ঢাকা, শনিবার 6 June 2020, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ১৩ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী
Online Edition

সিলেট অঞ্চলে বোরো ধান কাটা শেষ: গোলায় তুলতে ব্যস্ত কৃষাণ-কৃষাণী

কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো: মহামারী করোনা ভাইরাসে যখন গোটা দেশ আতংকিত, দেশের অর্থনীতি যখন স্থবির। জাতির সেই দুঃসময়ে আশার আলো জাগিয়েছে কৃষি প্রধান বাংলাদেশের বোরো ধান। বৃহত্তর সিলেট বিভাগে বোরো ধানের বাম্পার ফলন কৃষকের মুখে শুধু হাসি ফুটায়নি, দেশের অর্থনীতির জন্য আশির্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশাখ মাস শুরুর দুএকদিন আগে থেকে সিলেট বিভাগে শুরু হয় বোরো ধান কাটা। বৈশাখ মাস শেষ হওয়ার আগেই সিলেট বিভাগের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে ধান কাটা। বৈশাখের শেষ সময়ে এসে মাড়াই খলা থেকে  গোলায় ধান ভরতে এবং গরু সগ গবাদি পশুর খাবার খড় তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাওরাঞ্চলের কৃষান-কৃষানী।

সরেজমিনে ঘুরে ও কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বন্যার পানি না আসা, অতিবৃষ্টি না হওয়া এবং শীলাবৃষ্টি না হওয়ায় সিলেট অঞ্চলে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। এবারের বোরো ধান ইতোমধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে স্বল্প সময়ের মধ্যে ধান কাটার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেয়া হয়। লকডাউন চলাকালিন সময়েও ধান কাটার লোকদের যাতায়াত স্বাভাবিক রাখা হয়। যদিও আতংকের কারণে অনেক জায়গার ধান কাটার লোক এবছর ধান কাটা থেকে বিরত রয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী ব্যবস্থাপনায় ধান কাটার মেশিন সরবরাহ করায় এবছর ধান কাটার শ্রমিকের সংকট থাকা স্বত্তেও যথা সময়ে ধান কাটা শেষ করা সম্ভব হয়েছে। 

সরেজমিনে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাওরে গিয়ে দেখা যায়,  হাওর পাড়ে ‘খলা’য় কড়া রোদে কিষাণ-কৃষাণী ধান শুকিয়ে মাড়াই দিয়ে গোলায় উঠাচ্ছেন। সেই দৃশ্য মনোহর। অনেকেই বলেছেন, ‘তা সম্ভব হয়েছে করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের সময়োচিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ফলে।’ কৃষকদের বক্তব্য, গত ১০ বছরেও প্রাকৃতিকে এমন সদয় হতে দেখা যায়নি। সিলেটের চার জেলার সাড়ে ১৩ লাখ কৃষি পরিবারের মুখে এখন হাসি ফুটেছে। এবারও যে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের আশঙ্কা ছিলনা যে তাও নয়।

‘তবে শেষতক আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কোন ধান নষ্ট হয়নি’-এই মন্তব্য করে কৃষকরা বলেন, ‘এবার আমাদের বড় পাওনা দুটি: সমুদয় ধান ঘরে তোলা। আর ধান কাটার শ্রমিক সংকটের সমাধান।’

কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, সিলেটে এক লাখ ৬২ হাজার ধান কাটার শ্রমিক ও কৃষকের সাথে প্রশাসন সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবীরাও ধান কাটায় যুক্ত ছিলেন।

এদিকে সিলেটের কৃষকরা অধিক পরিমাণে বোরো ধান ঘরে তুললেও পুরোপুরি খুশি হতে পারছেনা না সরকার নির্ধারিত ধানের মূল্যে। গত বছর সরকার ধান কিনে মণ প্রতি ১ হাজার ৪০ টাকা দরে। এবারও একই দাম।

হাওর, পরিবেশ ও কৃষি বান্ধব ব্যক্তিত্ব কাশমির রেজা বলেন, সরকারিভাবে ধানের মূল্য বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল। বেশী পরিমাণে ধান না কিনলে ফরিয়া ও মধ্যস্বত্তভোগীরা কম দামে ধান কিনে মজুদ করবে। জানা যায়, বর্তমানে ধানের মূল্য প্রতিমণ ৭০০-৭৫০ টাকা।

কৃষি বিভাগ জানায়, সিলেট বিভাগে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ হেক্টর বোরো আবাদ হয়। এ থেকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ২০ লক্ষ মে.টন ধান। কিন্তু এবার যে পরিমাণ ধান উৎপন্ন হয়েছে। সে তুলনায় সরকারের ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক কম। এতে কৃষকরা অসন্তুষ্ট।

সিলেট আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, এবার সিলেট বিভাগে ৫৪ হাজার ২৭৮ মে.টন ধান কেনা হবে সরকারিভাবে। এর মধ্যে সিলেটে ৫ হাজার ৯৯৩ মে.টন, মৌলভীবাজারে ৬ হাজার ৬১৮ মে.টন, হবিগঞ্জে ১৫ হাজার ৮০১ মে.টন এবং সুনামগঞ্জ জেলা থেকে ২৫ হাজার ৮৬৬ মে.টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। 

জানা যায়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সিলেটে বোরো ফসলটিই প্রধান। তবে তা ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রকৃতি নির্ভর। কৃষি বিভাগ জানায়, বোরো ঘরে উঠলে সিলেটের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে বছরে সাড়ে ১৪ লক্ষাধিক মে.টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে বছরে। সারা দেশে সিলেটের খ্যাতি শস্যভা-ার হিসাবে। ফসলটি ঘরে তুলতে প্রতি বৈশাখের শুরুতেই পাহাড়ি ঢল, বৃষ্টি ও বন্যার সাথে যুদ্ধ করতে হয় সিলেটবাসীকে। প্রকৃতি সদয় হলে অনেক সময় ফসল ঘরে উঠে। নতুবা ধানের গোলা বেদনায় পূর্ণ হয়। খোরাকির সংকট দেখা দেয়। এবার করোনায় সৃষ্ট নতুন সংকটে বৈশাখের শুরুতেই ধান কাটার শ্রমিকের অভাব দেখা দেয়। একদিকে বাম্পার ফলন। অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়ার শঙ্কা। কৃষক, স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারেরও উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারী নির্দেশনায় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলাকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও স্বেচ্ছাসেবীগণ কৃষকের ধান কাটতে নামেন। বাহিরের জেলা থেকে ধান কাটর শ্রমিক এনে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে সবাই ধান কাটতে নামেন। সিলেট বিভাগে হাওরের ধান কাটতে মোট ৩৬২টি কম্বাইন হারভেস্টার ও এক হাজার ৫৬টি রিপার দেয়া হয়। সুনামগঞ্জের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় ১১০ টি হারভেস্টার ও ১০০ রিপার যন্ত্র সুনামগঞ্জের হাওরে কাজ করে। এতে কৃষক কম খরচে দ্রুত ধান কেটে ফেলেন।

কৃষকরা জানান, যন্ত্র দিয়ে ধান কাটলে শীষ থেকে ধান জমিতে পড়েনা এবং পরিবহনেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়না।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ বলেন, বৃহত্তর সুনামগঞ্জে কৃষকরা এখন হাওরে ধান শুকাচ্ছেন, মাড়াই দিচ্ছেন। তাদের মুখে এখন হাসি ফুটেছে।

জানা যায়, সিলেটের  অঞ্চলেল হাওরে বোরো ধান কাটা শতভাগ শেষ হয়েছে। খুব কম জায়গায় মাড়াই খলা তে ধান শুকানো হচ্ছে এবং গবাদি পশুর খাবার খড়কুটো শুকানো হচ্ছে। দুয়েক দিনের মধ্য ধান ও খড় গোলায় তোলা শেষ হয়ে যাবে।

এব্যাপারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ শ্রীনিবাস দেবনাথ বলেন, সিলেটে উচু জমি ও হাওরে নি¤œাঞ্চলের জমিতে বোরো মৌসুমে চার লাখ ৭৪ হাজার ১৯৫ হেক্টর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে কেবল হাওর অঞ্চলে দুই লাখ ৬৯ হাজার ২৮৯ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। সিলেট অঞ্চলে এর মধ্যে আজ পর্যন্ত শতভাগ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছিল। এজন্য ধান ৭০-৮০ শতাংশ পাকার পরপরই কৃষকদের ধান কাটার পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া এ বছর পর্যাপ্ত শ্রমিক থাকায় দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে।

২০১৬ সালে অকাল বন্যায় এ অঞ্চলের ৬০ ভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে, আজ পর্যন্ত সে রকম বৃষ্টি বা উজানের ঢল লক্ষ্য করা যায়নি।

কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সিলেটে এক লাখ ৬২ হাজার শ্রমিক ধান কাটায় নিয়োজিত। পাশাপাশি স্বেচ্ছাশ্রমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ তাদেরকে সহযোগিতা করছেন।

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরো জানায়, সিলেট অঞ্চলে এবার ১৮ লাখ ৬৪ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চার জেলায় বোরোর আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। আবাদ হয়েছে চার লাখ ৭৪ হাজার ১৯২ হেক্টর জমিতে।

হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জে এবার দুই লাখ ১৯ হাজার ৩শ’ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। হবিগঞ্জ জেলায় আবাদ হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার ৮শ’ হেক্টর জমিতে। সিলেট জেলায় আবাদ হয়েছে ৮০ হাজার ৫৬৫ হেক্টর ও মৌলভীবাজার জেলায় ৫৩ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে।

ডিএস/কেএ/এএইচ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ