বৃহস্পতিবার ১৬ জুলাই ২০২০
Online Edition

থামছে না মানব পাচার ধরাছোঁয়ার বাইরে চক্রটি

নাছির উদ্দিন শোয়েব : লিবিয়ায় পাচারকারী চক্রের গুলীতে ২৬ বাংলাদেশির মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশের মানবপাচারের ভয়াবহতা আবার সামনে এসেছে। এ ঘটনা তদন্তে পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালকে আটকের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। র‌্যাব ও সিআইডি এ ঘটনা তদন্ত করছে। একইসঙ্গে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযানে নেমেছে গোয়েন্দারা। 
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দেশে মানব পাচার চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় সাগরপথে মানব পাচার করা হচ্ছে। দেশ থেকে মানব পাচার বন্ধে সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিলেও তা বন্ধ হচ্ছে না। বরং দিন দিন তা চরম আকার ধারণ করছে। সাগরপথে প্রতিনিয়ত ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করা হচ্ছে। আর সাগর পথে ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছে। পাচার চক্রের প্রলোভনে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা প্রতি বছরই ভূমধ্যসাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রাণ হারাচ্ছে। পুলিশের হাতে দু‘একজন আটক হলেও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে। ২০১২ সালে মানব পাচার আইন হওয়ার পর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৫ হাজার ৭১৬টি মামলা হয়েছে। কিন্তু ওই মামলাগুলোর নিষ্পত্তির হার খুবই সামান্য। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ওসব মামলার অধিকাংশেরই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেয়ায় কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানব পাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে’ রাখা হয়েছে। মানব পাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান অনেক উপরে। 
জানা গেছে, বেশিরভাগ মানব পাচারই হয় মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তানসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে। এক শ্রেণীর দালালের মাধমে অভিবাসনপ্রত্যাসীরা বেশি বেতনের চাকরির লোভে বিদেশ যাচ্ছে। তাতে বৈধ শ্রমবাজারের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। সেখান থেকে উত্তরণ না ঘটাতে পারলে দেশের বহু মানুষ নিঃস্ব সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বে। সরকার মানব পাচার প্রতিরোধ আইন করলেও তার তেমন প্রয়োগ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে না পারলে বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রপথে টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়ায় অনিয়মিত অভিবাসন দেশের সার্বিক অভিবাসনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ভারত ও পাকিস্তানে বেশিরভাগ পাচার হচ্ছে নারী। তাদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ। পাচারকারীরা দালালদের কাছে তাদের বিক্রি করে দেয়। দালালদের হাতে পড়ার পর তাদের জায়গা হয় যৌনপল্লীতে। অথবা অন্য কোন স্থানে আটকে রেখে তাদের ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন।
এদিকে গত বছর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এক পরিসংখ্যানে বলা হয়, প্রতি বছর গড়ে ৫০ হাজার নারী ভারতে পাচার হয়। তবে এতো বিপুলসংখ্যক নারী পাচার হয় কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকলেও প্রতিবছর যে নারী পাচার হচ্ছে তা নিয়ে সংশয় নেই। গত ২৮ মে লিবিয়ার মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিকে পাচারকারীরা গুলী করে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার মানব পাচারকারী একটি চক্রের মূল হোতা কামাল উদ্দিন ওরফে হাজী কামালকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। নিহত ২৬ বাংলাদেশির অনেকেই এই কামালের মাধ্যমেই লিবিয়া পাড়ি জমিয়েছিল বলে জানা গেছে। র‌্যাব বলছে, কামালের বিরুদ্ধে গত ১০ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে কয়েকটি দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার করে ইউরোপে লোক পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। মানব পাচারকারী চক্রটি পদে পদে লোকদের জিম্মি করত এবং নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত। র‌্যাব-৩ এর সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল রকিবুল হাসান বলেছেন, গ্রেফতার আসামি কামালকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর ধরে এই অপরাধে জড়িত তিনি। সংঘবদ্ধ চক্রটি বিদেশি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ইউরোপের উন্নত জীবনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত অসহায় বাংলাদেশিদের অবৈধভাবে নৌপথ ও দুর্গম মরুপথ দিয়ে পাঠিয়ে আসছে পাচারকারী এই চক্রটি। এই অবৈধ অভিবাসীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে জিম্মি করে প্রতিনিয়ত মুক্তিপণ দাবি এবং শারীরিক নির্যাতনও করে আসছে চক্রটি।
র‌্যাব সিও বলেন, গ্রেফতার হাজী কামাল এই কুখ্যাত দালাল চক্রের অন্যতম মূল হোতা। তিনি গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে অবৈধভাবে লিবিয়াতে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশিকে পাঠিয়েছেন। লিবিয়া ছাড়াও সে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও অবৈধ প্রক্রিয়ায় অভিবাসন করিয়েছেন। এছাড়াও তিনি টাইলস কন্ট্রাক্টর। প্রচুর পরিমাণে টাইলস শ্রমিকের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। আর সেই সুযোগে তাদের প্রলুব্ধ করে পাচার করে দেন।
হাজী কামাল কারাগারে : মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা কামাল হোসেন ওরফে হাজী কামালের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার কামালকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ভাটারা থানা পুলিশ। এসময় তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আইনের করা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওই থানার উপ-পরিদর্শক নুরুল ইসলাম। অপরদিকে তার আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম আবু সুফিয়াল নোমান তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ভাটারা থানার আদালতের সাধারণ নিবন্ধন শাখার মুন্সি জামান হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এর আগে সোমবার (১ জুন) রাতে র‌্যাব বাদী হয়ে ভাটারা থানায় পাসপোর্ট আইনের ১১(৩) ধারায় মামলাটি করে। ভাটারা থানার পরিদর্শক (ভারপ্রাপ্ত) মুক্তার উজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গ্রেফতারের সময় কামালের কাছে অবৈধ ৩১টি পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। তাই র‌্যাব বাদী হয়ে পাসপোর্ট আইনে মামলা করে।
উল্লেখ্য, লিবিয়ার মিজদাহ শহরে ২৬ বাংলাদেশি হত্যা ও ১১ বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে আহত হন। ওই ঘটনা দেশ বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে র‌্যাব-৩ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। তদন্তে উঠে আসে এই হাজী কামালের নাম। এরপর ১ জুন ভোরে র‌্যাব-৩ এর একটি দল গুলশান থানাধীন শাহজাদপুরের বরইতলা বাজার খিলবাড়ীরটেক এলাকা থেকে হাজী কামালকে গ্রেফতার করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ