মঙ্গলবার ০২ জুন ২০২০
Online Edition

করোনায় আটকে আছে ৪৬ হাজার গ্রাম পুলিশের আনন্দের হাসি

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল: দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার সুখ কিসের-এমন প্রবাদ বাক্যের মতই যেন দুঃখের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছেন দেশের ৪৬ হাজার গ্রাম পুলিশ। এক দুই বছর নয়, যুগের পর যুগ ধরে নানা অবহেলার শিকার হওয়া এই দলটির ভাগ্যে সুখ আসেনি নানা জটিলতার কারণে। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে গ্রাম পুলিশের ভাগ্যাকাশে কিছুটা আলোকচ্ছটার দেখা মিললেও তাও এখন বন্দি “করোনা ভাইরাস” কোভিড-১৯ মহামারিতে। এই মহামারি কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থা ফেরার পর গ্রাম পুলিশের সদস্যদের মুখে মিলতে পারে এক চিলতে স্বস্তির হাসি, চাওয়া পাওয়ার হিসেব নিকেষ।

এদিকে, কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে গ্রাম পুলিশের সদস্যদের ‘প্রণোদনা’ হিসেবে এক হাজার ৩০০ টাকা করে দিচ্ছে সরকার। এককালীন ওই সহায়তা দিতে মোট ছয় কোটি টাকা বিশেষ অনুদান দিয়ে গত সোমবার আদেশ জারি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ২০১৯-২০ অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ থেকে প্রত্যেক জেলার জন্য মঞ্জুর হওয়া অর্থ উত্তোলনের অনুমতিপত্রও জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসকরা ওই অর্থ ট্রেজারি থেকে তুলে প্রত্যেক গ্রাম পুলিশকে সরাসরি এক হাজার তিনশ টাকা করে দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই প্রণোদনার টাকা পাওয়ার খবরে এতো হতাশার মাঝেও তাদের মাঝে আনন্দ এনেছে কিছুটা, যদিও তারা মনে করছেন এই দুর্মূল্যের বাজারে এই পরিমান টাকা তাদের অভাবী জীবনকে প্রভাবিত করবে না।

জানা গেছে, দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি নানা কাজে গ্রাম পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। গ্রাম পুলিশে প্রতি ইউনিয়ন পরিষদে একজন করে দফাদার ও নয়জন করে মহলদার নিযুক্ত আছেন। তাদের মধ্যে দফাদাররা মাসে সাকুল্যে সাত হাজার টাকা এবং মহলদাররা সাড়ে ৬ হাজার টাকা বেতন পান। গ্রাম পুলিশের চাকরি সরকারের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তাদের বেতনের অর্ধেক দেয় ইউনিয়ন পরিষদ আর বাকিটা দেওয়া হয় সরকারের কোষাগার থেকে।

ব্রিটিশ আমল থেকে এ বাহিনী বিভিন্ন আইনের অধীনে কাজ করে আসছে। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২০০৯ সালে। এ আইনের অধীনে ২০১৫ সালে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলী সম্পর্কিত বিধিমালা তৈরি করা হলেও বিধিতে তাদের কোনো শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়নি। ব্রিটিশ আমলের পর থেকে কাজ করা এই বাহিনীর সদস্যরা নানাভাবে অবহেলিত হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে সরকারি নানা সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্যে যে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়, সেসব বাস্তবায়ন হচ্ছিল না।

এদিকে, ২০০৮ সালের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গ্রাম পুলিশদের চতুর্থ শ্রেণির স্কেল নির্ধারণে অর্থ বিভাগকে চিঠি দেয়। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়ায় পরে দফাদার লালমিয়া বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। সেই রিটে চাকরি রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তি, সরকারি বেতন কাঠামোর চতুর্থ শ্রেণির সমমর্যাদা, মানসম্মত পোশাক, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো রেশন চালু ও ঝুঁকিভাতা প্রদান, প্রত্যেক বিভাগে একটি করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং গ্রাম পুলিশের সন্তানদের জন্য সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের দাবিসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে আন্দোলনের পর গ্রাম পুলিশরা প্রতিকার পেতে উচ্চ আদালতে আসে এবং পরবর্তীতে তাদের আবেদন কার্যকর হয়।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে ঢাকার ধামরাইয়ে টুপির বাড়ীর হাটকুশারা এলাকার বাসিন্দা গ্রাম পুলিশ লালমিয়াসহ ৫৫ জন গ্রাম পুলিশ হাই কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এক রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ৩ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে। পরে ওই বছরেরই ১৭ ডিসেম্বর দেশের ৪৬ হাজার গ্রাম পুলিশকে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। এর মধ্যে দফাদারদের জাতীয় বেতন স্কেলের ১৯তম গ্রেড এবং মহলদাররা ২০তম গ্রেডে বেতন পাবেন। ২০১১ সালের ২ জুন থেকে এই স্কেল অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন ও ভাতা পরিশোধ করতে বলে আদালত। চলতি বছরের ১৭ মার্চ মুজিব বর্ষ শুরুর আগেই বেতন-ভাতা পরিশোধ করে আদালতে হলফনামা দিতে স্থানীয় সরকার সচিবকে নির্দেশ দেয় আদালত। এই নির্দেশের পর আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম পুলিশের মধ্যে। ধামরাইয়ের লালমিয়াকে নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখান স্থানীয় গ্রাম পুলিশরা। তাকে নিয়ে উৎসবও করেছেন সহকর্মীরা। দীর্ঘদিন পরে এমন সুবিধা লাভ করতে পারার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে সবার মধ্যে।

কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদূর গড়ায়নি। সুবিধাও জোটেনি। করোনাকালে সব কিছু হয়ে পড়ে অস্বাভাবিক। সরকারী দফতরসহ আদালত অঙ্গনে সাধারন ছুটি শুরু হওয়ায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে গৃহিত কার্যক্রম জানাতে পারেন নি আদালতকে। যতদিন পর্যন্ত না স্বাভাবিকভাবে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ৪৬ হাজার গ্রাম পুলিশের আনন্দ বাস্তবে মিলবে না।

যোগাযোগ করা হলে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো: হেলালুদ্দিন আহমেদ গত রোববার বিকেলে দৈনিক সংগ্রামকে জানান, গ্রাম পুলিশদের নিয়ে আদালতের একটি নির্দেশনা ছিল। সেটির বাস্তবায়ন বা তার কার্যকরনের বিষয়টি আটকে গেছে করোনার সংক্রমণের কারণে। আমাদের দফতর,আদালতের সকল কাজকর্মই স্বাভাবিকভাবে চলছে না। আমরা এখন আছি দেশের মানুষের ত্রাণ নিয়ে ব্যস্ত। অফিস আদালতের কাজকর্ম স্বাভাবিক হলেই নির্দেশনা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব হেলালুদ্দিন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ