বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০
Online Edition

গার্মেন্ট শপিংমল এবং দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি -বিশেষজ্ঞ মহল

হ্যাটস অফ টু দি সুপার শপস এ্যান্ড শপিং মল্স। শপিংমল এবং সুপার শপ গুলোর প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন। আশার কথা বাংলাদেশের সমস্ত বড়লোক টাকার জন্য পিশাচে হয়ে যাননি। এখনও কিছু টাকা ওয়ালা আছেন যারা টাকার চেয়ে মানুষের জীবনকে বেশি মূল্য দেন। বোঝা যাচ্ছে, মানবিকতা বাংলাদেশ থেকে এখনও সরে যায়নি। বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত বিশেষজ্ঞ মনে করছেন যে মে মাস হবে করোনা ভাইরাস আক্রমণের পিক টাইম বা শীঘ্রই সময়। অনেকে বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে সময় গণনা করে বলছেন যে ১৭ মে থেকে ২০ মে হবে সেই শীর্ষ সময় বা পিক টাইম। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে পিক টাইম শুরু হবে ১৭ মে এবং চলবে সমগ্র মে মাস। মে মাসের একেবারে শেষে এসে বোঝা যাবে যে করোনা অতপর নামবে কিনা। যখন করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যখন দৈনিক মৃত্যুও ১৩ তে উঠেছে, ঠিক সেই সময় গার্মেন্টস, শপিংমল এবং দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত সংক্রমণকে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি করবে এবং মহামারীকে ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ভাইরোলজিস্টরা যখন শাটডাউন বা লকডাউন আরো কঠোর করার পরামর্শ দিচ্ছেন তখন সেটি সরকার শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত কতখানি জাস্টিফাইড হয়েছে সেটি নিয়েও বিশেষজ্ঞরা শঙ্কায় রয়েছেন। এমন একটি অবস্থায় শপিংমল এবং কিছু সুপার শপের মালিক দেখিয়েছেন যে তাদের বিবেক এখনও মরে যায়নি। খবরে প্রকাশ, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক এবং পিংক সিটি না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঐসব শপিংমলের মালিকরা। এছাড়াও নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট এবং চন্দ্রিমা মার্কেট ঈদের আগে না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরো ভালো খবর হলো এই যে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে যে ঈদের আগে তাদের কোনো দোকান খুলবেনা। নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কার্য নির্বাহী কমিটির সভাপতি দেওয়ান আমিনুল হক বলেছেন যে ব্যবসার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। বসুন্ধরা সিটি, পিংক সিটি, বায়তুল মোকাররম মার্কেট, গাউছিয়া এবং চন্দ্রিমা কর্তৃপক্ষের মালিক জানিয়েছেন যে ঈদের কেনাবেচার জন্য করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি তারা নিতে চাচ্ছেন না।
দোকানপাট খোলার ব্যাপারে গত ৮ মে শনিবার একটি বাংলা দৈনিকে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরের শিরোনাম “অর্ধেক মার্কেট খুলছে।” খবরের এক স্থানে বলা হয়েছে, “ঈদের মার্কেট ধরতে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ কাপড় বাংলাদেশে আনা হয়েছে। ঈদে মার্কেটগুলো বন্ধ থাকলে শত শত কোটি টাকার ভারতীয় কাপড় অবিক্রিত থেকে যাবে। এতে লোকসান গুনতে হবে ব্যবসায়ীদের এবং ভারতও বঞ্চিত হবেন বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা থেকে। মূলতঃ ঈদে একচেটিয়াভাবে ভারতীয় কাপড় বিক্রির জন্যই ১০ই মে শপিংমল ও বিপনী বিতান গুলো খোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ঐ খবরে আরো বলা হয়, “বসুন্ধরা শপিংমল দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এম এ হান্নান বলেন, ঈদের আগে বসুন্ধরা শপিংমল খোলা হবে না। দোকানদার সরকারি বিধি মেন চললেও সামাজিক দূরত্ব কিভাবে মানবে? ক্রেতারা যখন আসবে তখন তাদের মধ্যে তেমন কোনো দূরত্ব থাকবে না। ক্রেতারা কোনো পণ্যই হাত দিয়ে স্পর্শ ছাড়া কেনেন না। জিনিসপত্রে ক্রেতার হাতের স্পর্শ লাগবেই। আবার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মার্কেটে করোনা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
যমুনা গ্রুপের ডিরেক্টর জনাব মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, “ঈদের আগে দোকান খুললে ক্রেতা বিক্রেতার অতি ব্যস্ততার কারণে মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্বের নিয়ম লঙ্ঘন হবে। এতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়বে। তাই যমুনা ফিউচার পার্ক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য এম এ হান্নান বলেন, আমরা নিউ মার্কেটের পক্ষ থেকে জানিয়েছি, প্রতিদিন করোনা পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে। জীবনটা আগে। আমাদের নিজেদের, কর্মচারীদের এবং ক্রেতাদের কে সর্বোপরি দেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত আমরা নেবনা।” বায়তুল মোকররম ব্যবসায়ী সমিতির সদস্য ও বাংলাদেশ জুয়েলারী সমিতির সভাপতি এনামুল হক খান বলেন, করোনার কারণে দেশের সব জুয়োলারি বন্ধ রাখার পাশাপাশি বায়তুল মোকাররমের পুরো মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।” তিনি আরো বলেন, “সরকার দোকান খোলার অনুমতি দিলেও শ্রমিক কর্মচারীরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে আছে। তারা আসতে পারবেন না। দোকান খোলার পর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালানো টা দূরহ ব্যাপার। এটি সম্ভব নয় অনেক মার্কেট খুলবেনা।”
॥দুই॥
আগামী দিন গুলো যে দেশের জন্য কঠিন সময় সে কথা শুধুমাত্র চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং ভাইরোলজিস্ট, এপিডেমিওলজিস্ট এবং ইমিউনোলজিস্ট (রোগ প্রতিরোধ শক্তি বিশেষক) রাই বলছেন না, দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারাও বলছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত শুক্রবার ৭মে বলেছেন, করোনা পরিস্থিতি আগামীতে আরো কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এব্যাপারে মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তিনি নেতা কর্মীদের প্রতি আহবান জানান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেন, অকার্যকর লকডাউনের কারণেই এধরণের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। তিনি লকডাউন আরো কঠোর করার পরামর্শ দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক ভিসি ডাঃ কামরুল হাসান খান বলেন, যেহেতু পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে, তাই আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। তাঁর মতে প্রথমেই রোগীদের শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে মৃত্যুর হারও কমানো যেতো। এখন লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। তাই পরিস্থিথির আরও অবনতি হবে। বিশিষ্ট মাইক্রোবায়োলজিস্ট অধ্যাপক ডা ঃ এ এস এম শহীদ উল্লাহ বলেন, করোনায় মৃত্যু হার বাড়া কোনো ভাল লক্ষণ নয়। এমনিতেই লকডাউন ঢিলে ঢালা ও শিথিল। সেটি আরো শিথিল করায় বেড়েছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার। তার মতে বর্তমানে যে হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে সেটা দেখে বলা যেতে পারে যে লকডাউন ঈদ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা দরকার। মনে রাখতে হবে জীবন থাকলে অর্থ উপার্জন করা যাবে। কিন্তু করোনায় এভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বাড়তে থাকলে সেটা দেশের জন্য হুমকি সরূপ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডাঃ এ, কে এম শামসুজ্জামান বলেন, এভাবে যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে সেই আশঙ্কা আমাদের আগেই ছিল। কারণ দেশে যখন সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তখন লকডাউন শিথিল করা হয়। এখন শুধু গার্মেন্টস নয়, অন্যান্য কলকারখানা দোকানপাট ও মসজিদ খুলে দেওয়া হয়। এধরণের পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার বা সংখ্যা যে বাড়বে তাতে আর অবাক হওয়ার কি আছে।
শুক্রবার ৮মে সংখ্যার ইংরেজি ডেইলি স্টারের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান সংবাদে বলা হয়েছে যে প্রতিদিন সংবাদ বুলেটিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে সেটি করোনার প্রকোপের সঠিক চিত্র প্রকাশ করেনা। শুধু এরাই নন, বিশিষ্ট সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর রেজওয়ানুর রহমান বলেন, অপ্রতুল নমুনা পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অব্যবস্থাপনাই করোনা পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী। তাঁর মতে, মৃত্যুর যে সংখ্যা প্রতিদিন দেওয়া হচ্ছে সেটি বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন নয়। জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট নিয়ে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যুর অনেক গুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে না। ফলে এসব মৃত্যু করোনা মৃত্যুর তালিকায় আসছেনা। ইংরেজি ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, যদি অধিক সংখ্যায় পরীক্ষা হতো তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যেতো।
উদাহরণ স্বরূপ অধ্যাপক রেজওয়ানুল ইসলাম বলেন, ৪ ও ৫ মে মৃত্যুর হার ছিল যথাক্রমে ৫ এবং ১। কিন্তু ঐ দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে মৃত্যু হয় ২১ ব্যক্তির। এখন বার্ণ ইউনিট শুধুমাত্র কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। ঐ ২১ ব্যক্তির লাশ তাদের পরিবারবর্গের নিকট হস্তান্তর করা হয়। ঐ ২১ ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি। সুতরাং তাদের কোনো পরীক্ষাও হয়নি। তিনি জানান যে গত শনিবারের আগের শনিবার পর্যন্ত সেখানে ৪০ জন রোগী মারা গেছেন। তিনি বলেন, দেশে অনেক রোগী আছেন যাদের কথা জানা যায়নি। তাদেরকে আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়নি। এসব কেসকে প্রফেসর রেজওয়ান ঐরফফবহ ঈধংব বলেন।
একই পত্রিকায় একই দিনে শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত এক সংবাদে বলা হয়েছে যে বিগত ৯ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত একটি গার্মেন্টস কারখানার ৯৬ জন শ্রমিক এবং ১ জন কর্মচারী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ‘গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি’ নামক একটি সংগঠনের জরীপ রিপোর্টে এই সংবাদ দেওয়া হয়। যে সব শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ এপ্রিল ফাক্টরী খোলার পর। আর ৪৮ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন কারখানা খোলার আগে ৯ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে। এসব তথ্য প্রকাশ করার সময় সংগঠনটির সভানেত্রী নাজমা আক্তার বলেন যে, যেভাবে ভাইরাসটির সামাজিক সংক্রমণ ঘটছে এবং যে দ্রুততার সাথে সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেগুলো দেখে ধারণা করা যায় যে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে কারখানা গুলো খোলা হয়নি। তিনি জানান যে জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক এবং নিউজ পোর্টালসহ ৫০ টি মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।
শেষ করার আগে একটি কথা বলতে চাই। এতক্ষণ ধরে আমরা বিশেষজ্ঞদের কথা বললাম। এবার সাদা চোখে যা দেখা যায় তাই বলছি। ২১ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত দেখা যায় যে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৩৪ থেকে ৪৯৭ এর মধ্যে উঠানামা করেছে। কিন্তু ২৮ এপ্রিল থেকে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। ২৮ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৫৪১ থেকে ৪৮৮ এর মধ্যে ওঠানামা করে। অর্থাৎ এই দুই সপ্তাহের প্রতি ৭ দিনে একটি বড় জাম্প দেখা দেয়। ৫ মে থেকে ৮ মে ৭০০ এর এবং ৮০০ এর নীচে ওঠানামা করে। পরের সপ্তাহে অর্থাৎ ১২ বা ১৩ মে থেকে কি হবে? আরেকটি জাম্প নয়তো?   
এমন একটি অবস্থায় গার্মেন্টস, সুপারশপ, শপিংমল সহ অন্যান্য দোকানপাট ও শিল্প কারখানা খোলার সিদ্ধান্ত সঠিক হয়নি বলে সমস্ত শিক্ষিত সচেতন মানুষ মনে করেন।
asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ