বুধবার ১২ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনা নিয়েও কায়েমী স্বার্থ?

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের মহামারিতে এ পর্যন্ত মারা গেছেন তিন লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ লাখেরও অধিক। করোনার হানায় সারা বিশে^ এখন চলছে লকডাউন পরিস্থিতি যে যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন নড়বেন না। ঘরে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। যত বেশি ঘরে থাকবেন, ততো বেশি নিরাপদ। বাংলাদেশেও আড়াই মাস ধরে চলছে লকডাউন। সংকটের শুরু সেখান থেকেই। এই ভাইরাস মারাত্মক সংক্রামক। তবে ছড়ায় রোগীর শ^াস, কফ, কাশি ও থুতুর মাধ্যমে। করোনার রোগীর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লক্ষণ প্রকাশ্য, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর দেহে বাহ্যিক কোন লক্ষণই প্রকাশ পায় না। কিন্তু যার প্রকাশ পায় না তারও হাঁচি, কাশি, থুতু থেকে রোগ সংক্রমিত হতে পারে। ফলে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে হয় কভিড-১৯ রোগ। আমরা বাংলাদেশীরা এখন সে রোগের আতঙ্গে আছি। বিশে^র যে সকল দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণ করেছে, তারা কার্যত একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। আর তা হলো, করোনার লক্ষণ যাদের আছে ও যারা করোনা রোগী তাদের পৃথক করে ফেলেছিল তারা। ফলে আক্রান্তরা নতুন কাউকে সংক্রমিত করতে পারেননি। আর কোয়ারেন্টিনে থেকে তারা নিজেরাও বেশির ভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সারা বিশে^র সকল দেশই কোয়ারেন্টিন ও লকডাউন চালু করেছিল। আর সঙ্গে ছিল মাস্ক ও  গ্লাভস ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা। অর্থাৎ একজন থেকে আর একজনকে দাঁড়াতে হবে তিন ফুট দূরে। করমর্দন ও কোলাকুলি বন্ধ। এর মধ্যে চলছে করোনা মোকাবিলার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রচেষ্টা।  পৃথিবীর সম্পাদশালী দেশগুলোর এসব ব্যবস্থা নিতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোর জন্য এই কোয়ারিন্টিন বা লকডাউন আকস্মিকভাবেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক বিরাট বিপর্যয় ডেকে এনেছে। অফিস, আদালত বন্ধ, স্কুল-কলেজ বন্ধ, শিল্প-কারখানা বন্ধ, বাজারঘাট-দোকানপাট বন্ধ। বন্ধ রুটি-রুজির ব্যবস্থা। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, এই কোয়ারেন্টিন ও লকডাউনে দেশের প্রায় সাড়ে ৫ কোটি লোক উপার্জনের পথ হারিয়েছে। বেকার হয়ে পড়েছে। এরা সবাই দিন আনে দিন খায়। রুটি-রুজির পথ হারিয়েছেন মুটে মজুর, পরিবহন শ্রমিক, গৃহকর্মীÑ এমনি হাজারো পেশার মানুষ।

এখন উপায়? একদিকে জীবনের সংকট, অপরদিকে জীবিকার সমস্যা। আমাদের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্টস শিল্পও বন্ধ। এই শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। তাদের অধিকাংশই নারী। আর এই শিল্প বন্ধ রাখা মানে শ্রমিকদের অনাহার। আর বিদেশি ক্রেতাদের তাগিদ। বিদেশি ক্রেতারা বলছেন, যদি ঠিক সময়ে বাংলাদেশ তাদের অর্ডারকৃত পণ্য সরবরাহ না করে তবে তারা অর্ডার বাতিল করবেন। করেছেনও অনেকে। একদিকে ক্রেতাদের চাপ, অপরদিকে শ্রমিকদের জীবিকার তাগিদে কাজে ফেরার ইচ্ছাÑ এর জন্য সরকারকে আপোস করতে হলো। খুলে দেওয়া হলো অধিকাংশ পোশাক কারখানা। পোশাক কারখানা যদি খোলেন তবে কর্মীদের আসা-যাওয়ার জন্য যানবাহনের চলাচলও খুলে দিতে হয়। আর যানবাহন চলাচল শুরু করলে কিছুতেই যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা যাবে না, সেটাও প্রায় নিশ্চিত ছিল। ফলে সামাজিক দূরত্বের বিধান উপেক্ষা করেই চালু হলো পোশাক শিল্প ও যানবাহন। সড়ক যোগাযোগও বন্ধ ছিল। কিন্তু তৈরি পোশাক বন্দরে পাঠাতে তো যানবাহন লাগবে। আবার এই পণ্য খালাস করে জাহাজ বোঝাই করার জন্য লাগবে কর্মী। ফলে শিথিল হয়ে গেল সবকিছু। কাঁচাবাজার খুললো, দোকানপাট কম সময়ের জন্য হলেও খুললো, বন্ধ থাকলো শপিং মল। 

তবে অনেক জায়গায়ই দোকানপাট বন্ধ থাকল। সরকার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কিছু কিছু দোকানপাট খোলার অনুমতি দিল। কিন্তু বহু ক্ষেত্রে দেখা গেল, দোকান মালিকরা দোকানপাট খুলতে আগ্রহী হলেন না। একদিকে তিন ফুটের সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা কঠিন কাজ, অপরদিকে করোনার ভয়ে মধ্যবিত্ত হয়ত বেরই হবেন না ঘর থেকে। অনেক জায়গায় সে রকম পরিস্থিতিই দেখলাম। মধ্যবিত্তের দোকান খুলে বসে আছেন ব্যবসায়ীরা; কিন্তু ক্রেতা নেই। ফলে অনেক এলাকায় সরকার অনুমোদন দিলেও দোকান মালিকরা জোট বেঁধে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা দোকান খুলবেন না। কেন খুলবেন না? এ প্রশ্নে আবার সামনে চলে এলেন দোকান-কর্মচারীরা। যে কোন দোকানে অন্তত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করেন ৪/৫ জন কর্মচারী।

লকডাউনে সময় নিশ্চয় তাদের বেতন হয়নি। দোকান খুললে তাদের বকেয়া বেতন দিতে হবে। চলতি মাসের বেতন দিতে হবে। দিতে হবে উৎসব বোনাসও। মালিকরা হিসাব করে দেখলেন দোকান খুললেও শুধু ঈদের মওসুমের বিক্রির লভ্যাংশ দিয়ে এটা তারা পোষাতে পারবেন না। আবার ঈদ চলে গেলে বেতন বোনাস কী? মারা পড়ল ঐ গরীবই।

এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সরকার ট্রাকে করে ১০ টাকা কেজি দরে চাল ও সস্তায় অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিন থেকেই বোঝা গেল, গরীবের এই পণ্য লুট হয়ে যাচ্ছে। সরকারের লোকেরা টনে টনে ত্রাণের চাল মেরে দেয়ার উৎসবে মেতে উঠলো। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, সরকার ট্রাকে চাল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিল। এ যেন চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার মতো ঘটনা। পাশাপাশি টিসিবির মাধ্যমেও সরকার ন্যায্যমূেল্য বিভিন্ন পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দ্রুতই তা সরকারি লোকদের গুদামে- বাড়িতে চলে যেতে থাকে। ভোর থেকে মানুষ লাইন দিয়ে দাঁড়ায় টিসিবির পণ্যের জন্য। কিন্তু টিসিবির যে গাড়ি আসার কথা সকাল ১০টায়, সে গাড়ি দুপুর দুটোও আসে না। মাল উধাও হতে থাকে। টিসিবির চাল-ডাল-চিনি-তেল সরকারি দলের লোকদের গুদামে, বাড়িতে, খাটের নিচে ও ভেতরে আবিষ্কার হতে থাকে।

অপর দিকে করোনা পরীক্ষা নিয়েও চলতে থাকে তোঘলকি কা-। কারও করোনা বা করোনার লক্ষণ ধরা পড়লেও সহানুভূতির বদলে এলাকার মানুষ তাকে তাড়া করতে থাকে। নিজ বাড়িতেও তারা আশ্রয় হারা হয়ে পড়তে থাকলেন। ডাক্তার নার্সরাও বিপন্ন হয়ে পড়লেন। তাদের বাসা ছাড়ার নোটিশ দিতে থাকলেন বাড়িওয়ালারা। সেখানে হস্তক্ষেপ করতে হয় সরকারকে। এই করোনা এক ভয়াবহ সামাজিক সঙ্কটের সৃষ্টি করলো। করোনা আক্রান্ত ভেবে বয়স্ক বাবা-মাকে এরা রাস্তায় বা জঙ্গলে ফেলে যেতে শুরু করলো। করোনায় কেউ মারা গেলে তার  দাফন-কাফনেরও কোনো লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। এখনও যাচ্ছে না। পুলিশ ও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তাদের দাফন-কাফন ও সৎকারের ব্যবস্থা করছে। অর্থাৎ করোনা সমস্ত সামাজিক মূল্যবোধকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেল, সন্তানের ফেলে- দেওয়া বয়স্ক সেই বাবা-মায়ের করোনা হয়নি। কিংবা করোনা ছিল না। এই ‘ছিল না’ আর এক কাহিনী।  বয়স্ক পরিত্যক্ত কেউ মারা গেলে তার করোনা পরীক্ষা হয়। বেশ পরে জানা যায়, তার করোনা ছিল কি ছিল না। এও এক আজব আমলাতান্ত্রিক কা-। যখন ঢাকায় শুধু বিএসএমএসই করোনা পরীক্ষা করতো, যে পরীক্ষার ফল পেতে সপ্তাহ বা ১০-১৫ দিন লেগে যায়। সে সময় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করোনা পরীক্ষার জন্য একটি র‌্যাপিট কিট তৈরি করে পরীক্ষার জন্য দিল। 

এই কিটের মাধ্যমে ১০ থেকে ১৫ মিনিটেই শনাক্ত করা যাবে কার করোনা আছে, কার নেই। কিন্তু ওষুধ প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদফতর এবং শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত হাইকোর্ট দেখিয়েই যাচ্ছেন। এই বিশ^বিদ্যালয়ে বা এখন অন্যত্র করোনা পরীক্ষা করাতে সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। অথচ গণস্বাস্থ্যর কিটের মাধ্যমে করোনা পরীক্ষা করতে খরচ হবে ৩০০ টাকা মাত্র, যা থাকবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। এটা কার্যকর কিনা, তা পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএসএমএমইউকে। তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, তারা জানাতে পারছেন না, গণস্বাস্থ্যের কিট কার্যকর কি কার্যকর নয়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, এই কিট ব্যবহার করলে অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক করোনা রোগী শনাক্ত করে তাদের আলাদা করে ফেলা যেত। কমিয়ে আনা যেত সংক্রমণ।

তাতে মনে হয়, মানুষের জীবন-মরণ নিয়ে কোথায় যেন বাণিজ্য ও কায়েমি স্বার্থ কাজ করছে। কিন্তু করোনা মহামারির এই দুর্যোগপূর্ণ দিনে জনকল্যাণে এই কায়েমি স্বার্থবাদিদের বিরুদ্ধে কি কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া যায় না? রক্ষা করা যায় না সাধারণ মানুষের জীবন? এ রকম দুঃসময়েও যদি না করা যায়, তাহলে করা যাবে কবে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ