শুক্রবার ১৪ আগস্ট ২০২০
Online Edition

করোনায় সাতক্ষীরায় ১০ লাখ মানুষ কর্মহীন

করোনায় কর্মহীন সাতক্ষীরার কয়েক লাখ মানুষ। ছবিটি সাতক্ষীরা শহরের প্রাণকেন্দ্র থানা সড়ক সংলগ্ন পাকাপুলের মোড় থেকে তোলা

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: নোবেল করোনা ভাইরাসের কারণে সাতক্ষীরার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। আম ও চিংড়ি শিল্পে ধ্বস  নেমেছে। কয়েক বছর ধরে পরিবেশ বিপর্যয়, ধানের পরিবর্তে চিংড়ি চাষ, কল-কারখানা গড়ে না উঠা, আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে মন্দাভাব ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃস্টি করতে না পারায় জেলায় বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। নতুন করে করোনা ভাইরাসের প্রভাক জেলা বাসির কাছে যেন ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হয় দাড়ায়। প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাাসনের পক্ষ থেকে যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ রা হয়েছে তা জেলা বাসীর এক দিনের খানার সমতুল্য।

এদিকে  করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রধাানমন্ত্রী ঘোষিত অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের প্রণোদনার অর্থ প্রদান ও ত্রাণের দাবিতে মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছে সাতক্ষীরার ১৩টি শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় জেলা কালেক্টরেট চত্বরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে উক্ত মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

সরকারি হিসাব মতে জেলার ৬৪ ভাগ পরিবারই ত্রাণ ও সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। করোনা ভাইরাস জনিত সরকারি ছুটির কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তভুক্ত পরিবারের সদস্যরা এই সহায়তা পাচ্ছেন। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে জেলাটিতে মোট জনসংখ্যা ২৩ লক্ষ ১৭ হাজার ১৫৮ জন। নিয়মানুযায়ী দেশে প্রতি বছরে জনসংখ্যা ৫ ভাগ বৃদ্ধি পায়। সেই হিসাব মতে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে সাতক্ষীরাতে লোক সংখ্যা দাড়াবে ২৪ লক্ষ ৩৩ হাজার ১৫ জন।জনসংখ্য (সুত্র:পকেট বুক-২০১৬)।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়  জেলায় করোনায় কর্মহীন ১,১৩,৮০০ টি পরিবারের মাঝে ১০ কেজি করে চাইল বিতরণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট বিতরণের পরিমাণ ১৫শ মে:টন চাইল ও ৭৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সদরে ২২৫ মে:টন চাইল ও ৯ লক্ষ ৮৩ হাজার ৫শ টাকা, কলারোয়াতে ১৪২ মে:টন চাইল ও ৭ লক্ষ ১৫ হাজার টাকা, তালাতে ১৬৩ মে:টন চাইল ও ৮ লক্ষ ২৭ হাজার টাকা, আশাশুনিতে ১৫১ মে:টন চাইল ও ৮ লক্ষ ১৮ হাজার টাকা,দেবহাটাতে ৯৬ মে:টন চাইল ও ৫ লক্ষ ৫৭হাজার টাকা, কালিগঞ্জে ১৫৪ মে:টন চাইল ৭ লক্ষ ৯৪ হাজার ৫শ টাকা,শ্যামনগরে ১৭৬ মে:টন চাইল ৮ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা, সাতক্ষীরা পৌরসভাতে ১৪২ মে:টন চাইল ও ৭ লক্ষ ৫৭ হাজার টাকা এবং কলারোয়াতে ৫১ মে:টন চাইল ও ২ লক্ষ ০৮ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। যেখানে দৈনিক চাউলের প্রয়োজন ১২৩৬ মে:টন। এছাড়া ১৮ লক্ষ টাকার শিশু খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। 

খাদ্য পরিস্থিতি ২০১৮-১৯ অনুযায়ী জেলাতে ১৭ লক্ষ ৯২ হাজার ৭৫৩ বন লোক সংখ্যা কৃষক পরিবারের সাথে জড়িত। তাদের পরিবার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫৫০টি। মৎস,চাকুরী, শ্রমিকসহ অন্যান্য পেষায় জড়িত রয়েছে ৫ লক্ষ ২৪ হাজার ৪০৫জন। যাদের পরিবারের সংখ্যা দাঁড়ায় এক লক্ষ ৪ হাজার ৮৮১ জন। সর্বমোট সাতক্ষীরা জেলাতে ৪ লক্ষ ৬৩ হাজার ৪৩১টি পরিবার রয়েছে। তবে একটি পরিবারে ৪ জন সদস্য থাকলে পরিবার সংখ্যা হবে ৫ লক্ষ ৭৯ হাজার ২৮৯ টি। 

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলায় মুক্তিযোদ্ধা ভাতাভোগীর সংখ্যা ২,৩১০ জন, বয়স্ক ভাতা ৬৮,৭২৬ জন, বিধবাভাতা ৩১,৬৬৪ জন, প্রতিবন্ধী ভাতা ২৭,৫৭৪ জন, অনগ্রসর ভাতা ৭৭২ জন, হিজরা ভাতা ৩৪ জন, ওমমএস ৬০০০ পরিবার, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি ১,২৮,৮৩১ পরিবার এবং ভিজিডি কর্মসূচির সুবিধাভোগী পরিবার ২০,৯৩৩ পরিবার তালিকাভুক্ত রয়েছেন। তারা নিয়মিত সরকারী সহায়তা পেয়ে থাকেন। এতে ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার ৮১২টি পরিবার সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভুক্ত পরিবারের সদস্যরা এই সহায়তা পাচ্ছেন। ফলে জেলার ১৫ লক্ষ ১৯ হাজার ২৪৮ জন ব্যক্তি সরকারের সহয়াতা পাচ্ছে বলে জেলা প্রশাসনের দাবি। 

জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব মতে জেলাতে ৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমি আছে। এসব জমিতে ৩ লক্ষ ৫৮ হাজার ৫৫০টি পরিবার কৃষি কাজ করে থাকে। এর মধ্যে ভুমিহীন চাষী রয়েছে ৬৭ হাজার ২৩০টি,প্রান্তিক চাষী রয়েছে এক লক্ষ ৩১ হাজার ৩৭টি,ক্ষদ্র চাষী রয়েছে এক লক্ষ ৯৫৭টি, মাঝারি চাষী রয়েছে ৪৪ হাজার ৮৪২টি এবং বড় চাষী রয়েছে ১৪ হাজার ৪৮৪টি। খাদ্য বিভাগের হিসাব মতে একজন ব্যক্তির দৈনিক ৪৪২ গ্রাম চাউল (দানা শস্য) প্রয়োজন। সেই হিসাবে দৈনিক জেলাতে চাইলের প্রয়োজন ১২৩৫.৪২ মে:টন। যা মাসের হিসাবে দাড়ায় ৩৭৭৪.৩৪ মে:টন। বছর হিসেবে দাঁড়ায় ৪ লক্ষ ৪৪ হাজার ৮৯২ মে:টন। 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে করোনায় বিশ্বজুড়ে বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অবস্থা এবং পূর্বাভাস তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি কিংবা আগামী বছরেও হারটি কমবে না।  

করোনা মোকাবেলায় সাতক্ষীরা বাসীর জন্য কিছু করণীয়র কথা বলেছে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছে , প্রথমে জেলার জনসংখ্যার সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয় করা। এর পর ইউনিয়ন ও পৌরসভার মাধ্যমে পরিবার সংখ্যা, জীবন যাত্রার মান,জায়গা জমির পরিমাণ এমনকি মোবাইল নম্বর পর্যন্ত তালিকা করে একটি ডেটাবেজ তৈরি করা। এর পর পর্যায় ক্রমে সরকারের ত্রাণ সামগ্রী তাদের কাছে পৌছিয়ে দেয়া।

এদিকে জেলাতে    অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের প্রণোদনার অর্থ প্রদান ও ত্রাণের দাবিতে মানববন্ধন করেছে কয়েকটি সংগঠন।  এতে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন, রং পালিশ শ্রমিক, ইলেক্ট্রিশিয়ান, রেস্তোঁরা, বোর্ড ফার্নিচার, টাইলস মোজাইক, স্বর্ণ ছাই শ্রমিক, দর্জি, রিকসা-ভ্যান, সংবাদপত্র বিক্রেতা, ইটভাটা, ওয়েলডিং শ্রমিকসহ সাতক্ষীরা শহরের প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে তারা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।  

 পরে জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অ্যাড. ফাহিমুল হক কিসলুর নেতৃত্বে শ্রমিক নেতৃবৃন্দ সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. বদিউজ্জামানের মাধ্যমে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পেশ করেন।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান,সরকারের দেয়া ত্রাণ সামগ্রী ভুক্তভোগীদের মাঝে পৌছানোর কার্যকরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সমাজের সকল স্তরে তালিকা করে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। 

সাতক্ষীরা-২ আসনের মাননীয় জাতীয় সংসদ বীর মোস্তাক আহম্মদ রবি জানান,জনসংখ্যা ও দারিদ্র্যের আনুপাতিক হারে ত্রাণ ও সাহায্য কার্ডেওর পরিমান অপ্রতুল। বৃদ্ধি জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ