সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১
Online Edition

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ঘূর্ণিঝড়ের আলামত প্রত্যক্ষ করছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন -সংগ্রাম

চট্টগ্রাম ব্যুরো : ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে চট্টগ্রামে গতকাল বুধবার সকাল থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বয়ে যায়। বঙ্গপসাগর উত্তাল রয়েছে। এদিকে গতকাল বুধবার সকালে ঘূর্ণিঝড় আম্ফান বাংলাদেশ উপকূলের কাছাকাছি চলে আসার পর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বন্দরে চার মাত্রার সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জাহাজ না থাকায় এবং অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কার্যত অচল হয়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দর। বুধবার   সকালে মহাবিপদ সংকেত জারির পর চট্টগ্রাম বন্দরে নিজস্ব চার মাত্রার সর্বোচ্চ সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সার্বক্ষণিকভাবে চালু আছে। বেলা ১২টার দিকে বন্দরের জেটিতে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে এসেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) মো. জাফর আলম বলেন, ‘মূলত অ্যালার্ট থ্রি জারির পরই চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। অ্যালার্ট-ফোর মানে হচ্ছে সর্বোচ্চভাবে মোকাবিলার জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখা। এখন বন্দরে কোনো জাহাজ নেই। বহির্নোঙ্গরেও জাহাজ নেই। লাইটারেজ জাহাজগুলোকে কর্ণফুলী নদীতে শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণে নেওয়া হয়েছে। বন্দরের ইয়ার্ড থেকে আগে বুকিং থাকা কিছু কিছু কনটেইনার এখনও ডেলিভারি হচ্ছে। তবে সেটা সংখ্যায় খুবই নগণ্য।’
 এর আগে মঙ্গলবার  সকালের জোয়ারে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজশূন্য করা হয়। জেটি থেকে ১৯টি এবং বহির্নোঙ্গর থেকে ৬৭টি জাহাজ সরিয়ে সেন্টমার্টিন উপকূলে পাঠানো হয়। এছাড়া প্রায় ৫০০ লাইটারেজ জাহাজকে কর্ণফুলী নদীতে শাহ আমানত সেতুর দক্ষিণে পাঠানো হয়েছে। জেটিতে যেসব গ্যান্ট্রিক্র্যান ও আনুষাঙ্গিক ভারি যন্ত্রপাতি আছে সেগুলোকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। এছাড়া নিজস্ব নৌযানগুলোকে নিরাপদ স্থানে নোঙ্গর করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে চালু তিন বিভাগের তিন নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ০৩১ - ৭২৬ ৯১৬, ০৩১- ২৫১৭৭১১ এবং ০১৭৫১ ৭১ ৩০ ৩৭ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।
এদিকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী ৬টি উপজেলা এবং মহানগরীর অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ডে প্রায় চার লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করেন। গত ২৪ ঘণ্টায় এদের মধ্যে মাত্র ৫৩ হাজার লোকজনকে সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে প্রশাসন। চট্টগ্রামের উপকূলবর্তী ৬টি উপজেলা হচ্ছে- সন্দ্বীপ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও কর্ণফুলী। চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা, বন্দর, ইপিজেড বেড়িবাঁধ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ কাট্টলী এলাকায় সাগর তীরে মানুষের বসতি আছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. তৌহিদুল ইসলাম   বলেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যে আমরা কাট্টলী এলাকার আড়াইশ পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছি। রাতের মধ্যে বন্দর-ইপিজেড আকমল আলী রোডের জেলেপাগড়া থেকে আরও ১৫০ পরিবারকে সরানো হয়েছে। কিন্তু এগুলো অনেকটা চোর-পুলিশ খেলার মতো হচ্ছে। আমরা তাদের নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে আসছি। তারা আবার বিভিন্ন অজুহাতে বের হয়ে বাড়িঘরে চলে যাচ্ছে। অনেকে স্ত্রী-সন্তানকে পাঠিয়ে নিজে বাড়িতে থেকে যাচ্ছেন। রাতে এমনও দেখেছি, দরজায় তালা অথচ ভেতরে লোকজন ঘুমাচ্ছেন।’
এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পাহাড় থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের সরাতে জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের পক্ষ থেকে মাইকিং চলছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ সেনাবাহিনীর সদস্য এবং পুলিশ নিয়ে আমাদের টিম বিভিন্ন পাহাড়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা বসবাস করছেন, তাদের কাছকাছি আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যেতে বলা হয়েছে।’
 প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিদর্শন ও তদারকিতে সিটি মেয়র নছির উদ্দীন--আবহাওয়া অধিদপ্তর হতে মহাবিপদ সংকেত ঘোষণার পর গতকাল বুধবার সকাল থেকে নগরীর উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আম্ফান সুপারসাইক্লোন মোকাবেলায় সার্বিক প্রস্তুতি কার্যক্রম পরিদর্শন শুরু করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কন্ট্রোলরুম সার্বক্ষণিকভাবে সক্রিয় রযেছে।  যে কোন সহযোগিতার জন্য ০৩১-৬৩০৭৩৯, ০৩১-৬৩৩৬৪৯-তে যোগাযোগ করার জন্য নগরবাসীকে সিটি মেয়র অনুরোধ জানিয়েছেন। এসময় মেয়র আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রীতদের মাঝে শুকনো খাবার ও বোতলজাত সুপেয় পানি,মোবাতি,দিয়াশলাই ও  প্রয়োজনীয় জরুরী ওষুধপত্র প্রদান করেন।  নগরবাসীকে আতঙ্কিত না হয়ে সুশৃঙ্খলভাবে সামাজিক দূরত্ব বজিয়ে নিয়ম চলার আহবান জানান মেয়র। করোনা সংক্রমণ এবং আম্ফান সাইক্লোন মোকাবেলায় মানসিক প্রস্তুতি ও আত্ম মনোবলে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য তিনি নগরবাসীর প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, বাস্তবতা আমাদেরকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলায় অফুরন্ত শক্তি যোগাতে পারে। সবচেয়ে বড় ভরসা ও আস্থা মহান আল্লাহর প্রতি। তিনি অবশ্যই আমাাদের রক্ষা করবেন। তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রীতদের করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়িয়ে চলতে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেন। পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মেয়রের একান্ত সচিব মোহাম্মদ আবুল হাশেম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক সহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
আনসার-ভিডিপির ব্যাপক প্রস্তুতি- প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় চট্টগ্রাম জেলার উপকূলীয় এলাকায় জনসাধারনকে সতর্কবার্তা পৌছানো, দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে জনগণকে অবস্থান করা, দুর্গতদের উদ্ধার করা, গবাদি পশু রক্ষা, অসহায় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধীদের নিরাপদে আশ্রয় কেন্দ্রে পৌছে দেওয়াসহ আর্তমানবতার সেবায় ও জানমাল রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে উপকূলীয় এলাকার স্বেচ্ছাসেবী আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা। ইতোমধ্যে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন আনসার কমান্ডার, ভিডিপি দলনেতা-দলনেত্রী এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তাগণকে ঘূর্ণিঝড়ে সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জনগনের জানমাল রক্ষায় পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করার জন্য জেলা কমান্ড্যান্ট বিকাশ চন্দ্র দাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। জেলার পতেঙ্গা, বন্দর, আনোয়ারা, সন্দীপ, কর্ণফুলী, বাঁশখালী, পটিয়া, বোয়ালখালী, মিরসরাই ও সীতাকুন্ডসহ উপকূলীয় উপজেলাসমূহে বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত আনসার ক্যাম্পসমূহে অস্ত্র-গুলি নিরাপদ স্থানে রেখে কাজ করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবেলায় ২শতাধিক অঙ্গীভূত আনসার সদস্যসহ ৭শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী আনসার-ভিডিপি সদস্যকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকা জুড়ে মাইকিং করে মানুষকে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে ও নিকটস্থ সাইক্লোন সেন্টারে আসার জন্য আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে জনগণকে আহবান করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ