সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১
Online Edition

জাতীয় অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব

ইবনে নূরুল হুদা : প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের কারণে সারাবিশ্বেই টালটামাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে এসেছে বড় ধরনের ছন্দপতন। নানা কারণে এমনিতেই আমাদের জাতীয় অর্থনীতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। তার ওপর প্রাণঘাতি কোভিড-১৯ এর নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় জীবনকে রীতিমত দুর্বিষহ করে তুলেছে। সঙ্গত কারণেই আমাদের দেশের আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যসব সূচকের আশঙ্কাজনকভাবে অবনোমন ঘটেছে। আর সে ধারাবাহিকতায় শোচনীয় অবস্থায় পড়েছে প্রবাসী আয়; রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে আশঙ্কাজনকভাবে।
আমাদের রপ্তানীর সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। তবে স্মরণকালের সবচেয় বড় ধস নেমেছে রেমিট্যান্স অহরণে। পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বিদায়ী বছরের একই মাসের তুলনায় গত মে’ মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ২৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের। যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কম। করোনাভাইরাসের প্রভাব ব্যাপকভাবে শুরুর আগের মাস গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। যা ছিল খুবই ইতিবাচক ও স্বস্তিদায়ক।
বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা কর্মীরা কর্মহীন হয়ে পড়ায় এই উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় গত মার্চ, এপ্রিল এমনকি মে মাসেও রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে ১৪ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেয়া তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় গত ৪ মাস যাবত রেমিট্যান্স আসা উদ্বেগজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখন তা রীতিমত প্রান্তিক পর্যায়ে চলে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত মার্চের আগে প্রায় প্রতিমাসেই গড়ে ২০ শতাংশের ওপরে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পেত। বিশেষ করে সরকার কর্তৃক রেমিট্যান্সের ওপরে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার পর তা আরো বেড়ে গিয়েছিল। সেই রেমিট্যান্স প্রবাহ গত এপ্রিলে এসে ২৪ শতাংশ ঋণাত্মক হয়েছে। আর এই পতনের ধারা এখনও অব্যাহতই রয়েছে।
করোনাভাইরাসের প্রভাব ব্যাপকভাবে শুরুর আগের মাস তথা গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। গত এপ্রিল মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীরা মাত্র ১০৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছে। যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৩৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা ২৪ দশমিক ২৭ শতাংশ কম। বিশ্বব্যাপী করোনার প্রভাব ব্যাপকভাবে শুরুর প্রথম মাস গত মার্চে রেমিট্যান্স ১৮ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে ১২৭ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমেছিল।
আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্য আমাদের অন্যতম শ্রমবাজার। প্রায় দুই তৃতীয়াংশ রেমিট্যান্স আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর ইটালিতে বৈধ-অবৈধভাবে থাকে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বেশির ভাগ প্রবাসী। ফলে তারা কর্মহীন হয়ে পড়ায় আয়-উপার্জনে মন্দাভাবের সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানাচ্ছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র সচল ও নির্ভরযোগ্য রাস্তা ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এই প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতেও বৈদেশিক মুদ্রার আন্তঃপ্রবাহ কমে গেছে। এতে ব্যাংকগুলোর আমদানির দায় মেটাতে শুধু হিমশিমই খেতে হচ্ছে না বরং তা এখন রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়েই পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, করোনা সংশ্লিষ্ট মহামারীর প্রভাবে চলতি বছরে সারাবিশ্বে রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ কমবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশে অবনোমনের হার ২২ শতাংশ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত অভিবাসন ও উন্নয়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ রিপোর্টে এমন সতর্কবাণীই উচ্চারণ করা হয়েছে। এতে ‘কোভিড-১৯-এর আয়নায় অভিবাসন’ শিরোনামের রিপোর্টে অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ উভয় অভিবাসনের সম্ভাব্য অবস্থারও একটি নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে গত বছর প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন বলে প্রাপ্ত তথ্যে জ্ঞাত হওয়া গেছে। আগের বছরের চেয়ে যা ১৮ শতাংশ বেশি ছিল। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশে রেমিট্যান্স কমে ১৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৪শ’ কোটি ডলারে দাঁড়াবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশে ২০২০ সালে রেমিট্যান্স কমবে আশঙ্কাজনকভাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে ভালো প্রবৃদ্ধি ছিল। গত ১২ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ৮০ কোটি ৪০ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। তবে শেষ ১৯ দিনে এসেছে মাত্র ৪৮ কোটি ২৮ লাখ ডলার। সঙ্গত কারণেই মার্চ মাসে মাত্র ১শ ২৮ কোটি ৬৮ লাখ ডলার প্রাবাসী আয় এসেছে। গত বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ১৪৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার। এপ্রিল মাসে এ অবস্থা খুবই প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। আর মার্চ মাসে প্রবাসী আয় কমেছে ১৭ কোটি ১৮ লাখ ডলার বা ১১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আগের বছরের এপ্রিল মাসে ১শ ৪৩ কোটি ৪৩ লাখ ডলার প্রবাসী আয় এসেছিল।
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী এ বছর অভিবাসন ও কর্মসংস্থান কমে যাবে আশঙ্কাজনকভাবে। অভিবাসীদের স্বাস্থ্যবীমাও সংকুচিত হবে। আরও বলা হয়েছে, করোনার কারণে ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিদেশে থাকা শ্রমিকরা ফেরত আসছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রবাসী শ্রমিকদের চলে যেতে বলা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে ২০১৯ সালে রেমিট্যান্সের অন্তর্মুখী প্রবাহ ছিল ৭শ’ ১৪ বিলিয়ন ডলার। দক্ষিণ এশিয়ায় ১৪০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছর। এ বছর তা কমে ১০৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের মধ্যে ভারতে রেমিট্যান্স কমতে পারে ২৩ শতাংশ। পাকিস্তানেও একই হারে কমার আশঙ্কা করেছে বিশ্বব্যাংক। যা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রয়েছে তার প্রথম কাতারে।
চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের শুরু থেকেই রেমিট্যান্স আসার প্রবৃদ্ধি ছিল ঊর্ধ্বমুখী ও খুবই আশাব্যঞ্জক। যা আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতিশীলতা দিয়েছিল। কিন্তু সে ইতিবাচক অবস্থা আর অবশিষ্ট থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যেও এই প্রাণঘাতি ভাইরাস হানা দিয়েছে এবং দেশগুলো এখন রীতিমত বিপর্যস্ত। ফলে সেসব দেশের জনজীবনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। গুরুতরভাবে শুরু হয়েছে মন্দাভাব। কলকারখানাসহ উৎপাদনমূখী প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিসংখ্যান মতে, আমাদের দেশে রেমিটেন্সের অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব কারণে ঊর্ধ্বগতির রেমিট্যান্স নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যেই এই পারদটা হয়েছে আরও নিম্নমুখী। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির একমাত্র রেমিট্যান্স ছাড়া সব সূচকই আগে থেকেই ছিল নিম্নমুখী। এখন করোনার প্রভাবে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধির হারও প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নগদ প্রণোদনা ও টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে বৈধ পথে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ২শ’ ৫০ কোটি ডলার। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। গত বছর একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৪১ কোটি ডলার। একক মাস হিসাবে গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১শ’ ৪৫ কোটি ২০ লাখ ডলার সমমূল্যের অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি। গত বছর ফেব্রুয়ারি রেমিট্যান্স এসেছিল ১শ’ ৩১ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। কিন্তু সে ইতিবাচক ধারা এখন আর অব্যাহত নেই বরং তা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে।
মূলত দেশের মোট রেমিটেন্সের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এ চার দেশ থেকে আসে ১১ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে আসে সোয়া ১২ শতাংশ।  মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে প্রায় ৬০ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে সাড়ে ১১ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশ থেকে আসে সাড়ে ৭ শতাংশ। সম্প্রতি এশিয়া প্যাসিফিকের দেশগুলোতে করোনার প্রভাব রীতিমত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে এসব দেশে কর্মরত অনেক প্রবাসীই যেমন বাংলাদেশে চলে আসছেন। আর করোনা ভাইরাসের সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদি হলে এ খাতে অবস্থা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১.৬১ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ৭ শতাংশে। পরের দুই অর্থবছরে আবার প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমে আড়াই শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কমে সাড়ে ১৪ শতাংশ।
এ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মাথায় নিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ হার বাড়ে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ। অর্থাৎ আগের ঘাটতি সমন্বয় করলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৩ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। ওই অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স আহরণে রেকর্ড সৃষ্টি হয়।
ওই সময়ে প্রবাসীরা ১ হাজার ৬শ’ ৪২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে। যা অর্থবছর হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আহরণ। তারও আগে গত চার বছরের মধ্যে দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল। সে সময় রেমিট্যান্স আসে ১ হাজার ৫শ’ ৩১ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে হয়েছিল সাড়ে ৯ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের বিপরীতে ২ শতাংশ হারে নগদ প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এ কারণে রেমিটেন্স প্রবাহে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতি সেই বাড়ানো ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছে এবং তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য এখন মরার ওপর খাড়ার ঘা।
মূলত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র সচল পন্থা ছিল রেমিট্যান্স প্রবাহ। এমনিতেই আমাদের দেশের রফতানি আয় দীর্ঘ দিন ধরে খারাপ অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাথে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি এখন খুবই প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। আর এ অবস্থার কোন উন্নতি তো হচ্ছেই না বরং যত দিন যাচ্ছে ততই অবনতিই হচ্ছে। এখন রফতানি আয় কমতে কমতে প্রায় ২৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর মধ্যে রেমিট্যান্সই ছিল একমাত্র ও শক্তিশালী অবলম্বন। কিন্তু সৃষ্ট পরিস্থিতিতে এখন রেমিট্যান্স পরিস্থিতিতেও বড় ধরনের অবনোমন ঘটতে শুরু করেছে। ফলে চলতি হিসাবের ভারসাম্যসহ সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ অবস্থায় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সঙ্কট, অনৈক্য ও অচলাবস্থার কারণেই এমনিতেই আমাদের দেশের জাতীয় অর্থনীতি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারেনি বরং এক সংকীর্ণ গলি পথেই চলছে আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। তার ওপর করোনা ভাইরাসের হানা ইতোমধ্যেই জাতীয় জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। আগের দিনে পাট ও পাটজাত পণ্য আমাদের অর্থনীতি ও রেমিট্যান্স আহরণের প্রধান অনুসঙ্গ হলেও সে অবস্থা এখন আর অবশিষ্ট নেই। সময়ের প্রয়োজনে এখন সে স্থান দখল করে নিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কিন্তু বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ আমাদের রপ্তানী আয় ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স আহরণে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বিদেশ থেকে আমদানী নির্ভর কাঁচামালের অপ্রতুলতা ও শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ নির্বিঘ্ন না থাকায় যেমন তৈরি পোশাকশিল্প যেমন বড় ধরনের হুমকীর মুখে পড়েছে। পোশাকশিল্পে কর্মপরিধি এখন ৫৫ শতাংশে নেমে এসছে। যা এই সম্ভবনাময় শিল্পের জন্য অশনিসঙ্কেত বলে মনে করা হচ্ছে।
এমতাবস্থায় তৈরি পোশাকশিল্প বড় ধরনের হুমকীতে পড়েছে। সঙ্গত কারণেই তৈরি পোশাক শিল্প মালিক সমিতি ইতোমধ্যেই গণহারে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। আর তা চলতি মাস থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই শিল্পের আয় অর্ধাংশ নেমে আসবে এবং শ্রমজীবী মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন। একইভাবে প্রবাসী শ্রমিকরা কর্মহীন ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহও একেবারে প্রান্তিকতায় নেমে এসেছে। আর চলমান করোনা সঙ্কট যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে এ অবস্থার আরও মারাত্মক অবনতি হবে। যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই চলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাই এই সম্মুখ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা না গেলে আমাদের দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। মানুষকে কর্মহীন না করে কর্মমুখী করা গেলেই জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখা সম্ভব। সময় থাকতে বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে সংশ্লিষ্টদের। অন্যথায় জাতীয় বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ