শনিবার ৩০ মে ২০২০
Online Edition

আম্ফানে প্রাথমিকভাবে ১০ জনের প্রাণহানি ও ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতি

উপকূলীয় এলাকায় আম্ফানের তাণ্ডবের চিত্র -সংগ্রাম

*সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে ৪ কমিটি

*১৩ জেলায় ৮৪ পয়েন্টে সাড়ে ৭ কি.মি. বাঁধ ভেঙেছে 

স্টাফ রিপোর্টার: প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এবারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাতক্ষীরা খুলনা যশোর কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ সমতল এলাকায়। এসব এলাকার ঘরবাড়ি ও গাছগাছালির ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশ। প্রাণহানি কম হলেও বৃহত্তর এ জেলাগুলোতে গত এক শ’ বছরেও মানুষ এমন ঘূর্ণিঝড় আর দেখেনি। অতীতে দেখা গেছে, সুন্দরবন বরাবরই প্রাচীরের মতো দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমের জেলাগুলোকে এক ধরনের সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু এবার সেটা হয়নি। ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পরবর্তী সার্বিক বিষয় নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে চারটি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান। দেশে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে মোট এক লাখ ৭৬ হাজার ৭ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, এসব জমিতে থাকা বিভিন্ন ফসলের ৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে দেশের ১৩ জেলার ৮৪টি পয়েন্টে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। তবে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আম্ফানে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে নিজ দফতরে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে সুন্দরবনে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। 

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের আঘাতে প্রাথমিকভাবে গত বুধবার পর্যন্ত ১০ জন মারা যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমাজের্ন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম। তবে এর মধ্যে ছয়জনের পরিচয় জানা গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানানো হয়েছে। হেলথ ইমাজের্ন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানান। 

আম্ফানে নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে তাদের মধ্যে পটুয়াখালীর কলপাড়ায় সৈয়দ শাহ আলম (৫৪) নামে এক স্বেচ্ছাসেবী নৌকাডুবে মারা যান। গাছচাপা পড়ে মারা গেছে একই জেলার গলাচিপার পানপট্টি এলাকার রাশেদ (৫) ও ভোলার চরফ্যাশনের মো.সিদ্দিক ফকির (৭২)। ট্রলারডুবে মারা গেছেন ভোলার বোরহানউদ্দিনের রফিকুল ইসলাম (৩৫)। এ ছাড়া দেয়াল চাপা পড়ে মারা গেছেন পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার শাহজাহান মোল্লা (৫৫)। আর চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে সালাউদ্দীন (১৬) নামে একজন মারা গেছেন। এ ছাড়া যশোরের চৌগাছায় দুজন, সাতক্ষীরায় একজন ও ঝিনাইদহে একজন মারা গেছেন।

ঝড়টির চরিত্র গতিপথ বিশ্লেষণ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় আমফান এবার সুন্দরবনের পিঠ ও বুক পাশ কাটিয়ে পশ্চিম অংশ দিয়ে আঘাত হানে। সুন্দরবনের পশ্চিম উপকূল ধরে পশ্চিমবঙ্গের দীঘা, হলদিয়া দিয়ে ওপরে উঠে আসে। ফলে এর গতিবেগ ভূমিতে ১৬৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল। এ ঘূর্ণিঝড় কলকাতা দুই চব্বিশ পরগনা শ্রীরামপুর বারাসাত বসিরহাট প্রভৃতি এলাকা দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে প্রায় বাধাহীন হয়ে উত্তর পূর্ব দিকে বাঁক নেয়। এরপর সেটি বাংলাদেশের দক্ষিণ- পশ্চিম অংশের দিকে এগোতে থাকে। বাংলাদেশ ও ভারতে এ পর্যন্ত আঘাত হানা বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের চরিত্রের সাথে এই ঝড়ের মিল তেমনটা নেই। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী ১৭৩৭ সালে কলকাতায় একই ধরনের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বলেন, প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রাথমিক হিসাব আমরা পেয়েছি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় আমদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিয়েছে। অন্য যারা আছেন তারা রিপোর্ট দিয়েছেন তারা তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দেয়নি। গত বুধবার বিকেলে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানার পর স্থলভাগে উঠে আসে। সন্ধ্যারাত থেকে বাংলাদেশের উপকূলেও শুরু হয় আম্ফানের তাণ্ডব। এটি সারারাত এটি ঘূর্ণিঝড় রূপে থেকেই দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তা-ব চালিয়েছে। সারারাত তা-ব চালানোর পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টার পর শক্তি ক্ষয়ে স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। ওই সময় স্থল নিম্নচাপ হিসেবে রাজশাহী হয়ে ভারতের মালদাহ জেলার দিকে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে আম্ফান। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেই মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসেব পেতে একটু সময় লাগবে। সব জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তারা পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানাবেন। গত বুধবার সারারাত তা-ব চালানোর পর ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এখন একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়ে আরও উত্তর পূর্ব দিকে সরে গেছে। গতকাল সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দীন আহমেদ গণমাধ্যমকে এই তথ্য জানান।

এদিকে, ঘুর্ণিঝড় পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট উইনডি ডটকম দেখাচ্ছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে আম্ফান দুর্বল হয়ে পড়ে মূল কেন্দ্র ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে রাজশাহী প্রবেশ করবে। রাজশাহী অতিক্রম করে সেটি চাঁপাইনবাগঞ্জ হয়ে ভারতের মালদার দিকে চলে যাবে। তখন এর তেমন শক্তি থাকবে না।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে সুন্দরবনে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। গতকাল বৃহস্পতিবার নিজের সরকারি বাসভবন থেকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পরবর্তী অনলাইন প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী এ কথা জানান। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিগুলোকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে হয়েছে।

পরিবেশ ও বনমন্ত্রী বলেন, বরাবরের মতো এবারও সুপার সাইক্লোন আম্ফানে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনের ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সহকারী বন সংরক্ষক পদাধিকারী রেঞ্জ অফিসারদের নেতৃত্বে এ কমিটিগুলো গঠন করা হয়েছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিগুলোকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। মন্ত্রী জানান, প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবনে বন বিভাগের ১০টির অধিক কাঠের জেটি এবং ৩০টির অধিক স্টাফ ব্যারাকের টিনের চালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বনবিভাগের ৬০টির অধিক পুকুরে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করেছে। সুন্দরবনের গাছ গাছালির মধ্যে কেওড়া গাছ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সুন্দরবনের ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেঙে যাওয়া গাছপালা অপসারণ করা হবে না জানিয়ে পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন নিজস্ব প্রাকৃতিক ক্ষমতা বলেই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। পুকুরগুলোর লবণাক্ত পানি অপসারণ করে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কিছু পুকুর পুনঃখননের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

গত বুধবার সন্ধ্যারাত থেকে শুরু হয় অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডব। সারারাত এটি দেশের দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাণ্ডব চালিয়েছে। সারারাত তাণ্ডব চালানোর পর সকাল সাড়ে ৭টার পর এটি স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়। এরপর স্থল নিম্নচাপ হিসেবে রাজশাহীতে অবস্থান করছিল আম্ফান। সকালেই মোংলা, পায়রা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে মহাবিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদফতর। আম্ফানের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যশোরে দুজন, পটুয়াখালীতে দুজন, ভোলায় দুজন, পিরোজপুরে একজন, সন্দ্বীপে একজন ও সাতক্ষীরায় একজন রয়েছেন।

এদিকে দেশে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে মোট এক লাখ ৭৬ হাজার ৭ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেছেন, এসব জমিতে থাকা বিভিন্ন ফসলের ৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড় আম্ফান পরবর্তী কৃষির ক্ষয়-ক্ষতি বিষয়ে অনলাইন প্রেস ব্রিফিং তিনি এ কথা বলেন।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে অধিকাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া গত ১৫ মে আমরা জানতে পারি যে, এ ঘূর্ণিঝড় আসবে। তাই আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পেরেছিলাম। তাই ক্ষতির পরিমাণটা অনেকাংশে কম হয়েছে। তবে এর পরও দেশের ৪৬ জেলায় এক লাখ ৭৬ হাজার ৭ হেক্টর জমির ফসল বিভিন্ন হারে ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে কৃষিতে ক্ষতি কমিয়ে আনার জন্য কৃষককে দেয়া হয়েছিল প্রয়োজনীয় পরামর্শ। তাই আম্ফানের ফলে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়নি। কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি না হলেও অল্প কিছু কৃষিজ ফসলের বিশেষ করে ফলের মধ্যে আম, লিচু, কলা এছাড়া সবজি তিল, অল্প কিছু বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে হাওরের শতভাগ ধান কাটা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭টি জেলার শতকরা ৯৬ ভাগসহ সারা দেশে ইতিমধ্যে ৭২ শতাংশ বোরো ধান কাটা হয়েছে। খুলনা অঞ্চলে প্রায় ৯৬ থেকে ৯৭ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। সাতক্ষীরাও ৯০ ভাগের বেশি ধান কাটা হয়েছে। পটুয়াখালীরও প্রায় সব ধান কাটা হয়েছে। তবে ভোলাতে ধানের ক্ষতি হয়েছে, তবে সেটা খুব বেশি নয়। এছাড়া চট্টগ্রাম পর্যন্ত সব এলাকাতে ধানের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। তিনি বলেন, আমের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার আমগুলো একটু বেশি ক্ষতি হয়েছে। সাতক্ষীরার ৬০ থেকে ৭০ ভাগ আম নষ্ট হয়েছে। ওই এলাকার ৪ হাজার হেক্টর জমির আমের মধ্যে ইতিমধ্যে এক হাজার হেক্টর জমির আম নামিয়ে নিয়েছে। বাকি ৩ হাজার হেক্টরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য আমরা ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছি যে, এ আমগুলো কিনে আমরা ত্রাণের মাধ্যমে দিতে পারি কি না।

বিভিন্ন ফসলের শতকরা হার তুলে ধরে তিনি বলেন, ৪৭ হাজার হেক্টরের বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে শতকরা ১০ ভাগ। ৩ হাজার ২৮৪ হেক্টর জামির ভুট্টার ক্ষতি হয়েছে ৫ শতাংশ। ৩৪ হাজার ১৩৯ হেক্টর জমির পাটের ক্ষতি হয়েছে শতকরা ৫ ভাগ। পানের ক্ষতি হয়েছে গড়ে শতকরা ১৫ ভাগ ভাগ তবে কোনো কোনো এলাকা এ ক্ষতি বেশি হয়েছে।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ৪১ হাজার ৯৬৭ হেক্টর জামির সবজির ক্ষতি হয়েছে ২৫ শতাংশ। এক হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমির চিনা বাদামের ক্ষতি হয়েছে ২০ শতাংশ। ১১ হাজার ৫০২ হেক্টর জমির তিলের ক্ষতি হয়েছে ২০ শতাংশ। ৭ হাজার ৩৮৪ হেক্টর জমির আমের ক্ষতি হয়ে ১০ ভাগ। ৪৭৩ হেক্টর জমির লিচুর ক্ষতি হয়েছে ৫ শতাংশ। ৬ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমির কলার ক্ষতি হয়ে শতকরা ১০ ভাগ। এক হাজার ২৯৭ হেক্টর জমির পেঁপের ক্ষতি হয়েছে ৫০ ভাগ। ৩ হাজার ৩০৬ হেক্টর জমির মরিচের ক্ষতি হয়েছে শতকরা ৩০ ভাগ। ৬৪০ হেক্টর জমির সয়াবিনের ক্ষতি হয়েছে ৫০ শতাংশ। ৭ হাজার ৯৭৩ হেক্টর জমির মুগ ডালের ক্ষতি হয়েছে ৫০ শতাংশ। মোট এক লাখ ৭৬ হাজার ৭ হেক্টর জমির ফসল বিভিন্ন হারে ক্ষতি হয়েছে।

তিনি বলেন, বিভিন্নভাবে কৃষকদের এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে সরকার। কারোনাভাইরাসের কারণে সরকার খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই টাকার কোনো সমস্যা হবে না। অনেক পান চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের আমরা লিস্ট করে ক্ষতিপূরণ দিব। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যারা আমন চাষ করবে তাদের বিনা মূল্যে বীজ সারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয়ার চেষ্টা করব। আগেও দেয়া হয়েছে এবারও দেয়া হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকায় বাঁধ ভেঙে জোয়ারে পানি চলে এসেছে এগুলো লবণাক্ত পানি। তাই এসব জমিকে আবাদযোগ্য করার জন্য আরও দুই বছর সময় লাগবে। সেখানেও আমাদের সহযোগিতা দেয়া হবে। টাকাতে ক্ষতিটা নির্ধারণ করে একদম গ্রামভিত্তিতে চাষিদের নিকট ক্ষতিপূরণ দেয়ার চেষ্টা করব। প্রতিবছর সরকার কৃষকদের ভর্তুকি দেয়ার জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু আমাদের এত টাকা লাগে না। বেঁচে যাওয়া এসব টাকা এক্ষেত্রে ব্যবহারও করা হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমরা দেখছিলাম যে, ঘূর্ণিঝড় আম্ফান নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় রিপোর্ট হচ্ছে। কিন্তু সেখানে কিছু অসংগতি ছিল। তাই আমরা প্রাথমিক একটা রিপোর্ট আজকে তুলে ধরছি। মাঠ পর্যায় থেকে নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট হয়তো দু’দিন পরে পাবেন। তিনি বলেন, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে ঘূর্ণিঝড়ে মানুষের অনেক সম্পদের ক্ষতিও হয়, অনেক সময় অনেক মানুষ মারাও যায়। আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে ঘূর্ণিঝড়ে ১০ লাখ মানুষ মারা গেছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে দেশের ১৩ জেলার ৮৪টি পয়েন্টে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। তবে ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। আম্ফানে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে নিজ দফতরে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের ১৩ জেলার মোট ৮৪টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে গেছে, যার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার। দুর্যোগের প্রস্তুতি হিসেবে শুধু উপকূলীয় এলাকার জন্যই পাঁচ হাজার ৫৫৭ কিলোমিটার বাঁধের ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু সুপার সাইক্লোন আম্ফানে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে অন্তত ৮-১০ ফুট বেশি উচ্চতায় পানি বেড়েছে, যা বিভিন্ন জেলার বেড়িবাঁধ বা তীররক্ষা বাঁধকে কোথাও ভেঙে দিয়েছে, বা কোথাও সেই বাঁধ উপচে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে জনপদে। ইতোমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত জায়গাগুলো আমরা চিহ্নিত করেছি।

এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের মেরামত কাজ দ্রুত শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, সারাদেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। দুর্যোগ প্রাকৃতিক তাই ঠেকানো যায় না। তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় জানমালের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে। আক্রান্ত সকল জেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মস্থলে আছেন। তারা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সহায়তায় বালুভর্তি জিও ব্যাগের মাধ্যমে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। এ সময় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মাহমুদুল ইসলাম, বাপাউবো মহাপরিচালক এ এম আমিনুল হক, যুগ্ম-প্রধান (পরিকল্পনা) মন্টু কুমার বিশ্বাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় এলাকার মানুষের নদী ভাঙনের কষ্ট লাঘবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মোট ৩১০০ কোটি টাকার তিনটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ