ঢাকা, মঙ্গলবার 2 June 2020, ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৯ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

কেন মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ছুটছেন?

গণপরিবহন না থাকলেও কষ্টসাধ্য উপায়ে অসংখ্য মানুষ স্বজনদের সঙ্গে ঈদ কাটাতে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করছেন

সংগ্রাম অনলাইন : ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হতে না হতেই অসংখ্য মানুষ গ্রামের বাড়িতে যেতে শুরু করেছেন। বাস, রেল বা লঞ্চের মতো গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও, গত কয়েকদিন ধরে নানাভাবে বাড়ির পথে যেতে শুরু করেছেন, ঢাকা, গাজীপুর, বা নারায়ণগঞ্জের অসংখ্য বাসিন্দা।

পরিবার পরিজন, ছোট বাচ্চাদের নিয়ে ট্রাকে, অটোতে, এমনকি হেঁটেও তারা বাড়িতে যাবার চেষ্টা করছেন।

যদিও করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সবাইকে নিজ বাড়িতে থাকার এবং যাতায়াত না করার তাগিদ দিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। প্রায় দুই মাস ধরে বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউনও চলছে, যেখানে সব ধরণের গণপরিবহন বন্ধ রয়েছে।

কিন্তু সবাইকে নিজ অবস্থানে থাকার আহ্বানের পরেও, করোনাভাইরাসের এই সংকটের সময়েও কেন ঈদ করতে তাদের বাড়ি যাবার এই চেষ্টা? কেন মানুষ এতোটা ঝুঁকি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ছুটছেন?

মোঃ শহিদ বলছিলেন, বাসায় মেয়েরা দুইমাস ধরে ঘরে আটকে থেকে বিরক্ত হয়ে গেছে। তাই সরকার যখন প্রাইভেট কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করে বাড়ি এসেছি।

এর ফলে সংক্রমণের বা করোনাভাইরাস বিস্তারের ঝুঁকির তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলছেন, ''আমরা তো বাসা থেকে বের হচ্ছি না, কারো সঙ্গে মেলামেশা করছি না। আশা করি সেরকম কোন ঝুঁকি হবে না। আসলে যার যার নিরাপত্তা তো তার তার কাছে।''

যানবাহন না পেয়ে অনেকেই পায়ে হেটে, অটো বা সিএনজিতে করে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছেন

কয়েক দফা হেঁটে, বহুবার অটো পাল্টে, ঢাকার নবীনগর থেকে রাজবাড়ীতে গিয়েছেন ফজলু মিয়া। কিন্তু এতো কষ্ট করে বাড়ি যাবার কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলছেন, ''যেখানে থাকি, খাবার সমস্যা। বাড়িতে বাবা-মা আছে, বউ আছে। তাই ভাবলাম কষ্ট করে থাকার চেয়ে বরং কষ্ট করে বাড়ি চলেই যাই।''

সামাজিক দূরত্ব না মেনেই ঘরমুখো মানুষকে ফেরাতে এক পর্যায়ে ফেরি বন্ধ করে দেয়া হলেও পরবর্তীতে আবার চালু করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, কাউকে ঢাকা থেকে বের হতে বা ঢুকতে দেয়া হবে না। অনেককে ফিরত যেতে বাধ্য করা হয়।

কিন্তু তারপরে প্রাইভেট কারে করে যাতায়াতের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। এরপরেই অনেক পরিবারকে নিজেদের বা গাড়ি ভাড়া করে বাড়ি যেতে দেখা গেছে।

 

কিন্তু অঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও এরকম শিথিলতার কারণ কী?

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআরে) উপদেষ্টা মোশতাক হোসেন বলছেন, ''আমার ধারণা হলো, মানুষকে বাধা দেয়ার পরেও দেখা গেল তারা বাড়িতে যাচ্ছে। সোজা পথে না গিয়ে তারা বাঁকা পথে যাচ্ছে, অ্যাক্সিডেন্টের সম্ভাবনা বাড়ছে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বিপদ হচ্ছে। অনেকে হয়রানির শিকার হচ্ছে, কিন্তু ঠেকানো যাচ্ছে না। তাই সম্ভবত ভাবা হয়েছে, তাদের যেহেতু কোনভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না, তারা তারা হয়তো হাল ছেড়ে দিয়েছে।''

''অসহায়ত্ব বলেন আর ব্যর্থতা বলেন, মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মানো যায় নি যে, এভাবে গণহারে ভ্রমণ করলে রোগটা আরো ছড়িয়ে পড়বে। তিনি নিজে আক্রান্ত হতে পারেন, বাড়ির লোকজনকে আক্রান্ত করতে পারেন।''

গত কয়েকদিন ধরেই কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের সংখ্যায় নিত্যনতুন রেকর্ড হচ্ছে, মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। শনিবার একদিনে সর্বোচ্চ ১,৮৭৩জন রোগী শনাক্ত হয়, মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। দেশটিতে বর্তমানে মোট রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩২, ০৭৮ জন আর মারা গেছেন ৪৫২ জন।

প্রাইভেট কার ব্যবহার করে যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশের সরকার

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ বাড়তে থাকার এই তালিকায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে মানুষের দলেদলে শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার এই প্রবণতা।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে ২৬শে মার্চ থেকে দেশজুড়ে যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তার উদ্দেশ্যকেও হুমকির মুখে ফেলেছে এই প্রবণতা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক বেনজীর আহমেদ বলছেন, আমাদের সংক্রমণগুলো এখনো বড় শহর কেন্দ্রিক, যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ। সাধারণত যখন ছুটি হয়, মানুষ যখন ঈদের সময় বাড়ি যায়, বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু এসব বড় শহর থেকেই যান।

''আমাদের একটা হিসাব হলো, এখনো আমাদের ৭৫/৮০ভাগ জনপদ সংক্রমণ মুক্ত । ফলে এই আক্রান্ত শহরগুলো থেকে যারা যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই ভাইরাসটি বহন করে নিয়ে যেতে পারেন। তাদের অনেকে হয়তো উপসর্গ নেই, তারা নিজেও জানেন না যে, তারা আক্রান্ত।''

''২০ বা ৩০ হাজার গ্রামেও যদি এরকম আক্রান্ত লোক যান, তাহলে আমাদের যে জায়গাগুলো সংক্রমণ মুক্ত ছিল, সেই জায়গাগুলোয় সংক্রমণের একটা ঝুঁকি তৈরি হবে।'' বলছেন মি. আহমেদ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সংক্রমণের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা আরো বাড়লে প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পক্ষে তা সামলানো সম্ভব হবে না।

তাই তারা এই রোগটি সামলাতে এখনি কম্যুনিটি ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। সূত্র: বিবিসি বাংলা। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ