রবিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২২
Online Edition

করোনা এবং সরকারের ভূমিকা

আশিকুল হামিদ : লেখার সাবজেক্ট বা বিষয়বস্তু নিয়ে সাধারণত আমি বিপদে পড়ি না। কিন্তু এবার বিপদে শুধু নয়, মহা বিপদে পড়তে হয়েছে। কারণ, করোনা ভাইরাস নিয়ে লিখবো বলে ভেবে রাখলেও এ সম্পর্কিত এত বেশি ধরনের তথ্য ও খবরের ভিড় জমে গেছে যে, কোনটাকে রেখে কোনটা নিয়ে লিখবো সেটা ঠিক করাই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শুরুতে বরং একজন ‘দানবীর’-এর ইতিহাস উল্লেখ করা যাক । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৩৯-১৯৪৫) এই বাঙালি ‘দানবীর’ ব্রিটিশ সরকারের ঠিকাদার বা কন্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করেছিলেন। সেটা সম্পূর্ণরূপে ছিল তার ব্যবসা- টাকা কামানোর এক বিরাট ধান্দা। অন্য কিছু কাজের মধ্যে একটি বড় কাজ হিসেবে তিনি ঢাকা থেকে কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক তৈরি ও মেরামত বা সংস্কারের ঠিকাদারি পেয়েছিলেন। শর্ত ছিল সড়কগুলোকে এমন অবস্থায় নিয়ে আসা, যাতে ইংরেজদের সামরিক বাহিনীর গাড়ি নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে। দীর্ঘ হলেও সব সময় ব্যবহৃত হতো বলে ওই সড়কে খুব বেশি কাজ ও ব্যয় করতে হয়নি। কিন্তু যাকে বলে ঠিকাদারের বুদ্ধি! ফাঁক-ফোকড় তো তৈরি করেছিলেনই, খরচের নতুন নতুন খাতও আবিষ্কার করেছিলেন ‘দানবীর’। এরকম একটি খাতের শিরোনাম করেছিলেন ‘কাটিং অ্যান্ড রিমুভিং অব কাচ্চু ট্রিজ’। ফাইনাল বিলে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি জনিয়েছিলেন, তার কর্মি বাহিনীকে হাজার হাজার ‘কাচ্চু ট্রি’ কেটে ফেলতে এবং পথের আশপাশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়েছে।
‘ম্যাঙ্গো ট্রি’ ধরনের নামের সঙ্গে পরিচিত থাকলেও ব্রিটিশ সরকারের লোকজন তখনও ‘কাচ্চু ট্রি’ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কিন্তু যেহেতু একজন দায়িত্বশীল কন্ট্রাক্টর লিখেছেন এবং তার বিনিময়ে মজুরি ও অর্থ দেয়ার জন্য বিল পেশ করেছেন সেহেতু ব্রিটিশ সরকার বিলের টাকা পরিশোধ করেছিল। সরকার অবশ্য বিনা ইন্সপেকশনে টাকা দেয়নি। সরকারের লোকজন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কের অবস্থা পরিদর্শন করেছিল। তারা দেখেছিল, আসলেও সড়কের আশপাশে এমন কোনো গাছ ছিল না, যার কারণে সামরিক যানবাহনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ‘কাচ্চু ট্রি’র গোমর ফাঁস হয়েছিল পরবর্তীকালে। ওই ‘দানবীর’ কচু গাছকে ‘কাচ্চু ট্রি’ বানিয়ে ছেড়েছিলেন। দেখা গেছে, সত্যিই তিনি হাজার হাজার ‘কাচ্চু ট্রি’ কেটে সড়ক পরিষ্কার করেছিলেন!
এই ‘কাচ্চু ট্রি’ কেটে ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আয় করার মধ্য দিয়ে একজন ধনকুবের হিসেবে আমাদের ওই ‘দানবীর’-এর উত্থান পর্বের সূচনা হয়েছিল। শোনা যায়, পরবর্তীকালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে তিনি চাল থেকে লবণ পর্যন্ত বহু ধরনের পণ্যের মজুত করে এবং সেসব পণ্য কালোবাজারে অনেক বেশি দামে বিক্রি করেও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কখনো তেমন অভিযোগ ওঠেনি। সে পথও তিনিই বন্ধ করেছিলেন। এ যুগের ধনকুবেরদের মতো অবৈধ পথে টাকা পাচার করে বিদেশের মাটিতে বনানী ও গুলশান পাড়ার মতো এলাকা তৈরি করার এবং নিজের লোকজনের জন্য হোটেল বা অ্যাপার্টমেন্ট বানানোর পরিবর্তে তিনি দেশের ভেতরে হাসপাতাল এবং মেয়েদের জন্য ক্যাডেট কলেজ ধরনের বিশেষায়িত স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশেষ করে শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্যই তিনি ‘দানবীর’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। সে কারণে এখন আর কারো মুখে ‘কাচ্চু ট্রি’র কথা শোনা যায় না!
প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার আগে বলে রাখা দরকার, বেশ কিছু উপলক্ষে এই ‘দানবীর’কে সামনাসামনি দেখার এবং তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। আর ‘কাচ্চু ট্রি’ বিষয়ক কাহিনী শুনেছিলাম একজন বিখ্যাত এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক নেতার কাছে- ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যিনি বাংলাদেশের মন্ত্রী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে পরবর্তী কোনো নিবন্ধে লেখার ইচ্ছা রইল।
এবার অতি ভয়ংকর করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গ। নিবন্ধের শুরুতে ‘কাচ্চু ট্রি’র কাহিনী শোনানোর কারণ সম্পর্কে নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না। করোনার সংক্রমণে সমগ্র বাংলাদেশ  যখন সর্বাত্মকভাবে বিপন্ন তখনও হাজার হাজার মণ চাল আটা আর তেলসহ ত্রাণের পণ্য লুণ্ঠন করা হচ্ছে এবং কোনো অপরাধীকেই যখন কঠোর শাস্তি দেয়া হচ্ছে না তখন ‘কাচ্চু ট্রি’র সেই কীর্তিমানের কথা মনে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া করোনার ব্যাপারে সরকারের নেয়া কোনো ব্যবস্থাও জনমনে আস্থা বা ভরসা তৈরি করতে পারেনি। জাতির অবশ্য ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। কারণ, বিশ্বের দেশে দেশে করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল তৈরি হলেও বাংলাদেশে এখনও পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে যায়নি। মৃতের সংখ্যা এখনও দুইশ’র নিচে রয়েছে (এটা যদিও সরকারি হিসাব)। অনাকাংক্ষিত সন্দেহ নেই, তথাপি এই সংখ্যাকে ভীতিকর বলা যায় না।
তা সত্ত্বেও কিছু মৃত্যু দেশবাসীকে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে। এরকম একজনের কথা স্মরণ করতেই হবে, যিনি ‘মানবিক ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। এই চিকিৎসকের নাম ডাক্তার মঈন উদ্দিন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ছিলেন তিনি। তাকে নিয়ে আলোচনার বিশেষ কারণ হলো, অনেকাংশে বিনা চিকিৎসায় এবং সরকারের অবহেলায় তার মৃত্যু ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করার পর চিকিৎসকদের অনেকেই যখন রোগীদের ফেলে নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন সেই দুঃসময়ে ডা. মঈন উদ্দিন রাতদিন হাসপাতালে রোগীদের পাশে থেকেছেন। তাদের চিকিৎসা দিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন। তার চিকিৎসায় অনেকে সুস্থ হয়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরেও গেছেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে ডা. মঈন উদ্দিন নিজেই যখন ৫ এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তখন তিনি যথাযথ চিকিৎসা পাননি। তাকে প্রথমে সিলেটের একটি বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আইসিইউসহ চিকিৎসার যথেষ্ট ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত তার অবস্থার অবনতি ঘটছিল। সব বুঝতে পেরে ডা. মঈন তাকে ঢাকায় পাঠানোর এবং আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরসহ চিকিৎসার আয়োজন করার জন্য আকুতি জানিয়েছিলেন। কিন্তু স্বজন এবং অন্য চিকিৎসকদের উপর্যুপরি আবেদন সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। শুধু তা ই নয়, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা একথা পর্যন্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তার ‘পদমর্যাদার’ একজন চিকিৎসককে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স দেয়া এবং ওই অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানোর নাকি ‘আইন’ নেই! সে কারণে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও ডা. মঈন উদ্দিনকে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় আনা হয়েছিল। ওই অ্যাম্বুলেন্সে এমনকি আইসিইউ পর্যন্ত ছিল না।
ঢাকায় আনার পর তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সাধারণ বিছানায় ফেলে রাখা হয়েছিল। সে কারণে অনেকাংশে বিনা চিকিৎসায় ১৫ এপ্রিল ভোর রাতে মৃত্যু বরণ করেছেন ডা. মঈন উদ্দিন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজেউন)। তার এই মৃত্যু দেশের চিকিৎসকদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। উল্লেখ্য, এর কিছুদিন পরই খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন সহকারী অধ্যাপককে নৌবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণ সম্পর্কে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও আলোচনার অবসান হয়নি।
বস্তুত সিলেটের ‘মানবিক ডাক্তার’ মঈন উদ্দিন একজন উদাহরণ মাত্র। বাস্তবে করোনা মোকাবেলায় সরকার প্রথম থেকেই চরম উদাসীনতা ও অবহেলা দেখিয়ে চলেছে। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। গত ২৩ মার্চ সর্বশেষ করোনা পরিস্থিতি এবং সরকারের কার্যক্রম ও ‘সফলতা’ সম্পর্কে অবহিত করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। করোনা মোকাবেলায় সরঞ্জামের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেদিন বলছিলেন, সরঞ্জাম তথা পিপিইর বা পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্টের ‘এখনও তেমন প্রয়োজন নেই’!
এ পর্যন্ত এসে পাঠকরা ভাবতে পারেন, এখানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‘জ্ঞানের বহর’ নিয়েই সম্ভবত উপহাস করা হবে। অন্যদিকে উদ্দেশ্য আসলে একজন নারী টিভি রিপোর্টারের একটি জিজ্ঞাসার উল্লেখ করা। করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মন্ত্রী যখন মাস্ক পরা এবং আক্রান্ত-অনাক্রান্ত নির্বিশেষে অন্য মানুষজন থেকে অন্তত তিন ফুটের দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছিলেন তেমন এক সময়েও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ঘিরে রেখেছিলেন জনা পঞ্চাশেক আমলা ও কর্মচারী। এ কথাটাই প্রশ্নের আকারে তুলে ধরতে গিয়ে ওই টিভি রিপোর্টার গুনে গুনে বলেছিলেন, মাননীয় মন্ত্রী, আপনার পেছনে ৩৭ জনকে দেখা যাচ্ছে ঠেসাঠেসি করে দাঁড়িয়ে থাকতে, যাদের কারো মুখে বা দেহেই কোনো মাস্ক বা রোগ প্রতিরোধের কোনো সরঞ্জাম নেই। মন্ত্রীর দু’পাশে যারা বসে ছিলেন তাদের মুখেও মাস্ক ছিল না। এমনকি স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন কোনো রকম প্রতিরোধক ছাড়া। এভাবে জানানোর পর ওই রিপোর্টারের প্রশ্ন ছিল, আপনারাই যেখানে সচেতনতার প্রমাণ দিচ্ছেন না সেখানে জনগণ কেন আপনাদের কথায় উদ্বুদ্ধ হবে?
এত কথা কিন্তু অকারণে বলা হচ্ছে না। বলার কারণ, সরকারের পক্ষ থেকে একদিকে করোনার বিষয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সুচিন্তিত নীরবতা অবলম্বন করা হয়েছে, অন্যদিকে কর্তাব্যক্তিরা দৌড়ঝাপ শুরু করেছেন অনেক বিলম্বে। মূলত সে কারণেই বাংলাদেশে বহু মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে- সময় থাকতে ব্যবস্থা নেয়া হলে যারা আক্রান্ত হতো না। আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যার ব্যাপারে দায়িত্বশীল মহলগুলো মুখে কুলুপ এঁটে রাখলেও প্রথম থেকেই প্রতিদিন দু’একজন করে মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে। বিশ্বের দেশে দেশে করোনার ব্যাপক সংক্রমণ ও বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে তো বটেই, কোনো প্রতিষেধক বা চিকিৎসা না থাকার কারণেও এমন অবস্থাই স্বভাবিক। আসলেও প্রতিদিন অনেকে আক্রান্ত যেমন হচ্ছে তেমনি মারাও যাচ্ছে- যাদের সঠিক সংখ্যা জানার জন্য বহুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
সঠিক তথ্য জানা যাচ্ছে না প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত তথ্য গোপন করার ব্যাপারে অঘোষিত নির্দেশনা এবং দ্বিতীয়ত করোনা শনাক্ত করার কিট বা সরঞ্জামের অভাব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘প্রয়োজন নেই’ বললেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকা করোনার কারণে জেলায় জেলায় তো বটেই, উপজেলা পর্যায়েও যেখানে পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা দরকার ছিল সেখানে বেশ কিছুদিন পর্যন্ত সারাদেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানে- মহাখালিতে অবস্থিত আইইডিসিআর-এ সকল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সংক্রমণের পাশাপাশি জনমনে আতংক বেড়ে চলায় স্বাভাবিক কারণেই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন শত শত মানুষ গিয়ে ভিড় জমিয়েছে। কিন্তু প্রধানত প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কিট বা যন্ত্রপাতির অভাবে অধিকাংশ মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাই সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ খবরে অবশ্য জানা গেছে, আইইডিসিআর-এর পাশাপাশি আরো কয়েকটি হাসপাতালে সীমিত আকারে পরীক্ষা ও চিকিৎসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং শুরু হতে চলেছে।  
‘লকডাউন’ বলার পরিবর্তে সরকার ‘ছুটি’ ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন অবস্থার দুটি আশংকাজনক বিশেষদিক রয়েছে। প্রথমত, বিপুল সংখ্যায় মানুষ ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার ফলে কেনাবেচা কমলেও লাফিয়ে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। বাজারে এর যেমন ভীষণ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তেমনি আয়-রোজগার কমে যাচ্ছে দিনমজুর ও ফুটপাথের হকারসহ সেইসব শ্রেণীর মানুষজনের- যারা দিন এনে দিন খেয়ে কোনোভাবে বেঁচে থাকে। যাত্রী কমে যাওয়ায় রিকশা ও সিএনজি চালকেরাও প্রচন্ড অর্থ কষ্টে পড়তে শুরু করেছে। এক কথায় বিপদ বেড়ে যাচ্ছে নিম্নবিত্ত ও গরীব মানুষদের। তাদের সামনে আয়-রোজগারের কোনো পথই খোলা থাকছে না। তেমন অবস্থায় স্বাভাবিক নিয়মেই বেড়ে চলেছে চুরি-ছিনতাই ও ডাকাতির মতো বিভিন্ন অপরাধ।
আশংকার দ্বিতীয় কারণ হলো, রাজধানী ছেড়ে গ্রাম ও মফস্বল শহরগুলোতে যে লাখ লাখ মানুষ গেছে ও যাচ্ছে, তাদের অনেকের দেহেই করোনার ভাইরাস থাকতে পারে বলে ধরে নেয়া যায়। বড়কথা, করোনার ভাইরাস যে রয়েছে সেকথা প্রায় কারোই জানা নেই। ফলে তারা আত্মীয়-স্বজনসহ পরিচিতজনদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মেলামেশা করছে। সে কারণে জেলা ও উপজেলার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। আক্রান্ত ও বিপন্ন হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। এদিকে করোনা ভাইরাসের যেহেতু এখনও কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না এবং খোদ রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও যেহেতু চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু জেলা ও উপজেলাসহ মফস্বলেও আক্রান্তরা কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না। তাছাড়া করোনা প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কেও খুব কম মানুষেরই এখন পর্যন্ত জ্ঞান বা ধারণা রয়েছে। ফলে লাখ লাখ মানুষ শুধু আক্রান্তই হচ্ছে না, তাদের মধ্যে বড় একটি অংশের মৃত্যুও ঘটতে থাকবে। এভাবে সমগ্র বাংলাদেশই ভয়াবহ মহামারির অসহায় শিকারে পরিণত হতে পারে।
এমন নিশ্চিত ভীতিকর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারের উচিত সর্বতোভাবে উদ্যোগী হয়ে ওঠা। জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির ব্যাপারে, যাতে চুরি-ছিনতাই এবং ডাকাতির মতো অপরাধ সংঘটিত না হতে পারে। সরকারকে সেই সাথে একদিকে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে নিম্ন আয়ের গরীব মানুষদের জন্য স্বল্প মূল্যে এবং সম্ভব হলে বিনামূল্যে চাল-ডাল-তেল ও আটার মতো খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। একথা অবশ্যই বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিপদজনক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ওদিকে করোনাকে যেহেতু আন্তর্জাতিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে সেহেতু স্বাস্থ্য পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সরকারের উচিত কয়েকটি মাত্র প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করার পরিবর্তে রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি ভিত্তিতে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে টেস্টিং কিট ও পিপিই ধরনের সরঞ্জাম জরুরি ভিত্তিতে আমদানি করা। আমদানির ব্যাপারে বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে করোনা শনাক্ত করা সহজসাধ্য হয়ে উঠবে এবং আক্রান্ত ও আতংকিত নির্বিশেষে সকলের পক্ষেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা সময়ের ব্যাপারে পরিণত হবে। সরকারকে সেই সাথে ওষুধপত্র সহজলভ্য করতে হবে। কালোবাজারী ও মুনাফাখোর ব্যবসায়ী নামধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশপ্রেমিকরা চান, সরকারের উদাসীনতার কারণে বাংলাদেশে যাতে করোনার বিস্তার না ঘটতে পারে, যাতে বিনা চিকিৎসায় একজন মানুষেরও মৃত্যু না ঘটে। এজন্য দরকার করোনার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ