সোমবার ০১ জুন ২০২০
Online Edition

করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত পুলিশ ॥ মাদক চালানে তৎপর চোরাকারবারী চক্র

নাছির উদ্দিন শোয়েব: মহামারি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারা থমকে গেছে। কিন্তু এমন মহাদুর্যোগেও থেমে নেই মাদক কারবারিচক্রের চোরাকারবার। করোনা  মোকাবেলায় পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব বাহিনীর করোনা ভাইরাস সুরক্ষা কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারিচক্রগুলো।
মাদক নিয়ন্ত্রণে এরমধ্যেই র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা হলেও চেষ্টা করছে। একদিকে মাদক কারবারি সন্দেহে এসব বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে মাদকেরও রমরমা ব্যবসাও চলছে। সারাদেশে লকডাউন চলাকালে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। দু’দিন আগেও রাজধানীতেই একরাতে বন্দুকযুদ্ধে দুই জন নিহয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশ জানিয়েছে, নিহতরা মাদক কারবারারি চক্রের সদস্য। 
মাদক চোরাকারবারি চক্র বিভিন্ন কৌশলে দেশে মাদকের চালান আনছে। তল্লাশি ও নজরদারিতে কিছুটা শিথিলতা তৈরি হওয়ায় সুযোগ নিচ্ছে তারা। জরুরি প্রয়োজনীয় জিনিস পরিবহন করার নামে মাদকের বড় ডিলারদের কাছ থেকে মাঝারি ডিলার, মাঝারি থেকে ক্ষুদ্র ডিলার বা খুচরা বিক্রাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, শেষ ধাপে ক্রেতা বা মাদকসেবিদের হাতে। অ্যাম্বুল্যান্স, সবজিসহ নিত্যপণ্য পরিবহনের গাড়িতে করে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন নিয়ে আসছে কারবারিরা।
এমনকি মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, রিক্সা/ভ্যান ও হেঁটে হেঁটে মাদক পরিবহন হচ্ছে বলে  গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের ইয়াবা কারবারিরা ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবার চালান পাঠাচ্ছে। ত্রাণ বিতরণ, ওষুধ কেনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে সরাসরি গিয়ে এবং কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো পার্সেলের মাধ্যমে মাদক বিক্রি করছে তারা।
লকডাউনে নগরীর গলিতে গলিতে জমজমাট আড্ডা চলছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও নগরবাসী চোর-পুলিশ খেলা করেছে। তারা নিষেধাজ্ঞা কোনোভাবেই মানছে না। এসব আড্ডায় মাদক কারবারারীরা নানা কৌশলে ইয়াবা, ফেনসিডিল হোরাইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক সরাবরাহ করছে বলে অভিযোগ ওঠছে। মাদক কেনার টাকা টাকা না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা কতিপয় মাদক সেবী সন্তানের হাতে হেনস্থা হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
করোনা  সংকটে পুলিশ র‌্যাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজাসহ মাদকদ্রব্যর বড় বড় চালান ধরছে। গ্রেফতারও হচ্ছে এর সঙ্গে জড়িতরা। আলুর বস্তায় মিলছে গাঁজার বান্ডিল, মাছের ট্রাকে মিলছে ফেন্সিডিল, মোটরসাইকেলের সিটে এমনকি অ্যাম্বুলেন্সের ইঞ্জিনের ভিতরে লাখ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করছে পুলিশ, র‌্যাব ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বেরুনোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভ্যান/রিক্সা, মোটরসাইকেল/বাইসাইকেল ও পাঁয়ে হেটে মাঝারি ডিলাররা খুচরা বিক্রেতাদের মাদকের চালান পৌঁছে দিচ্ছে।
পাড়া মহল্লায় খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, যেকোনো এলাকায় মাদক কারবারি করতে গেলে থানা পুলিশকে ম্যানেজ না করে টিকে থাকা অসম্ভব! থানা পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের মাসোহারা দিতে হয়। নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা করতে গেলে এসব ম্যানেজ করাই লাগে। অনেক মাদক কারবারি বলছেন করোনা  সংকটে পুলিশি অভিযান শিথিল থাকলেও মাসোহারা বন্ধ হয়নি।  নিয়মিত তাদের মাসোহারা দিতেই হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের এখন বেশী অংকের মাসোহারা দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মাদক কারবারিরা।
করোনা  সংকটে দেশে লকডাউন চলায় সবাই বাসায় অবস্থান করছে, এই সুযোগে পাড়া মহল্লায় একটু আড্ড দিয়ে আসি বলে যারা নিয়মিত মাদক সেবন করে তাদের সঙ্গ মিশে অনিয়মিত মাদকসেবীরা মাদক সেবন করছে। চায়ের দোকান বন্ধ থাকলেও পাড়া-মহল্লা অলিগলি আড্ডা থেমে নেই। থেমে নেই মাদকসেবন। কোনো না কোনোভাবেই মাদক সংগ্রহ করে থাকে। নির্জনতার সুযোগে চুটিয়ে আড্ডার ছলে মাদকসেবন চলছে। 
র‌্যাব সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত ৮ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেফতার হয়েছেন ৮৮০ জন। এ সময় উদ্ধার হয়েছে চার লাখ ৪০ হাজার ৩৯২ পিস ইয়াবা, সোয়া ছয় কেজি হেরোইন, ১৫ হাজার ৪১৭ পিস ফেনসিডিল, গাঁজা ৯৫৪ কেজি, বিদেশি মদ ৭৭৭ বোতল, দেশি ১ হাজার ৯০৫ লিটার এবং বিয়ারের ক্যান জব্দ হয়েছে ১ হাজার ৩২৭টি।
গত ১ থেকে ৭ মে পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ হয়। এই সাতদিনে গ্রেফতার হন ৭২ জন, জব্দ হয় ৭৬ হাজার ১৭৫ পিস ইয়াবা, আধা কেজি হেরোইন, ১ হাজার ৯৮২ বোতল ফেনসিডিল, ২৯৬ কেজি গাঁজা, ৪৭ কেজি দেশি মদ। এর মধ্যে শুধু ঢাকায়ই জব্দ হয় ১ হাজার ৫ পিস ইয়াবা, ফেনসিডিল ৭৪১ বোতল ও গাঁজা ৮৫ কেজি। গ্রেফতার হন ১৭ জন।
অন্যদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে ১৪ কোটি ৯৪ লক্ষাধিক টাকার চোরাচালান ও মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ৬২১ পিস ইয়াবা, ২২ হাজার ৯৫১ বোতল ফেনসিডিল, ১ হাজার ৪৩৯ বোতল বিদেশি মদ, ২৯০ লিটার বাংলা মদ, ২৯ ক্যান বিয়ার, ৫৬০ কেজি গাঁজা, ৪০০ গ্রাম হেরোইন, ১ হাজার ৫৪টি ইনজেকশন, ২ হাজার ১৭৯টি এ্যানেগ্রা/সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৮৭ হাজার ৪৭০টি অন্যান্য ট্যাবলেট। মাদকের জোন হিসেবে খ্যাত সীমান্তবর্তী জেলা কক্সাবাজার থেকে শুধু এপ্রিলেই র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযানে জব্দ করা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ পিস ইয়াবা। বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন একজন। সর্বশেষ গত ৪ মে রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের নাফ নদীতে অভিযান চালিয়ে ৪০ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করে বিজিবি। আর পুলিশ সদর দফতরের হিসেব অনুযায়ী, গত জানুয়ারি মাসে মাদক উদ্ধারজনিত মামলা ৯১৫০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৮৫৩১টি ও মার্চে ৭৬২৩টি। তিন মাসে মাদক উদ্ধারজনিত মামলা ২৫ হাজার ৩০৪ টি।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা জানান,  করোনা র মধ্যে পুলিশ অনেক বেশি মানবিক কাজে জড়িত। তবে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা বিশেষ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় মাদকের কারবার বন্ধে কাজ করছে পুলিশ সদস্যরা। মাদকের ব্যাপারে পুলিশ সদরের নির্দেশনা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন এ সময়ও চলছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ