বৃহস্পতিবার ০৪ জুন ২০২০
Online Edition

লকডাউনের মধ্যেও লোডশেডিং ॥ অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী

স্টাফ রিপোর্টার : করোনায় শিল্প-কারখানা ও অফিস-আদালত বন্ধ থাকার পরও রাজধানীতে লোডশেডিং বেড়েছে। বৈশাখের প্রচণ্ড তাপদাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দফায় দফায় লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন নগরীর বাসিন্দারা। করোনার লকডাউনের কারণে লোডশেডিং চলাকালে যেমন বাইরে বের হওয়ার উপায় নেই, তেমনি প্রচণ্ড গরমে ঘরের ভেতর থাকাও কঠিন। এই পরিস্থিতিতে ভোগান্তির শিকার হওয়া বাসিন্দারা বলছেন, মনে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগও করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। এ কারণে সবকিছু বন্ধ থাকার পরও লোডশেডিং বেড়েছে।
সম্প্রতি লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর কাছেও অভিযোগ গেছে অনেক। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যাপারে কথা বলতে তিনি গত সোমবার বাসা থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল সভা করেছেন। ওই সভায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, অনেক জায়গা থেকেই লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এই সময়ে এ ধরনের অভিযোগ খুবই অনাকাক্সিক্ষত। গ্রীষ্মকালে পিক আওয়ারে ৯ হাজার মেগাওয়াট চাহিদা হলেও বর্তমানে গড়ে ৬-৭ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগছে। তবুও কেন লোডশেডিং হবে?
হঠাৎ রাজধানীতে লোডশেডিং বেড়ে গেলেও ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকাশ দেওয়ান দাবি করেন, আমাদের এখন আর কোনো লোডশেডিং নেই। সরবরাহ ব্যবস্থা ভালো। গ্রীষ্মকালে স্বাভাবিক নিয়মেই মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হয়। এতে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সরবরাহে কিছুটা সমস্যা হয়। আমরা দ্রুতই তা সমাধানের চেষ্টা করি। রমজানের মধ্যেও বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। করোনার কারণে রাজধানীসহ দেশের সব শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবই বন্ধ রয়েছে। সার্বিকভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার কম হচ্ছে। কিন্তু তারপরও গত কয়েক দিনে হঠাৎ করেই লোডশেডিং বেড়েছে। অথচ এমনটি হওয়ার কথা না। জানা গেছে, রাজধানীর মগবাজার  রামপুরা, পূর্ব রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদা, মিরপুর, হাজারীবাগ,  এলাকায় সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা পর আসে। আবার কখনো কখনো দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং থাকছে। দিনে কয়েক দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় নগরীর বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন।
মধ্য বাসাবো এলাকার বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার প্রমি সরকার জানান, গত বেশ কয়েক দিন ধরেই বাসাবো এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। দিনে ৩-৪ বার লোডশেডিং হচ্ছে। দফায় দফায় লোডশেডিংয়ের ফলে প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা দায়। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির মটর চালানো যাচ্ছে না। এ কারণে পানির সমস্যাও হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে। যদি তাই হয় তাহলে এখন লোডশেডিং কেন?
রাজধানীর পূর্ব রামপুরা এলাকার গৃহবধূ সানজিদা সুলতানা জানান, ওই এলাকায় গত বুধবার কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়েছে। রাতেও ২ ঘণ্টার মতো লোডশেডিং ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবারও কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়েছে।
খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা আবদুল হাকিম জানান, তার এলাকাতেও গত কয়েক দিনে লোডশেডিং বেড়েছে। গত বুধবার খিলগাঁও এলাকায় একটানা ২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়েছে। এরপর আবারো ১ ঘণ্টাসহ মোট ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবারও সকাল পৌনে ১২টা থেকে কয়েক দফায় লোডশেডিং হয়েছে। লোডশেডিংয়ে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করছে, করোনার কারণে কল-কারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ব্যবহার কিছুটা কমলেও তাদের উৎপাদন আগের মতোই রয়েছে। তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে কদাচিৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনে হেরফের হয়। এছাড়া আবহাওয়ার কারণেও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। এসব ক্ষেত্রে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এর বাইরে পুরাতন সাব-স্টেশনগুলোতে কখনো কখনো যন্ত্রাংশে সমস্যা দেখা দেয়। এ রকম কারিগরি সমস্যা যে কোনো সময় হতে পারে। হঠাৎ কালবৈশাখী হলেও ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হয়ে একটি বড় এলাকা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে। এসব কারণেই কোথাও কোথাও লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে গ্রিড সাব-স্ট্রেশনগুলো নিয়মিত মেরামতের মাধ্যম সচল রাখা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অঘোষিত লকডাউন চলছে দেশজুড়ে। বন্ধ রয়েছে বেশির ভাগ কল-কারখানা। এই অবস্থায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিদ্যুতের চাহিদা অনেক কম। তবুও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ঘটছে লোডশেডিংয়ের ঘটনা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
লোডশেডিংয়ের বিষয়টিকে অনাকাক্সিক্ষত জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পিক আওয়ারে নয় হাজার মেগাওয়াট চাহিদা হলেও গড়ে ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগছে। তবুও কেন লোডশেডিং হবে?
সম্প্রতি  বিদ্যুৎ বিভাগের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেন প্রতিমন্ত্রী। সেখানে তিনি এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরাও কেউ কেউ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে একমত হয়ে বলেছেন, এখন চাহিদা কম। উৎপাদন ভালো আছে। তারপরও লোডশেডিং কাম্য নয়।
এসময় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন প্রতিমন্ত্রী।
সভায় মহামারির সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান, বিভিন্ন সময়ে করা চুক্তিগুলো ও এর আওতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে দ্রুত গ্রাহকদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
রোস্টার করে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানিকে নির্দেশ দেন নসরুল হামিদ বিপু। তিনি বলেন, আগামীতে ঝড়-বৃষ্টি হবে, সচেতন থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে বিদ্যমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স নামক কোম্পানি করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, যৌথ বিনিয়োগে এরূপ কোম্পানি হলে আমাদের সক্ষমতা অনেক বাড়তো। তিনি এ সময় গ্রিড সাব স্টেশনগুলো নিয়মিত মেরামতের নির্দেশ দেন।
একটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, এখন চাহিদা কম। উৎপাদনও ঠিক রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে লোডশেডিং হওয়াটা কাম্য নয়। সাধারণত বিতরণ ত্রুটির জন্যই এমন হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে ঝড় বৃষ্টির কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সমাধান করার। তিনি বলেন, লকডাউন চলছে এরমধ্যে বিদ্যুৎকর্মীরা করোনার ভয়ও পাচ্ছেন। কিন্তু আমরা নির্দেশ দিয়েছি বিতরণ ত্রুটি দ্রুত সারিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ