডাউনের চোট টের পায়নি। কিন্তু আমাদের মতো দেশগুলোর নাগরিকরা শিগগিরই টের পেতে থাকল লকডাউনের মাজেজা। এ দেশে পাঁচ কোটির বেশি লোক দিন আনে দিন খায়। তারা রিকশাঅলা, হকার, রাস্তায় বা ফুটপাতের দোকানদার, মনোহারি বিক্রেতা, অটো চালক, গৃহকর্মী, ছোট দোকানদার, দোকানকর্মী, আর গার্মেন্ট কর্মী তো আছেই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়ালে অচেনা মানুষের সারি চোখে পড়ে। নগরে হয়তো নবাগত নয়, তাহলে কারা? দু’একটা রিকশা রাস্তার পাশে চাপিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যাত্রী নেই। কেউ তো কোথায়ও যাচ্ছে না। সবাই স্থির হয়ে আছে। কিন্তু ক্ষুধা তো মানে না। দরিদ্রশ্রেণির মানুষের কাছে সঞ্চয় থাকে না। তারা হয়তো ধার-কর্জ করে চলছে। যারা সারি বেঁধে চলছিল, তাদের পায়ে শক্তি নেই। গন্তব্যের লক্ষ্য নেই। পথচারী দেখলে থামত, হাত পাততো না কেউ। মনে মনে হয়ত চাইত, পথচারী নিজে থেকেই তাদের কিছু সাধুক। হয়ত কেউ সেধেছে, হয়ত সাধেনিÑ বলতে পারি না।

এরপর সময় যেতে থাকে। রাস্তায় ঐ সব বিপন্ন মানুষের সারি দীর্ঘ ও ঘন হতে থাকে। আমার চলাচল এলাকায় দলে দলে বিপন্ন মানুষকে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখি। পান্থপথ, মীরপুর রোড, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি এলাকায় এই সারি দেখি। আগে যেমন বিকেলের মধ্যে তারা অদৃশ্য হয়ে যেত, ক্রমে ক্রমে সে অবস্থা বদলে যেতে থাকল। দেখলাম, রাত দশটা সাড়ে দর্শটা পর্যন্ত এরা রাস্তায় থাকে। অর্থাৎ অধিক সংখ্যক বিপন্ন মানুষ সাহায্যের জন্য রাস্তায় নেমে পড়ে। এদের মধ্যে কে ক’দিন খেয়েছে, কে না খেয়ে আছে বোঝা মুশকিল। কিন্তু প্রায় সকলেরই চোখে শূন্য দৃষ্টি। সকলেরই চেহারা বিষন্ন এবং ধারণা করি, সকলেই বিপন্ন।

কিন্তু আস্তে আস্তে সড়কে অপেক্ষমান লোকদের নিয়ে এক ভিন্ন চিত্রের আবির্ভাব দেখলাম। মাঝে মাঝে দু’একটা গাড়ি এসে থামছে এসব মানুষের পাশে। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস পরে তারা দ্রুত প্রত্যেকের সামনে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছে খাদ্যের ব্যাগ। ধারণা করি, তার ভেতরে আছে চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ-তেল। না, এরা কোনো সরকারি ত্রাণদাতা নয়। বিপন্ন মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা সাধারণ মানুষ। সরকারি ত্রাণ নিয়ে যখন হরিলুট চলছে; জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, এমন জনপ্রতিনিধিরা লুটে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের মুখের গ্রাস, তখন এরকম দৃশ্য ভালই লাগছিল। শুধু চাল-ডাল নয়, কেউ কেউ দিচ্ছিলেন নগদ টাকাও। যার যার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী সাধারণ মধ্যবিত্ত এ কাজ করছিলেন।

অল্প কিছু দিনের মধ্যে এ চিত্রেরও পরিবর্তন দেখলাম। করোনার আগে দেখতাম, ট্রাফিক সিগন্যালে কোনো ভিক্ষুককে টাকা দিলে, কোত্থেকে যেন ছুটে আসতো ডজন খানেক ভিক্ষুক। তারা গাড়ি  ছেঁকে ধরতো। এরা পেশাদার ভিক্ষুক। ফলে অনেকে ভিক্ষা দিতেও দ্বিধাবোধ করতেন। একজনকে দেবেন। কতজন না জানি ছেঁকে ধরে। রাস্তার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সে রকম দাঁড়াতে থাকলো। ছয়-সাতজনকে সাহায্য দিলে কোত্থেকে আরও ১০-১৫ জন ছুটে আসতে লাগলো। যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এরা রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত রাস্তায় অপেক্ষা করেছে। কেউ যদি আসে, কারও হৃদয়ে যদি দয়া হয়। ব্যক্তিগত যানবাহন আসে হঠাৎ। ট্রাকই বেশি। বেশি মানে, সারি সারি নাÑপাঁচ-দশ মিনিটে একটা আসে। সাহায্যপ্রার্থীরা গাড়ির দরজায় বেশি ভিড় করতে শুরু করে। সাহায্যদাতারা ভয় পেতে আরম্ভ করেন। যারা গাড়ির দরজা ধরে দাঁড়িয়েছে, মাথা প্রায় ভেতরে গলিয়ে দিয়েছে, তাদের কারও করোনা নেই তো। এদের কারও গায়ে জ্বর নেই তো। কেউ হুট করে গাড়ির ভেতরেই হাঁচি-কাশি দিয়ে বসবে না তো। সাহায্যদাতা মধ্যবিত্ত আস্তে আস্তে ভয় পেতে শুরু করে। সহজে গাড়ির কাঁচ খুলতে চান না। খোলা থাকলে এসব লোক দেখলে দ্রুত কাঁচ বন্ধ করে দেন। তখন তারা কাঁচে টোকা দিতে শুরু করে। এসব বিপন্ন মানুষকে ভয় পেতে থাকে মধ্যবিত্ত লোকেরা।

একদিন রাতে দশটার দিকে তেজগাঁও থেকে সোনারগাঁও হয়ে পান্থপথ দিয়ে অফিস থেকে ফিরছি। শুনশান। যানবাহন নেই বললেই চলে। লেক সার্কাস জামে মসজিদের কাছাকাছি এসে দেখি একটি ভ্যান গাড়িতে তরমুজ নিয়ে বসে আছেন একজন প্রবীণ বিক্রেতা। বললাম, এত রাতে বসে আছেন, আর কাস্টোমার পাবেন কোথায়। বাসায় যাবেন না। তিনি জানালেন, যাবেন না, এখানেই থেকে যাবেন। আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তি নেই। ধীরে সুস্থে দরদাম করে একটা তরমুজ কিনলাম। গাড়িতে উঠতে যাব, তখন দেখি, পাশে দাঁড়িয়ে ৬-৭ জন মহিলা সবারই মাস্ক পরা। আমি আশ্চর্য হলাম, এত রাতে এরা কোথা থেকে। আলো-আঁধারির মধ্যে একজন সামনে এগিয়ে এসে বললো, খালু, আমি হালিমা। বিল্ডিং-এ ঢোকা তো নিষেধ। বাস-ট্রাকও নেই। গ্রামে ফিরে যেতে পারছি না। চলি কীভাবে? কবে যে গ্রামে যেতে পারব, বলতে পারি না। আপনারা যা দিয়েছিলেন, তাও তো শেষ অনেক আগেই। ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, আগত সবাই আমাদেরই বহুতল ভবনে কোনো না কোনো বাসায় ঠিকা কাজ করতেন। ভাগ্যগুণে পকেটে একাধিক টক শোর টাকাসহ বেশ কিছু টাকা ছিল। না গুণেই হালিমার হাতে তুলে দিলাম। বললাম, তোমরা ভাগ করে নাও। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ধীর পায়ে গাড়িতে উঠলাম। যে মেয়েটি এগিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে হালিমা আমাদের বাসায়ই কাজ করতো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ