সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

সাতক্ষীরায় ২০ হাজার দোকান কর্মচারীর মানবেতর জীবন

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা : বকেয়াসহ বেতনের আশায় সাতক্ষীরায় ২০ হাজার দোকান কর্মচারী অপেক্ষার প্রহর গুণছেন। জেলা প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী গতকাল  শনিবার সকাল থেকে জেলা শহরের বেশির ভাগ দোকান পাট বন্ধ ছিল। মালিক পক্ষ দোকান পাট বন্ধ রাখলেও বেতনের আশায় কর্মচারীরা বন্ধ দোকানের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা দেয়। কর্মচারীদের দাবি দোকান না খুললে তাদের বেতন দেবে না। বেতন না পেলে তারা খাবে কি। শত শত কর্মচারিরা দোকান পাটের সামনের ফটক ঘিরে রাখে। তাদের আশা হয়তোবা ঈদ উপলক্ষে তাদের কর্মস্থল খুলে দেয়া হবে। কয়েক জন কর্মচারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের কয়েক মাসের বেতন বাকি। আবার অনেকের বেতন বন্ধ করে দিয়েছে। কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে চলেও গেছে। ঈদেরে সময় দোকানপাট খুললে মালিক পক্ষ কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করে থাকে এবছর করোনার কারণে সেটাও হল না। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মচারীরা। আর মালিক পক্ষ বলছে তাদেরও বিপুল পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে। দোকানের  দশ জনের মত কর্মচারীর সাথে কথা হয়। তারা জানান,সরকারের কোন সহযোগিতা তারা পায়নি। এখন খাব কি আর ঈদ করবো কি দিয়া। সরকারি নির্দেশে গত ২৪ মার্চ থেকে সারা দেশের ন্যায় সাতক্ষীরাতেও সব দোকানপাট বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে দোকান কর্মচারীরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। টানা প্রায় দুই মাস ধরে দোকানপাট বন্ধ থাকায় দোকান কর্মচারীরা প্রবল অর্থকষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে গত রোববার থেকে সাতক্ষীরাতে  পোশাক, প্রসাধনী, জুতা, অফিস স্টেশনারি, হার্ডওয়্যার, নির্মাণসাসগ্রী, ইলেকট্রিক দ্রব্য যন্ত্রপাতি খাদ্য পণ্যসহ বেশিভাগ দোকান পাট খুলতে দেখা যায়। এতে শহরের মার্কেটগুলোতে ঘুরে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। সামজিক দূরত বজায় রাখা, জীবানুনাশক ব্যবহার করা, মাক্স ও হ্যান্ডগ্লাভস ব্যবহার করাসহ মোট আটটি শর্তের বেশির ভাগই  কেউ মানেনি।
বিক্রেতারা বলছেন, আমরা নিরুপায় আর ক্রেতারা সচেতন নয়। অন্যদিকে, ক্রেতারা বলছেন প্রশাসনিক কোনো নজরদারি ছিল না মার্কেটগুলোতে। ফলে গত শুক্রবার থেকে দোকান পাট ও সামাজিক দূরাত্ব নিশ্চিত করতে  কঠোর অবস্থান নেয় জেলা প্রশাসন। যদিও ছুটির দিন থাকায় শহর তুলনা মূলক ফাঁকা ছিল। তবে গতকাল শনিবার ও প্রায় একই চিত্র। সড়কে মানুষের উপস্থিতি অনেটাই বেশি।
তবে শহরের পাশবর্তি বাজার ও গ্রাম এলাকার বাজার গুলোতে দোকান পাট খোলা আছে আগের মতই।
শহরের প্রবেশ পথ গুলোতে বসানো হয়েছে প্রশাসনের নিরাপত্তা বলায়। বাইরের জেলা থেকে জরুরি প্রয়োজনে ছাড়া কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। এমন কি অভ্যন্তরিণ উপজেলা গুলোতে ও জনচলাচলে বিধি নিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এর পরও মানুষ সামাজিক দূরত্ব না মানলে ঈদের পর কারফিউ জারির মত কঠোর বিধি নিষেধ আসতে পারে। 
 সোহাগ,জুতার দোকান লিবাটিতে কাজ করেন। শনিবার সকাল থেকে তারা দোকানে এসে শুনতে পায় দোকন খুলবে না। দোকানের সামনে দাড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থেকে এ প্রতিবেদকে জানায়,ভাই  দোকান না খুললে খাবো কি। চলবো কি করে। সরকার আমাকে কে কিছুই দেয়নি। তার মত অবস্থা আরো অনেকেরই।
 নাইম। কামাল নগরের বাসিন্দা। বাপ বেটা মিলে ইসলামিয়া মার্কেটের সামনে ঝাল মুড়ি,ফুচকা বিক্রি করে সংসার চালাতো। গত দুমাস ধরে দোকান বন্ধ থাকায় তাদের মুখের শেষ  হাসি টুকুও নিভে গেছে। একই অবস্থ শহরের হোটের রেষ্টুরেন্টের কর্মচারীদের।
টানা প্রায় দুই মাস ধরে দোকানপাট বন্ধ থাকায় অধিকাংশ কর্মচারীই কোনো বেতন পাননি। অল্প কিছু দোকান মালিক তাঁদের কর্মচারীদের অর্ধেক বা আংশিক বেতন দিয়েছেন। বেচাকেনা না থাকায় ছোট ও মাঝারি ধরনের দোকানমালিকেরাও অর্থসংকটে পড়েছেন। এই পরিস্থিতিতে কর্মচারীদের পুরো বা আংশিক বেতন দেওয়াও অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ফলে দোকান কর্মচারীরা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাঁরা ত্রাণ বা সাহায্যের জন্য পথে নেমে হাত পাততে পারছেন না, আবার পাড়া মহল্লায় দুস্থদের যে সাহায্য দেওয়া হচ্ছে, তাও পাচ্ছেন না।
 জেলাতে দোকান কর্মচারির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারের মত। তাদের জন্য কোনো মজুরি বোর্ড নেই, সে কারণে তাঁদের ন্যূনতম মজুরিও নির্ধারিত নেই। বহুদিন ধরে তাঁরা এসব নিয়ে আন্দোলন করছেন বলে জানালেন। এই আন্দোলনের ফলে ১৯৯৭ সাল থেকে দোকান কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি দেওয়ার আইন করা হয়েছে। তবে করোনাকালের এই ভয়াবহ সংকটে সার্বিক দিক বিবেচনা করে অন্তত দোকান কর্মচারীদের ঈদের বোনাস না হলেও বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য তাঁরা মালিকদের প্রতি আহ্বান  জানান।
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্থফা কামাল জানান , সাতক্ষীরা জেলার সকল উপজেলায় কর্মহীন বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মাঝে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা অব্যাহত আছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ৯৬০২২ জনকে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে, বাস পরিবহন শ্রমিক ৬২৯৪ জন, স্থলবন্দর শ্রমিক ২২০০ জন , ইজি বাইক চালক ২৯৪৩ জন, ভ্যান চালক ১০৯২৬ জন, মাহিন্দ্র চালক ১৭৩১ জন, দিনমজুর ১৫৯৭৪ জন ও কৃষি শ্রমিক ৪৪৫৬ জনকে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া, নরসুন্দর ১২৮০ জন, হরিজন ১৯১৮ জন, পরিছন্ন কর্মী ১২১৫ জন, হিজড়া ১৮০ জন, বেদে ৬২৯ জন, মুন্ডা ৬৯৩ জন, প্রতিবন্ধী ৬৫৫৭ জন, চা দোকানি ৫২২৬ জন, মধ্যবিত্ত ২৭৭১৩ জন, জেলে ৪৬০৭ জন, ঋষি ১৫০৭ জনকে সরকারি সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ