বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনায় আক্রান্ত বাড়লেও মনোবল চাঙ্গা রয়েছে পুলিশ সদস্যদের

নাছির উদ্দিন শোয়েব : বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার ও ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত সদস্যদের মাঝে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। একদিনে পুলিশে করোনায় আক্রান্তের রেকর্ড করেছে। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৪১ জন পুলিশ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এটিই পুলিশ বাহিনীতে একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্তের রেকর্ড। এদিকে পুলিশ সদরদফতর জানিয়েছে, আক্রান্ত বাড়লেও মনোবল চাঙা রয়েছে পুলিশ সদস্যদের। এছাড়া এখন পর্যন্ত ১৮২ আনসার সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসে নতুন করে আরও ৮ জনসহ মোট ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন। 
জানা গেছে, সবমিলিয়ে পুলিশ বাহিনীতে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৮২ জনে। এ সংখ্যা গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশের সকল পুলিশ ইউনিটের। এর আগে ১১ মে একদিনে সর্বোচ্চ ২০৭ জন পুলিশ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। পুলিশের করোনা কন্ট্রোল রুম সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সদস্য এক হাজার ৪১ জন। এর মধ্যে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যই বেশি।
ডিএমপির পক্ষ থেকে জানায়, করোনায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়াও তাদের দু’জন অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ও একজন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) পদমর্যাদার কর্মকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। সারা দেশের পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসমুক্ত হয়ে ৩৬১ পুলিশ সদস্য সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। মারা গেছেন সাতজন। এদিকে করোনা আক্রান্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের দেখভালে উচ্চপদস্থ পরিদর্শন টিম গঠন করেছেন আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ। তারা নিয়মিত পুলিশ সদস্যদের খোঁজখবর রাখছেন।
জানা গেছে, আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা নিয়মিত ও সশরীরে চিকিৎসাধীন সদস্যদের পাশে উপস্থিত হয়ে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং তাদের প্রয়োজনে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণে সদা তৎপর রয়েছেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন এবং বাহিনীর সদস্যদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিচ্ছেন।
তাদের নির্দেশনায় আক্রান্ত সদস্যদের সুচিকিৎসা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে ইতোমধ্যে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কয়েকটি টিম গঠন করা হয়েছে। টিমের সদস্যরা কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র এবং হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে চিকিৎসাধীন পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেয়ার পর বলছেন, আক্রান্তদের মনোবল যথেষ্ট চাঙা রয়েছে। তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ফের কাজে যোগ দিতে বেশ উদগ্রীব।
এসব টিমের কর্মকর্তাগণ সার্বক্ষণিক করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের পাশে যাচ্ছেন, তাদের সাথে কথা বলছেন, স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং তাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর রয়েছেন। নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি দল করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সশরীরে দেখতে যান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন।
পরিদর্শন দল রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হোটেল আরামবাগ, রাজারবাগ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিজয়নগর হোটেল, ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুল, ডিএমপির ট্রাফিক ব্যারাকে স্থাপিত অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্র ও রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের চিকিৎসাধীন করোনা আক্রান্ত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, অত্যন্ত আন্তরিকভাবে করোনা আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের সুচিকিৎসা এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্তরা বড় কোনো অসুবিধা ছাড়াই সেরে উঠছেন। তাদের মধ্যে কিছু সদস্য ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং তারা তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের মনোবল যথেষ্ট চাঙা রয়েছে।
১৮২ আনসার সদস্য আক্রান্ত : বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৮২ সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন একজন। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর উপ-পরিচালক (যোগাযোগ) মেহেনাজ তাবাসসুম রেবিন স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১৫ মে পর্যন্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ১৮২ জন সদস্য ও কর্মচারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যা গত বুধবার ছিল ১৭০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন বাহিনীর উপ-মহাপরিচালক একজন, ৭৯ জন ব্যাটালিয়ন আনসার, ৯৮ জন অঙ্গীভূত আনসার, একজন মহিলা আনসার, একজন নার্সিং সহকারী, একজন সিগন্যাল অপারেটর ও একজন ভিডিপি সদস্য।
আক্রান্ত সদস্যদের মধ্যে ৬৬ জন ব্যাটালিয়ন আনসার জাতীয় সংসদ ভবনে এবং ৬৭ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য ঢাকা মহানগর পুলিশের সঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া বাকিদের কেউ সদর দফতর এবং কেউ বিভিন্ন জেলায় কর্মরত রয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে হোম কোয়ারেন্টাইনে একজন, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ৪৩৫ জন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, সাজেদা মেডিকেল ও রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বাহিনীর ১৫৬ জন সদস্য করোনা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত বাহিনীর আব্দুল মজিদ নামে একজন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি অঙ্গীভূত আনসার (আইডি নম্বর-১৩১৮৯) সদস্য। তার বাড়ি বগুড়ায়। মৃত্যুর আগে তিনি গুলশান বিভাগের ভাটারা থানায় কর্মরত ছিলেন। গত ১১ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান।
ফায়ার সার্ভিসে আক্রান্ত আরও ৮ জন: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের আরও ৮ জন কর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে ফায়ার সার্ভিসে মোট ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলেন। গতকাল শনিবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মিডিয়া সেল) মো. শাহজাহান শিকদার জানান, আক্রান্তদের মধ্যে বর্তমানে একজন সুস্থ হয়েছেন। বাকি ২৩ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।
শাহজাহান শিকদার বলেন, অগ্নিদুর্ঘটনা নির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে এদের কয়েকজন প্রথমে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে তাদের থেকে অন্যরা সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ৮ জন সদরঘাট ফায়ার স্টেশনের, দুজন পোস্তগোলা ফায়ার স্টেশনের, তিনজন অধিদফতরের অফিস শাখার, সাতজন সদর দফতর সিদ্দিকবাজার ফায়ার স্টেশনের এবং চারজন ঢাকা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মী। আক্রান্তদের মধ্যে ১৫ জনকে পূর্বাচল মাল্টিপারপাস ফায়ার সার্ভিস সেন্টারের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে এবং ৮ জনকে সদরঘাট ফায়ার স্টেশনে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেনটাইনে রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, করোনা আক্রান্তদের সকলেই এখনও ভালো আছেন। এদের মধ্যে একজন কর্মকর্তা পর পর দুইবার নমুনা পরীক্ষায় নেগেটিভ হওয়ায় তাকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়েছে। ২৪ জন আক্রান্তের মধ্যে তিনিই প্রথম আক্রান্ত হয়েছিলেন। অন্যদের ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখা হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি বা অবনতি হলে প্রয়োজনে তাদের আইসোলেশনে রাখা হবে বা হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ