বৃহস্পতিবার ০৬ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনা নীতির স্ববিরোধিতা: একদিকে ছুটি বৃদ্ধি অন্যদিকে লকডাউন দারুণভাবে শিথিল

আসিফ আরসালান : বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ নিয়ে সরকারের কি সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি রয়েছে? গত ৮ মার্চ করোনার প্রথম সংক্রমণের পর ২ মাস ৭ দিন, অর্থাৎ ৬৭ দিন পার হয়ে গেলো।  এই ৬৭ দিনে করোনা বিষয়ে সরকারি কার্যকলাপ দেখে এই প্রশ্ন মনে এলো। কেন মনে হলো সেটা পরে বলছি। কিন্তু তার আগে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই। শুক্রবারের দুই একটি পত্রিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। খবরটিতে বলা হয়েছে যে সুইডেনের একটি কোম্পানীর নাম ‘রোশ’।  এই কোম্পানিটি একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছে। সেই যন্ত্র বা কিট দিয়ে মানুষের রক্ত পরীক্ষা করা হবে। সেই পরীক্ষায় জানা যাবে যে মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি আছে কিনা। এই পরীক্ষায় একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় জানা যাবে। সেটি হলো, পরীক্ষিত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতখানি। অর্থাৎ করোনাভাইরাস শরীরে ঢোকার আগে অথবা পরে তার শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে কিনা। এই  এন্টিবডি নিয়ে পাঠক মহলে যাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয় সেজন্য একটি বিষয় পূর্বাহ্নেই বলে রাখা দরকার। ইতোমধ্যেই পাঠকরা জেনে গেছেন যে যারা করোনায় আক্রান্ত হন তাদের মধ্যে যারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের শরীরে সুস্থ হওয়ার পর এন্টিবডি তৈরি হয়। (এই এন্টিবডি দিয়ে করোনা রোগীর পরীক্ষামূলক ট্রিটমেন্ট গত শনিবার থেকে বাংলাদেশে শুরু হওয়ার কথা। সে কথায় আমি একটু পরে আসছি।) সেই এন্টিবডির কথা এখানে বলা হচ্ছে না। এখানে যে এন্টিবডির কথা বলা হচ্ছে সেটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির করোনা শনাক্ত হওয়ার আগেই রক্ত পরীক্ষা করে বোঝা যাবে যে সে করোনায় আক্রান্ত কিনা এবং ইতোমধ্যেই তার শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়ে রয়েছে কিনা।
শুক্রবারের পত্র-পত্রিকায় খবরে আরো প্রকাশ, আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই এই পরীক্ষা পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এই পরীক্ষা পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছে কিনা সেটি অবশ্য পত্রিকার খবরে বলা হয়নি। ইংল্যান্ড ইতোমধ্যেই এই যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষার জন্য ১ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড ব্যয় করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানী করেছে। অপর একটি বাংলা দৈনিকের খবরে প্রকাশ, আমেরিকার নিউইয়র্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় ইতোমধ্যেই ব্যাপক এন্টিবডি টেস্ট শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজস্ব পদ্ধতিতে এন্টিবডি টেস্টের কিট উদ্ভাবন করেছে। এই কিট দিয়ে তারা ইতোমধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের নমুনা পরীক্ষা শুরু করেছে এবং এভাবেই তারা করোনাভাইরাস আক্রমণ সফলভাবে মোকাবেলা করেছেন।
আমি এ পর্যন্ত গণস্বাস্থ্য উদ্ভাবিত কিট নিয়ে কিছু বলিনি। আজও বলছিনা। এই কিটের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে আইইডিসিআর বলেছে যে বর্তমানে পৃথিবীর কোথাও এন্টিবডি টেস্ট হয়না, সর্বত্র পিসিআর মেশিন দিয়ে সোয়াব টেস্ট করা হয় সেই কথা ঠিক নয়। এতক্ষণ ধরে ওপরে আমরা যে সব ঘটনার উল্লেখ করলাম, সেসব ঘটনা থেকেই প্রমাণ হয় যে শুধুমাত্র সোয়াব টেস্ট নয়, রক্ত পরীক্ষা দিয়েও করোনা শনাক্ত করা হয়। আগেই বলেছি যে গণস্বাস্থ্যের কিট সম্পর্কে আমাদের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো বক্তব্য নাই। কিন্তু তাদের কিট ব্যবহারযোগ্য কিনা, সেই ‘এফিকেসি টেস্ট’ এতদিনে হওয়া উচিত ছিলো। এভাবে কালক্ষেপণের কোনো অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়না। যদি তাদের উদ্ভাবিত টেস্ট করোনা শনাক্ত করার যোগ্য বলে বিবেচিত হতো তাহলে ইতোমধ্যেই একাধিক লক্ষ ব্যক্তির টেস্ট সম্পন্ন হতো এবং করোনা শনাক্তের কাজ  এগিয়ে যেতো। আমাদের মতামত হলো এই যে পিজি হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ যখন এফিকেসি টেস্টের জন্য কিট গ্রহণ করেছেন তখন কাল বিলম্ব না করে এই টেস্ট সম্পন্ন হওয়া উচিত। তারপর আসবে ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনের কথা।
॥দুই॥
যে কথা দিয়ে আমরা এই কলাম শুরু করেছিলাম সেখানে যাচ্ছি। আমাদের প্রশ্ন ছিলো, করোনা সম্পর্কে সরকারের কি সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি রয়েছে? প্রশ্নটি এ জন্যই ওঠে যে দেশে করোনা পরিস্থিতির যত অবনতি ঘটছে সরকারের লকডাউন ততই শিথিল হচ্ছে। আবার একদিকে লকডাউন শিথিল হচ্ছে, অন্যদিকে ছুটি বাড়ানো হচ্ছে। মোটামুটি সকলেই বলছেন যে সরকারের এই নীতি পরস্পর বিরোধী। ১৬ মে পর্যন্ট যে ছুটি ছিলো সেটি বাড়িয়ে করা হয়েছে ৩০ মে। অর্থাৎ ১৪ দিন ছুটি বাড়ানো হলো। ঐদিকে আবার গত ২৬ এপ্রিল থেকে গার্মেন্টস এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কারখানা খুলে দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ৬০০০ এর বেশি পোশাক কারখানা পূর্ণদ্যমে উৎপাদন শুরু করেছে। ২৬ এপ্রিল থেকে যেসব পোশাক কারখানা খুলেছে সেই সব কারখানায় ইতোমধ্যেই ৭৮ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক নবনিযুক্ত ৫ হাজার নার্সের এক সংবর্ধনা সভায় বলেন, সরকার ‘সীমিত আকারে’ কলকারখানা এবং ব্যবসা বাণিজ্য খুলে দিয়েছেন। এই কারণে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ বেড়েছে। জনগণের জীবিকার জন্যই সীমিত আকারে কলকারখানা এবং ব্যবসা বাণিজ্য খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।  তিনি বলেন, জনগণ অযথাই বাইরে ঘোরাফেরা করে। কলকারখানা এবং ব্যবসা বাণিজ্য খুলে দেওয়ার জন্যই সংক্রমণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এটি না করেও তো উপায় ছিলোনা। একই সঙ্গে তিনি একথাও বলেন যে সংক্রমণ যতখানি বৃদ্ধি পাচ্ছে তার ফলে বাংলাদেশের ক্ষতি সামান্যই হবে। কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কম। কারণ  সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অতি শীঘ্রই এই পরীক্ষা দৈনিক ১০ হাজারে উন্নীত করা হবে। তারপর যত শীঘ্র পারা যায় এই সক্ষমতা ১৫ হাজারে উন্নীত করা হবে। আমাদের মনে হয়, সরকার এখনও পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারেনি। যতই দিন যাচ্ছে ততই সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ১৫ মে যখন এই কলামটি লিখছি তখন আক্রান্তের সংখ্যা ১২০৪ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৫। বিগত ৮ মার্চ থেকে শুরু করে এপর্যন্ত (১৪মে) ৬৬ দিনে এই সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার সর্বোচ্চ। ৯ মে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিলো ৬৬৩, সেখানে ১৪ মে প্রায় দ্বিগুণ অর্থাৎ ১২০২। এর কারণ খুব পরিস্কার। একদিকে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা বৃদ্ধি, অন্যদিকে গার্মেন্টস খুলে দেওয়া উপলক্ষে কয়েক লক্ষ শ্রমিকের দুই দফা গাঁদাগাদি ঠাসাঠাসি করে ঢাকায় আগমন। অন্যদিকে দোকানপাট এবং ব্যবসা বাণিজ্য খুলে দেওয়া। আরো অবাক ব্যাপার হলো এই যে এসব খোলার সাথে সাথে লকডাউনের কঠোরতাও যেন উধাও হয়েছে। শুধুমাত্র বাস ছাড়া হেন পরিবহণ নাই যেটা রাস্তায় না চলছে। ঢাকা মহানগরীর বেশ কয়েকটি স্থানে দেখা গেছে যে যানবাহনের ভীড় নিয়ন্ত্রণের জন্য অনেক স্থানেই ট্রাফিক পুলিশকে রাস্তায় নামতে হয়েছে।
॥তিন॥
সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে যাচ্ছে। ৩০ মে পর্যন্ত ছুটি বৃদ্ধি করাটা হলো সপ্তম দফা ছুটি বৃদ্ধি। এই সব ছুটির উদ্দেশ্য হলো, লোকজন ঘরে থাকুক কিন্তু তার পাশাপাশি সচিবালয়সহ অফিস আদালত খুলে দেওয়ায় ছুটি দেওয়া বা লকডাউনের উদ্দেশ্যই বানচাল হওয়ার উপক্রম। একদিকে দফায় দফায় ছুটি বাড়ানো হচ্ছে অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোরতা শুধুমাত্রই শিথিলই হচ্ছে না, একেবারে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। আমার পরিচিত একাধিক ব্যক্তি গত ৩/৪ দিনে বিভিন্ন  জেলা থেকে ঢাকা এসেছে। কেউ চট্টগ্রাম থেকে, কেউ পাবনা থেকে, কেউ সুদূর নীলফামারি থেকে। কেউ প্রাইভেট কারে, কেউ ট্রাকে, কেউ ইজি বাইক এবং কেউ সিএনজি করে। কি লাভ হলো তাহলে দুই মাসেরও বেশি সময় ছুটি দিয়ে?
লকডাউন উঠিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে শুধুমাত্র বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষিত সচেতনই সমাজই বলছেন না, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞও বলছেন। তিনি এখন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংক্রমণ বিশেষজ্ঞ এবং ইম্মিউনোলজিস্ট স্পোশালিস্ট। নাম এ্যান্থনী স্টিভেস ফাউচি। তিনি এখন সমগ্র বিশ্বের একটি শ্রদ্ধেয় নাম। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর মোতাবেক, যতদিন পর্যন্ত করোনা মোকাবেলার সক্ষমতা মার্কিন প্রশাসনের না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত লকডাউন না উঠানোর পরামর্শ দেন তিনি। ফাউচি বলছেন, লকডাউন উঠানোর সিদ্ধান্ত নিলে আমেরিকাকে মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে। লকডাউন ওঠালে করোনার প্রভাবও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। লকডাউন ওঠানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগকে তিনি বলেন, যে কাজটিতে মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে, তেমন একটি কাজকে, অর্থাৎ করোনার সংক্রমণকে আপনিই ছড়িয়ে দেওয়ার মত কাজ করছেন। যদি আপনি তাই করেন তাহলে সামনের দিনগুলোতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। তখন আপনি যত চেষ্টাই করুন, ভাইরাসের আক্রমণকে ঠেকাতে পারবেন না। তারপরেও, ক্ষীণ হলেও লকডাউন ওঠানোর পক্ষে তাদের একটি যুক্তি আছে। সেটি হলো, আমেরিকা বলছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এক কোটি লোককে তারা টেস্ট করবে। অন্যদিকে চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানে নতুন করে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। অবশ্য চীন বলছে যে চীনের বাইরে থেকে যারা আসছে তারাই এই সংক্রমণের বাহক হচ্ছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে তারা উহানের ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের প্রত্যেককেই পরীক্ষা করবে। সেই সক্ষমতা কি বাংলাদশের আছে?
লকডাউন সম্পূর্ণ প্রত্যাহার নয়, আংশিক শিথিল করার বিষময় পরিণতি ভোগ করছে ভারত। গত ২৫ এপ্রিল তাদের আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৭ হাজারেরও কম। কিন্তু লকডাউন শিথিল করার পরে সেটি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৮২ হাজার ২৬৪ জনে। ভারতের প্রদেশ ওয়ারী আক্রান্তের সংখ্যা রয়েছে আমার কাছে। তবে অত পরিসংখ্যান দিয়ে পাঠকদের ভারাক্রান্ত করতে চাই না। শেষ করার আগে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে চাই যে বাংলাদেশে লকডাউন এভাবে পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে নেওয়া গুরুতর পরিণতি সরকার সামাল দিতে পারবে তো?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ