বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

কভিড-১৯ : বিপর্যস্ত দুনিয়ার মুক্তির উপায় ও করণীয়

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম : মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। কারণ তা এমন এক অব্যক্ত জিনিস, যা ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি ভিন্ন হয়। এজন্য বলা হয়, মানুষের কষ্ট দেখাটাই বড় কষ্টের। যারা প্রকৃত মানুষ, তারা ব্যথা অনুভব করেন হৃদয় দিয়ে। করোনায় গোটা দুনিয়া আজ স্তব্ধ! মৃত্যুর মিছিল প্রতিদিনেই দীর্ঘ হচ্ছে! মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। থমকে গেছে কোলাহল, দাম্ভিক, ক্ষমতাশালী আর বিত্তবানদের অহংকার! প্রতাপশালী আর বিত্ত-বৈভব আর প্রাচুর্যের অধিকারীরাও বলে উঠছে! আকাশে যিনি আছেন, তিনিই জানে কী হতে যাচ্ছে! সবাই সমস্যার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে, কিন্তু কোনো কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না! আজ কামান-গোলাবারুদ আর গুলীর আওয়াজ নেই, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। মা জানে না সন্তানের মৃত্যুর খবর! সন্তান থাকতে পারছে না পিতা-মাতার জানাযা নামাজে! সন্তানের দাফন হচ্ছে পিতা-মাতার অনুপস্থিতিতে। সবাই সবার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে!। এ যেন কিয়ামতের সেই দৃশ্য! আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন মানুষ পালাতে থাকবে নিজের ভাই, বোন, মা, বাবা, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের থেকে। তাদের প্রত্যেকে সেদিন এমন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হবে, নিজের ছাড়া আর কারোর কথা তার মনে থাকবে না।’ (সূরা আবাসা : ৩৪-৩৭)।
হয়তো কোনোদিন খুঁজে পাবে না আপনজনের কবরের হদিসটুকুও! জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ভাষায়, ‘ছবি আমার বুকে বেঁধে পাগল হয়ে কেঁদে কেঁদে ফিরবে মরু কানন গিরি সাগর আকাশ বাতাস চিরি, সেদিন আমায় খুঁজবে বুঝবে সেদিন বুঝবে।’ পৃথিবীর এ বোবা কান্নার আওয়াজ আমাদের হৃদয়কে ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের ভাষায় আজ বলতে হয় ‘পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়। মরণ একদিন মুছে দেবে সকল রঙিন পরিচয়... মিছে এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মিছে গান কবিতার ছন্দ। মিছে এই অভিনয় নাটকের মঞ্চে, মিছে এই জয় আর পরাজয়।’ পৃথিবীর তথাকথিত ত্রাণকর্তারাই আজ ধরাশায়ী! কে এগিয়ে আসবে কাকে রক্ষা করতে? কে বাঁচাবে বিশ্বমানবতাকে? নিরুদ্দেশ গন্তব্যে আজকের পৃথিবীর মানুষের এই যাত্রা। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্য-প্রযুক্তির শীর্ষে যাদের বাস, তারাও আজ বার বার আকাশের পানে তাকাচ্ছে-! পারমাণবিক বোমা, মিসাইল, নভোচারী, কামান ড্রোন সবই এখানে ভোঁতা। এই তো কয়দিন আগে বিশ্ববাসী এগুলোর ব্যবহার দেখেছে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখন এসব কোনো কাজেই আসছে না। সবাই আজ দারুণ অসহায়! পৃথিবীর মোড়লদের আজ বড়ই ক্ষমতাহীন লাগছে! এবার সবার আগে করোনার আক্রমণে লণ্ডভণ্ড উন্নত রাষ্ট্রগুলো। এর শেষ যেন সবারই অজানা।
হ্যাঁ, একজনই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। তিনি হচ্ছেন আমার-আপনার আমাদের সকলের সৃৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, যিনি করোনাসহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। ‘ইন্নাল্লাহা আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির’ পৃথিবী, আকাশসমূহ ও সমগ্র জাতির ওপর রাজত্ব আল্লাহরই জন্য নির্ধারিত এবং তিনি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী।’ (মায়িদা : ১২০)। সেই সুপ্রিম পাওয়ার আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে। ফিরে যেতে হবে তাঁরই দিকে। সু-উচ্চকণ্ঠে বলতে হবে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, বলো, হে আল্লাহ! হে বিশ্বজাহানের মালিক! তুমি যাকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা দান করো এবং যার থেকে চাও রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নাও; যাকে চাও মর্যাদা ও ইজ্জত দান করো এবং যাকে চাও লাঞ্ছিত ও হেয় করো। কল্যাণ তোমার হাতেই নিহিত। নিঃসন্দেহে তুমি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী।’ (৩:২৬)। এখন যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন, তাহলে তারা তো আপনার বান্দা আর যদি মাফ করে দেন, তাহলে আপনি পরাক্রমশালী ও জ্ঞানময়। (মায়িদা : ১১৮)। এ সময়ে আমাদের দেশে আজ কী হচ্ছে, তা মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে সবাই জানতে পারছেন। বাংলাদেশের জনগণও এমনি এক কঠিন শঙ্কার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা আল্লাহ ভালো জানেন। তবে সর্বপর্যায়ে চলছে হযবরল অবস্থা। মানবতার এ ক্রান্তিকালে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন এটাই সত্য। আর জমিনে উসিলা হিসেবে জীবনবাজি রেখে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের প্রিয় ডাক্তাররা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে নির্মমভাবে প্রথম জীবন দিয়েছেন।
ডেইলি স্টারের রিপোর্টে প্রকাশ, ‘গত ৮ এপ্রিল যখন কোভিড-১৯ আক্রান্ত ডা. মো. মঈন উদ্দিনকে সিলেট থেকে ঢাকায় রেফার করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে কেন তাকে সিলেটের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) ভর্তি করা হলো না। নাকি সিলেটের আইসিইউ সচল নয়। সে রাতেই জরুরি একটি সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তার মৃত্যুর পর বিষয়টি নিয়ে আবারো আলোচনা শুরু হয়েছে। ডা. মঈন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং এখন পর্যন্ত দেশে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা প্রথম ডাক্তার।’ যিনি এলাকায় গরিবেরর ডাক্তার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসকদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য সরকার সামান্য মাস্ক, পিপিই ব্যবস্থা করতে না পারা দুর্ভাগ্যজনক! এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক ও অপমানকর। দেশ, জাতি ও মানবতার বন্ধু আমাদের প্রিয় ডাক্তার, নার্স ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় আয়োজনে সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। মহান মাবুদের দরবারে দোয়া করি আল্লাহ তাদের রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে রাখুন।
একই সঙ্গে যারা দিন আনে দিন খায় এমন শ্রমিক, নিঃস্ব ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের খাদ্যসামগ্রীসহ অন্যান্য উপকরণ নিশ্চিত করতে খুব বেশি উদ্যোগ নেই রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে পারেছ না। পোশাক শ্রমিকদের ছুটি নিয়ে ঘটে গেল তেলেসমাতি। এখনো চলছে ‘করোনার ঝুঁকির মধ্যেও পোশাক কারখানা বন্ধ করতে চাননি শিল্প মালিকরা। তাতে সায় ছিল সরকারেরও। মূলত মালিকদের পাশাপাশি সরকারের শ্রম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তহীনতা ও সমন্বয়হীনতার কারণেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব না মেনে ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার শ্রমিক ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ফিরেছেন’। (সূত্র : প্রথম আলো)। এটি দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। এটি সাধারণ শ্রমিকদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনির শামিল। অবিলম্বে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকার কার্যকর রেশনের ব্যবস্থা করবে এটি সকলের দাবি। তাছাড়া বিত্তবানরা অসহায় মানুষের প্রতি তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে এটাই সময়ের দাবি।
বিপদে আমি না যেন করি ভয় : করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত গোটা দুনিয়া। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আসে না। যে ব্যক্তি আল্লাহকে বিশ্বাস করে তিনি তার অন্তরকে সুপথে পরিচালিত করেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত রয়েছেন।’ সূরা তাগাবুন, আয়াত ১১।
সারা বিশ্বেও মানুষ এখনও শঙ্কা উদ্বিগ্নতা নিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। আজ যেন দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি, উদ্যানে। কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই, শুধু শূন্যতার এই দীর্ঘশ্বাস, এই দীর্ঘ পদধ্বনি! মুসলমানরা এই বিশ্বাস করে জীবন হচ্ছে মৃত্যুর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী। এ জন্য হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘সব দুঃখের মূল এই দুনিয়ার প্রতি অত্যাধিক আকর্ষণ’। কবি বলেছে, বিপদে মোরে রক্ষা কর এ নহে মোর প্রার্থনা বিপদে আমি না যেন করি ভয়। হযরত সোলায়মান (আ.) বলেছেন, ‘সৎ লোক সাতবার বিপদে পড়লে আবার ওঠে কিন্তু অসৎ লোক বিপদে পড়লে একবারে নিপাত যায়।’ হযরত আবু বকর (রা.) ‘মৃত্যুকে খোঁজা (অর্থাৎ সাহসি হও) তাহলে তোমাদেরকে জীবন দান করা হবে।’
করোনা দুনিয়াকে পাল্টে দিয়েছে : মিশরের একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্য বলেছেন, করোনার ভাইরাসকে ঘৃণা করবেন না। এটা মানবতা ফিরিয়ে এনেছে। মানুষকে তাদের স্রষ্টার কাছে এবং তাদের নৈতিকতায় ফিরিয়ে এনেছে। এটি বার, নাইট ক্লাব, পতিতালয়, ক্যাসিনো বন্ধ করে দিয়েছে। এটি সুদের হারকে কমিয়ে এনেছে। পরিবারের সদস্যদের একসাথে নিয়ে এসেছে। অশ্লীল আচরণ বন্ধ করেছে। এটি মৃত এবং নিষিদ্ধ প্রাণি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এখনও পর্যন্ত এর কারণে সামরিক ব্যয়ের এক তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবাতে স্থানান্তরিত হয়েছে। আরব দেশগুলোতে শিশা নিষিদ্ধ করেছে। করোনাভাইরাস মানুষকে দোয়া করতে বাধ্য করছে। এটি স্বৈরশাসক এবং তাদের ক্ষমতাকে তুচ্ছ করেছে। মানুষ এখন উন্নতি এবং প্রযুক্তির চেয়ে আল্লাহর কাছে উপাসনা করছে। এটি কর্তৃপক্ষকে তার কারাগার এবং বন্দিদের দিকে নজর দিতে বাধ্য করছে। এটি মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে হাঁচি এবং কাশি দিতে হয়, যেমনটি আমাদের নবী (সা.) ১৪০০ বছর আগে শিখিয়েছিলেন, করোনাভাইরাস এখন আমাদের ঘরে সময় কাটানো, সহজ জীবনযাপন করা, অহেতুক প্রতিযোগিতা না করতে শিখিয়েছে। একই সাথে আমাদের চেতনা জাগ্রত করার জন্য এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমা ও সাহায্য প্রার্থনা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে শোকর জানাচ্ছি। যারা জ্ঞানি তাদের জন্য এতে একটি দুর্দান্ত মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। (তথ্য ইন্টারনেট)
হাত মুখ ধোয়ার পরামর্শ ইসলাম দিয়েছে : সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একেএম বদরুদ্দৌজা চৌধুরী লিখেছেন, ‘আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজশন (ডাব্লিউএইচও) কোটিভ-১৯ মোকাবিলায় প্রধান অস্ত্র হিসেবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। গড়গড়ার সঙ্গে কুলি করতে বলছে। পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করতে বলছে। মুখ ধুতে বলেছে। যা ১৪০০ বছর আগে ইসলাম অর্থাৎ আমাদের নবীজি এই শিক্ষা দিয়ে গেছেন। আমরা যারা মুসলমান, আমাদের নামাজের সময় অজু করতে প্রথমেই হাত ধুতে হয়। গড়গড়া করে কুলি করতে হয় এবং নাকের ভিতর পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হয়।’
মহামারির ইতিহাসের পাঠ : করোনা নতুন। কিন্তু পৃথিবীতে এ মহামারি নতুন কিছু নয়। এভাবে দুনিয়ার মালিক আল্লাহ তায়ালা ইতোপূর্বে বুকে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা দিয়ে যাচাই-বাছাই করেছেন। সেই ইতিহাস থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়নি। সময়ের সাড়া জাগানো আলোচক ড. ইয়াসির কাদি আরো বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে শত শত মহামারির ঘটনা ঘটেছে। প্রথমটি হলো ধংসাত্মক প্লেগ। ১৩৩২ থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত এ ব্ল্যাক ডেথ অথবা ব্ল্যাক প্লেগ নামে মহামারিটি পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দুনিয়ায় প্রায় ২০০ মিলিয়ন (২০ কোটি) মানুষ মারা যায়। বলা হয়ে থাকে, এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে জনসংখ্যা স্বাভাবিক হতে ইউরোপের প্রায় ২০০ বছর সময় লেগে যায়। সে সময়ে মুসলিম দেশগুলোও এ ব্ল্যাক ডেথ নামক মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছিল যাতে সে সময়কার অনেক ওলামা মারা যান। অনেকেরই পরিবারের সদস্য মৃত্যুবরণ করে।
দ্বিতীয় ঘটনাটি হলো ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’। এটা একশ’ বছর আগে অর্থাৎ ১৯১৮ সালে ঘটেছে। সে সময়ে চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে এটি আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করে যাতে প্রায় ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি মানুষ মারা যায়। ‘স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা’ হিসেবে নামকরণ করার কারণ এটা নয় যে, এ মহামারি শুধু স্পেনেই ঘটেছিল। বরং সে সময়কার মিডিয়া ব্রিটিশ, কানাডা ও আমেরিকা নিয়ন্ত্রণ করত। তারা তাদের দেশের মহামারি সম্পর্কে মিডিয়ায় তেমন কিছু আসতে দেয়নি। যেটি হয়তো আজ মিডিয়া কন্ট্রোল চায়না করেছে। তাদের অনেক খবরই দুনিয়াবাসী জানতে পারছে না। যেমন উইঘুর মুসলমানদের ওপর দমন-নিপীড়নের দৃশ্য পৃথিবীর মানুষের নিকট এখনো আজানাই রয়ে গেল! তাই বলছিলাম, এ স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েঞ্জা আর বর্তমানে প্রকট হওয়া করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ একই পরিবারভুক্ত ভাইরাস। যদিও এটা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এখনো অনেক গবেষণা করে যাচ্ছেন।
সর্বপ্রথম যে মহামারির কথা আলোচনা করা জরুরি, তা হলো ‘আমাওয়াসের প্লেগ’। এটি ইমাওয়াস নামক এক শহরের নাম হতে এর উৎপত্তি। মুসলিম উম্মাহ সর্বপ্রথম এ প্লেগের সম্মুখীন হয়। এ প্লেগ থেকে বেঁচে যাওয়া কেউ কেউ এটিকে জাস্টিনিয়ান প্লেগও বলে থাকেন। এটা রোমান সাম্রাজ্যে ৫৪১ খ্রি. হতে ৭৫০ খ্রি. পর্যন্ত কয়েকবার ঘটে। রোমান শাসক জাস্টিনের শাসনামলে শুরু হওয়ার কারণে এটিকে প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান বলে অভিহিত করা হয়। প্রতিবার এ মহামারিতে কনস্টান্টিনোপলে প্রতিদিন ১০,০০০ মানুষ মারা যেত। এতে ইউরোপের অর্ধেক জনসংখ্যা আক্রান্ত হয়।
‘আমাওয়াসের’ প্লেগ এগুলো নবী (সা.)-এর ইন্তিকালের পরের ঘটনা। ১৮ হিজরী সনে এটি ঘটে। এটি সে সময়কার কথা যখন ওমর রা.-এর নেতৃত্বে মুসলিমরা একের পর এক দেশ জয় করছেন। রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ শাম, দামেস্ক, জেরুসালেম প্রভৃতি জয় করেন। এ সময় মুসলমানদের সাথে রোমান সৈন্যদের মুখোমুখী যুদ্ধ চলছে। অত্র অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ। যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবীর অন্যতম। আবু উবায়দা (রা.)-কে ওমর (রা.) সর্বোচ্চ কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। তিনি একটি বাহিনী নিয়ে শামের দিকে রওনা হন, যারা পূর্বের বাহিনীর সাথে যোগ দেবে। তিনি যখন শামের কাছাকাছি একটি জায়গায় পৌঁছলেন, তখন জানতে পারলেন সেখানে প্লেগ রোগ মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় সেখানে প্রবেশ করবেন, না ফিরে যাবেন সে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য উপস্থিত মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের কাছ থেকে মতামত গ্রহণ করেন। মুহাজিরগণের মধ্যে দুই ধরনের মতামত প্রদানকারী পাওয়া যায়। আনসারগণের কাছ থেকেও একই রকম মতামত পাওয়া যায়।
এ সময়ে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ বললেন, এ বিষয়ে আমি রাসূল (সা.) থেকে একটি হাদীস শুনেছিলাম। ‘যদি তোমরা কোনো প্লেগ আক্রান্ত এলাকায় থাকো, তাহলে সেখান থেকে পলায়ন করো না। আর যদি এর বাইরের অধিবাসী হও, তাহলে প্লেগ আক্রান্ত এলাকায় প্রবেশ করো না।’ তখন এ বিষয়টি সুরাহা হয়ে গেল। তখন ওমর (রা.) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার তাওফিক দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ