শুক্রবার ০৭ আগস্ট ২০২০
Online Edition

রাজধানী ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী তীব্র বিক্ষোভ অব্যাহত

সংগ্রাম ডেস্ক : কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের ১২ দিন পরও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গত শনিবারও রাজধানী ওয়াশিংটনসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচি থেকে বর্ণবাদ, বৈষম্য ও পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে আন্দোলনকারীরা। ওদিকে সারাবিশ্বেও বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের প্রতি বর্ণবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদী মানুষেরা রাস্তায় নেমে আসেন। অপরদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন, তার দেশের পুলিশের হাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের হত্যাকাণ্ড থেকে সৃষ্ট আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে চীন। বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান
গত শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটনে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ। শহরটির ইতিহাসে এটি ছিল স্মরণকালের সর্ববৃহৎ বিক্ষোভ। আন্দোলনকারীদের চাপে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় রাজপথ। দোকানপাট বন্ধ রাখেন অধিকাংশ ব্যবসায়ী। উত্তাল বিক্ষোভের মুখে হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। হোয়াইট হাউসমুখী সব পথ বন্ধ করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
রাজপথে নেমে আসা আন্দোলনকারীদের স্বাগত জানিয়েছেন ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউজার। তিনি বলেন, এই বিশাল জনসমাবেশ ট্রাম্পকে একটি  বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
গত সোমবার ট্রাম্পকে একটি গির্জায় পৌঁছে দিতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় নিরাপত্তা বাহিনী। তবে ওই গির্জায় গিয়ে কোনও প্রার্থনায় অংশ নেননি ট্রাম্প। ফটোসেশন করেই ফিরে যান তিনি। তবে এর পরদিনই একই স্থানে ফের বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আন্দোলনকারীরা।
ওয়াশিংটনের মেয়র মুরিয়েল বাউজার বলেন, ওয়াশিংটন ডিসি দখল করতে পারলে তিনি (ট্রাম্প) যে কোনও রাজ্যই দখল করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আমরা কেউই নিরাপদ থাকবো না।’
এদিকে রাজধানী শহরে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে অ্যাক্টিভিস্টদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন থেকে সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শহরটির মেয়র। নিরাপত্তা বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে নাগরিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। একইসঙ্গে বিপুল সামরিক উপস্থিতিকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন মেয়র মুরিয়েল বাউজার।
ওয়াশিংটন ছাড়াও নিউইয়র্ক, শিকাগো, লস অ্যাঞ্জেলস ও সান ফ্রান্সিসকো-র মতো বড় শহরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’, ‘জর্জ ফ্লয়েড’, ‘আমাদের ঘাড় থেকে তোমাদের হাঁটু সরাও’ প্রভৃতি স্লোগান দেয় বিক্ষোভকারীরা। জর্জ ফ্লয়েডের জন্মস্থান নর্থ ক্যারোলিনায় তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানায় আন্দোলনকারীরা।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনসহ বিভিন্ন দেশে ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বর্ণবাদবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মসূচি থেকে আন্দোলনকারীরা ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদ ছাড়াও দেশটিতে আদিবাসীদের প্রতি মনোভাব পরিবর্তনের দাবি জানান।
যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারিভাবে জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার নির্দেশনা দেওয়া হলেও ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে বিপুল সংখ্যক মানুষ। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সেন্ট্রাল লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ার এলাকা।
২০২০ সালের ২৫ মে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের বৃহত্তম শহর মিনিয়াপলিসে পুলিশি হেফাজতে হত্যার শিকার হন জর্জ ফ্লয়েড। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ১০ মিনিটের ভিডিওতে দেখা গেছে, হাঁটু দিয়ে নিরস্ত্র ফ্লয়েডের গলা চেপে ধরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ডেরেক চাওভিন নামের এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য। এই হত্যার প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ধরনের একাধিক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। কানাডার অটোয়ায় পার্লামেন্ট হিলের বিক্ষোভে কালো মাস্ক পরে হাজির হন দেশটির প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো। এ সময় তিনি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
ফ্লয়েডের আইনজীবী বেঞ্জামিন ক্রাম্প বলেন, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদজনিত মহামারির বলি হয়েছেন তার মক্কেল। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী রেভ আল শার্পটন বলেন, ফ্লয়েডের এ ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের সব কৃষ্ণাঙ্গকেই প্রতিধ্বনিত করছে। তার ভাষায়, ‘ফ্লয়েডের সঙ্গে যা হয়েছে তা এদেশে প্রতিদিন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ আমেরিকান জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রেই ঘটে। এখন আমাদের উঠে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আমাদের ঘাড় থেকে আপনাদের হাঁটু সরান; এ কথা বলার সময় এসেছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের পুরো বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান শার্পটন।
ফ্লয়েডের আইনজীবী বলেন, ‘করোনা মহামারিতে ফ্লয়েড জীবন হারাননি। এটি অন্য এক মহামারি। বর্ণবাদ ও বৈষম্যের মহামারি তার জীবন কেড়ে নিয়েছে।’
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ব্যাপক ধস
এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রহণযোগ্যতা। জরিপ সংস্থা হিল/হ্যারিসএক্স'র চালানো সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী ট্রাম্পের কাজের প্রতি মানুষের সমর্থন কমে ৫০ শতাংশের নিচে দাঁড়িয়েছে। ৪৪ শতাংশ মানুষ এখনও মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ৫৬ শতাংশ মানুষই ট্রাম্পের কাজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ডেমোক্র্যাট নেতা জো বাইডেন। কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরুর পর গত সোমবার (১ জুন) থেকে বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পর্যন্ত জনমত জরিপটি চালিয়েছে হিল/হারিসএক্স।
নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে হিল/হারিসএক্স’র চালানো জনমত জরিপ অনুযায়ী, গত মার্চ মাস থেকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৫০ শতাংশের ঘরেই ছিল। তবে গত এক মাসে তার জনপ্রিয়তা ৬ শতাংশ কমেছে। এর আগে গত বছরের মে মাসে ট্রাম্পের প্রতি মানুষের সমর্থনের রেটিং ৪৪ শতাংশ ছিল। হিল/হারিস-এর জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের এ পর্যন্ত সবচেয়ে কম রেটিং ছিল তারও দুই মাস আগে। তখন ৪৩ শতাংশ মানুষের সমর্থন ছিল তার প্রতি।
ট্রাম্পের লাগাম টানতে ফেসবুকের প্রতি আহ্বান শতাধিক বিজ্ঞানীর
সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য ছড়ানোর’ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন ১৪০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানী। ট্রাম্পকে এমন বিষয়বস্তু ছড়ানোর সুযোগ করে না দিতে ফেসবুকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। আর এমন আহ্বান জানানো এই বিজ্ঞানীরা ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের তহবিলপুষ্ট।
এই বিজ্ঞানীদের মধ্যে ৬০ জনেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে একজন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপকও রয়েছেন। শনিবার মার্ক জাকারবার্গকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন তারা।
চিঠিতে বিশেষ করে জাতিগত বিদ্বেষকে ঘিরে বিদ্যমান টালমাটাল পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা’ যা জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর সেগুলো বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
আমেরিকায় চলমান প্রচণ্ড এই বিক্ষোভের পেছনে চীনের হাত?
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন, তার দেশের পুলিশের হাতে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের হত্যাকাণ্ড থেকে সৃষ্ট আন্দোলনে উসকানি দিচ্ছে চীন। তিনি বলেছেন, ব্যাপকভাবে বিক্ষোভের খবর প্রচার করে চীন বিষয়টির অপব্যবহার করছে।
পম্পেও শনিবার রাতে এক বক্তব্যে দাবি করেন, হংকং ও তিয়েনআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভকারীদের কঠোর হাতে দমন করেছে চীন। ওই খবর প্রচারকারী সাংবাদিকদের দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, অথচ আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিককে হত্যাকারী পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করা সত্ত্বেও বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে এবং বিক্ষোভকারীরা জনগণের জানমাল লুট করলেও তা প্রচার না করে শুধু বিক্ষোভের খবরই প্রচার করা হচ্ছে।    
যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের স্পেশাল টিম থেকে একযোগে ৫৭ কর্মকর্তার পদত্যাগ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে পুলিশের স্পেশাল টিম থেকে একসঙ্গে ৫৭ জন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। তারা বাহিনীর ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিমের সদস্য ছিলেন। একজন বয়স্ক নাগরিকের সঙ্গে নির্দয় আচরণের দায়ে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্তের পরই পদত্যাগের ঘোষণা দেন ওই ৫৭ কর্মকর্তা। ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম থেকে পদত্যাগ করলেও পুলিশ বাহিনী থেকে তারা পদত্যাগ করেননি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে বাফেলো শহরে মার্টিন গাগিনো নামে ৭৫ বছর বয়সী এক এক শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধকে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। এরপরই ওই দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। এ ঘটনায় এরিমধ্যে তদন্ত শুরু হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ