রবিবার ০৬ ডিসেম্বর ২০২০
Online Edition

দেশে ঝরল আরও ৩৭ প্রাণ আক্রান্ত ৫৫ হাজার ছাড়ালো

* চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিমের মৃত্যু 
* চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন রাজস্ব কর্মকর্তা 
* এনবিআরের ৩৮ কর্মকর্তা করনোয় আক্রান্ত

স্টাফ রিপোর্টার : দেশে করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো এতো সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হলো। এতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৪৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা য় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন দুই হাজার ৬৯৫ জন। এতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৫৫ হাজার ১৪০ জনে। গতকাল  বুধবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনা ভাইরাস বিষয়ক নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা অনলাইনে বুলেটিন উপস্থাপন করেন।
এদিকে গতকাল সকালে চট্টগ্রামে করোনা  আক্রান্ত হয়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিমের মৃত্যু  হয়েছে। অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে জসীম উদ্দিন মজুমদার নামের একজন রাস্ব কর্মকর্তা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এনবি আরের ৩৮ কর্মকর্তা করনোয় আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে ডা. নাসিমা সুলতানা ৫০টি ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার তথ্য তুলে ধরে জানান, করোনা ভাইরাস শনাক্তে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৫ হাজার ১০৩টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা করা হয় ১২ হাজার ৫১০টি। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো তিন লাখ ৪৫ হাজার ৫৮৩টি। নতুন নমুনা পরীক্ষায় করোনা র উপস্থিতি পাওয়া গেছে আরও দুই হাজার ৬৯৫ জনের দেহে। ফলে দেশে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৫৫ হাজার ১৪০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে আরও ৩৭ জনের। ফলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭৪৬ জনে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন আরও ৪৭০ জন। এ নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ১১ হাজার ৫৯০ জনে।
নতুন করে যারা মারা গেছেন তাদের ২৮ জন পুরুষ ও নয়জন নারী। ১৯ জন ঢাকা বিভাগের, ১৩ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, দুজন রংপুর বিভাগের এবং একজন করে সিলেট ও খুলনা বিভাগের। ৩১ জন মারা গেছেন হাসপাতালে, পাঁচজন বাসায় এবং একজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। বয়সের দিক থেকে ২১ থেকে ৩০ বছরের একজন, ত্রিশোর্ধ্ব তিনজন, চল্লিশোর্ধ্ব পাঁচজন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ১২ জন, ষাটোর্ধ্ব ১২ জন এবং সত্তরোর্ধ্ব চারজন মারা গেছেন।
গত মঙ্গলবারের (২ জুন) বুলেটিনে জানানো হয়, করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৭ জন মারা গেছেন। ১২ হাজার ৭০৪টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা র উপস্থিতি পাওয়া গেছে আরও দুই হাজার ৯১১ জনের দেহে, যা একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড। সে হিসাবে আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু সমানসংখ্যক থাকলেও কমেছে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা। একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড আছে ৪০ জনের। সেটি জানানো হয় ৩১ মে’র বুলেটিনে। গতকালের বুলেটিনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার ২১ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এখন পর্যন্ত শনাক্ত বিবেচনার সুস্থতার হার ২১ শতাংশ ০২ শতাংশ। এবং মৃত্যুহার ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে নেয়া হয়েছে আরও ৩৯৫ জনকে এবং বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন ৬ হাজার ৪৯৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশন থেকে ছাড় পেয়েছেন ১৩৭ জন এবং এ পর্যন্ত ছাড় পেয়েছেন ৩ হাজার ৫৩৬ জন।
দেশে মোট আইসোলেশন শয্যা রয়েছে ১৩ হাজার ২৮৪টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৭ হাজার ২৫০টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে ৬ হাজার ৩৪টি শয্যা রয়েছে। সারাদেশে আইসিইউ শয্যার সংখ্যা ৩৯৯টি এবং ডায়ালাইসিস ইউনিট রয়েছে ১১২। রাজধানীর বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে করোনা  ডেডিকেটেড ২ হাজার বেডের হাসপাতালে রোগী ভর্তি শুরু হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ২ হাজার ৪২৮ জনকে। এ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৮১৩ জনকে। গত ২৪ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টাইন থেকে ছাড় পেয়েছেন ৩ হাজার ১৪৫ জন। এ পর্যন্ত মোট ছাড় পেয়েছেন ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮৫ জন। বর্তমানে হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৫৭ হাজার ৮২৮ জন। দেশের ৬৪ জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জন্য ৬২৯টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সেবা দেয়া যাবে ৩১ হাজার ৯৯১ জনকে। ডা. নাসিমা বরাবরের মতোই করোনা ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকতে সবাইকে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মুখে মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ করোনা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। এর পর থেকে ক্রমে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে গোটা বিশ্ব এখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। চীনের উহান শহর থেকে গত ডিসেম্বরে ছড়ানোর পর এ ভাইরাসে বিশ্বজুড়ে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় পৌনে ৬৫ লাখ। মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে তিন লাখ ৮২ হাজার। তবে পৌনে ৩১ লাখের মতো রোগী ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন।
চট্টগ্রামে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিমের মৃত্যু : চট্টগ্রামের মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এহসানুল করিম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ডা. এহসানুল করিম চট্টগ্রামে করোনা  আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া চিকিৎসকদের মধ্যে প্রথম। তিনি ইউএসটিসির ৯ম ব্যাচের ছাত্র। 
জানা যায়, গত চারদিন আগে ডা. এহসানুল করিমের করোনা  শনাক্ত হয়। এরপর তাকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বুধবার সকালে অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। এর আগে ডা. এহসান ব্লাড ক্যান্সার রোগেও ভুগছিলেন। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চট্টগ্রামের করোনা  মনিটরিং সেলের সমন্বয়ক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘ডা. এহসানুল করিম করোনা  আক্রান্ত হওয়ার পর চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে সকালে আইসিইউতে নেয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।’ চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের সংগঠন ওয়াই-স্যাব এর ফাউন্ডার চেয়ারম্যান ডা. হামিদ হোছাইন আজাদ বলেন, ‘চট্টগ্রামে করোনা  দেখা দেওয়ার পরও ডা. এহসানুল করিম স্যার চেম্বার বন্ধ করেননি। একদিনের জন্যও তিনি রোগীদের বঞ্চিত করেননি। তিনি দেশের একজন লিজেন্ড মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আজ আমরা মানবতার এমন ফেরিওয়ালা স্যারকে হারিয়ে ফেলছি।’
রাজস্ব কর্মকর্তার মৃত্যু: করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত এক রাজস্ব কর্মকর্তা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। জসীম উদ্দিন মজুমদার নামের এই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন। এই প্রথম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবি আর) কোনো কর্মকর্তা কোভিড-১৯ এ মারা গেলেন বলে জানিয়েছেন বোর্ডের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ এ মু’মেন। ৫৫ বছর বয়সী জসীম উদ্দিন স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। স্ত্রী এবং ছেলেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে জানান মু’মেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাত ২টা ৫ মিনিটে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই কর্মকর্তা মারা যান। সম্প্রতি এই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য তিনি ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বুধবার পর্যন্ত এনবি আরের বিভিন্ন স্তরের ৩৮ জন কর্মকর্তা করনোভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। জসীম উদ্দিন মজুমদারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এনবি আর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম। এক শোক বার্তায় তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট এক্সিকিউটিভ অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন জসীম উদ্দিনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ