সোমবার ১০ আগস্ট ২০২০
Online Edition

মংলা বন্দরে বিদেশী এলপিজি জাহাজ থেকে তেল পাচার

খুলনা অফিস : মংলা বন্দরে আগত বিদেশী এলপিজি জাহাজ থেকে বিভিন্ন ধরণের জ্বালানী তেলসহ মূল্যবান মালামাল প্রতিনিয়ত কালো বাজারে দেদারছে পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে সরকার মোটা অংকের শুল্ক আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বন্দরে আসা বিদেশী এলপিজি জাহাজে কাস্টমসের পিও (প্রিভেন্টিভ অফিসার) থাকা সত্ত্বেও কিভাবে তেল পাচার হয় তা নিয়ে এবং কাস্টমসের ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
বন্দরের হারবার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০টি এলপিজি জাহাজ এ বন্দরে এসে থাকে। গত এপ্রিল মাসেও ২৪টি জাহাজ এলপিজি নিয়ে এ বন্দরে ভিড়েছে। এ সব জাহাজ থেকেই মূলত তেল পাচার করে থাকে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারীরা। এ সকল জাহাজ হতে রাতে অন্ধকারে ২০ থেকে ৫০টন তেল (ডিজেল, মোবিল) পাচার করে থাকে সংশ্লিষ্ট চোরাকারবারী চক্রের সদস্যরা।
অভিযোগ উঠেছে, কতিপয় স্থানীয় শিপিং এজেন্টের যোগসাজসে মংলার মামার ঘাট সংলগ্ন রিজেকশন গলির প্রভাবশালী কয়েক ব্যক্তি এ তেল পাচার কারবার করছেন। এক শ্রেণীর অসাধু শিপিং এজেন্ট অতি মুনাফার আশায় অবৈধ এ কারবারে সরাসরি সহযোগীতা করছেন জাহাজের নাবিকসহ সংঘবদ্ধ চোরাকারবারী চক্রকে। এ ব্যপারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ করেও কোন সূরাহ হয়নি। যে কারণে আন্তর্জাতিকভাবে এ বন্দরের সুনাম ক্ষুন্নের আশংকা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্দর আইনে নিয়মই আছে জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং দিতে হবে, যদি কোন শিপিং এজেন্ট এ আইন অমান্য করে থাকে তাহলে লিখিত অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে বন্দর কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হবে।
মংলা বন্দর স্টিভিডরিং ওয়াচম্যান ওয়েলফেয়ার সংঘের সভাপতি গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করে বলেন, গত এক মাসে এ বন্দরে যে এলপিজির জাহাজ এসেছে তার মধ্যে অন্তত সাতটি এলপিজি জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং দেওয়া হয়নি। আর ওই জাহাজগুলোতে ওয়াচম্যান না দেয়ার সুযোগেই স্থানীয় গ্লোবাল শিপিং, সী, এশিয়া শিপিংসহ বেশ কয়েকটি শিপিং এজেন্টের যোগসাজসে মংলার রিজেকশন গলির প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা ওই সাতটি জাহাজ থেকে তেল, মোবিলসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ পাচার করে কালো বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, শনিবারও মংলা বন্দরে দুইটি গ্যাসের জাহাজ রয়েছে। তাতেও ওয়াচম্যান নেয়া হয়নি। একটি পশুর চ্যানেলের হারবার জেটিতে আর একটি সুন্দরতলায় রয়েছে। এ জাহাজ দুইটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট সী, এশিয়ার। রোববার এলপিজি নিয়ে যে জাহাজটি বন্দরে আসার কথা ছিল সেটিরও স্থানীয় শিপিং এজেন্ট গ্লোবাল শিপিং। বিশেষ করে এই দুই শিপিং এজেন্টের বিরুদ্ধে মুলত জাহাজে ওয়াচম্যান না নেয়া ও যোগসাজসে তেল পাচারে চোরাকারবারীদের সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং (নিয়োগ) করা থাকলে এসব পাচার কাজ কোনভাবেই সম্ভব হতো না বলেও জানান গোলাম মোস্তফা। কিন্তু বন্দরের আইনে নিয়ম থাকলেও স্বার্থন্বেষি কতিপয় কিছু শিপিং এজেন্ট মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তারা জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং (নিয়োগ) দিচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন, এ ব্যাপারে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কোষ্টগার্ড পশ্চিম জোনে (মংলা সদর দপ্তর) একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা।
কোষ্টগার্ড পশ্চিম জোনের (মংলা সদর দপ্তর) অপারেশন কর্মকর্তা লে. ইমতিয়াজ আলম বলেন, চোরাচালান বিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে, তারপরও অভিযোগের ভিত্তিতে মংলা বন্দরে তেল চোরাকারবারীদের বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অভিযোগ পেয়েছেন মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হারবার মাস্টারও। হারবার মাস্টার কমান্ডার শেখ ফখর উদ্দিন বলেন, যেসব শিপিং এজেন্ট জাহাজে ওয়াচম্যান বুকিং (নিয়োগ) দেননি, তাদের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর বন্দরে আগত বিদেশী জাহাজ থেকে তেল পাচার ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীদের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হবে বলেও জানান বন্দরের পদস্থ এই কর্মকর্তা।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মংলার রিজেকশন গলির কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, বন্দরে আগত বিদেশী এলপিজি জাহাজে বাজার সরবরাহের নামে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী প্রতিদিনই ওইসব জাহাজ থেকে তেল পাচার করে তা কালো বাজারে বিক্রি করছেন। একই সাথে তারা জাহাজের মূল্যবান মালামালও চুরি করে নিয়ে আসছেন। এসব করে তারা রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
মংলা বন্দর উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দল খালেক বলেন, যেসব চোরাকারবারি জাহাজে ব্যবসার নামে এই বন্দরকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ